শিক্ষার্থীদের শিখনের গুণগত মান উন্নয়ন প্রয়োজন। মানোন্নয়নের জন্য কেবলমাত্র বিষয় জ্ঞান দিলেই চলবে না শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থীর চাহিদা, সামর্থ্য, আগ্রহ অনুযায়ী শিখন সম্ভব হয়। শিক্ষক সব দিক বিচার-বিবেচনা করে শিক্ষাদান করবেন। শিক্ষকের শিক্ষা প্রক্রিয়াকে সফল করে তুলতে হলে শিক্ষার্থীদের শিখন ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত থাকা প্রয়োজন।
শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যগুলি আলোচনা করো

শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যগুলি আলোচনা করো
শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ বিকাশসাধন: শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা সমূহ, শিক্ষার্থীর চাহিদা, সামর্থ্য ইত্যাদি সঠিকভাবে বুঝে ও প্রয়োজনীয় পরিমার্জন করে শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ বিকাশসাধন কীভাবে করা যায় সেই সম্পর্কিত যথাযথ ধারণা গঠন শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্থাৎ শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের প্রধান লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীর বৃদ্ধি, বিকাশ, সামর্থ্য, ক্ষমতা ও চাহিদা অনুযায়ী বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করা।
শিক্ষার উদ্দেশ্য নির্ধারণ: শিক্ষার উদ্দেশ্য নির্ধারণে শিক্ষা মনোবিজ্ঞান সাহায্য করে।
শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া: শিক্ষার্থীদের শিখনের গুণগত মান উন্নয়ন প্রয়োজন। মানোন্নয়নের জন্য কেবলমাত্র বিষয় জ্ঞান দিলেই চলবে না শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থীর চাহিদা, সামর্থ্য, আগ্রহ অনুযায়ী শিখন সম্ভব হয়। শিক্ষক সব দিক বিচার-বিবেচনা করে শিক্ষাদান করবেন। শিক্ষকের শিক্ষা প্রক্রিয়াকে সফল করে তুলতে হলে শিক্ষার্থীদের শিখন ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত থাকা প্রয়োজন।
শিক্ষককে সাহায্যদান: শিক্ষার্থীরা যাতে সহজেই বিষয়বস্তু উপলব্ধি করতে পারে সে ব্যাপারে শিক্ষকের ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানসম্মতভাবে শিক্ষণ পদ্ধতি নির্বাচন করে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দান করবেন। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান শিক্ষককে এই কাজে সাহায্য করে। তাই শিক্ষককে সাহায্য করা শিক্ষা মনেবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি: শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়াকে কার্যকরী করতে হলে শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি হবে নিরপেক্ষ, সহানুভূতিশীল। শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকের রূঢ় আচরণ, কঠোর শৃঙ্খলা, শাস্তিদান ইত্যাদি শিক্ষা মনোবিজ্ঞান বিরোধী। শিক্ষকের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করা শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য।
শিক্ষার্থীদের আচরণ বিশ্লেষণ: শিক্ষার্থীদের শিক্ষণকালীন বিভিন্ন আচরণগুলি বিশ্লেষণ করে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সামর্থ্য, আগ্রহ, বোঝার চেষ্টা করবেন এবং সেই অনুযায়ী শিক্ষা দেবেন। আচরণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিক্ষাদান শিক্ষার্থীদের সুসংহত ব্যক্তিত্ব বিকাশে সাহায্য করা শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
সামাজিকীকরণ: শিক্ষাক্ষেত্রে সামাজিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার থেকে সামাজিকীকরণ শুরু হয়। পরবর্তীক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য সামাজিক সংস্থা সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। সামাজিকীকরণের জন্য শিক্ষক, অভিভাবকদের শিক্ষা মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্যের ক্ষেত্রে এটিরও গুরুত্ব রয়েছে।
সামঞ্জস্যবিধান: শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষালয়, পরিবেশ ইত্যাদির সঙ্গে সুসংহত সামঞ্জস্যবিধান প্রয়োজন। সামঞ্জস্যবিধানে সমস্যার সৃষ্টি হলে শিক্ষা প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সামঞ্জস্যবিধানের ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত জ্ঞান প্রয়োজন।
সমন্বয়সাধন: শিক্ষা প্রক্রিয়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীর মানসিক দিক যুক্ত। শিক্ষার্থীর মানসিক দিকের সাথে সমন্বয়সাধন করে শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠক্রম, পাঠদান পদ্ধতি, শৃঙ্খলা, শিক্ষামূলক কর্মসূচি ও শিক্ষকের ভূমিকা নির্ধারিত হওয়া উচিত। সমন্বয়সাধনের প্রক্রিয়াকে সঠিকভাবে কার্যকর করার জন্য দরকার শিক্ষামূলক মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান।
গবেষণা: শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণা শিক্ষকদের মনোবিজ্ঞানসম্মত করে তুলতে সাহায্য করে। শিক্ষকদের মনোবিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনা শিক্ষা প্রক্রিয়াকে উন্নততর করতে সাহায্য করে। শিক্ষার উন্নয়নে শিক্ষা মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণার মানোন্নয়ন এই শিক্ষার লক্ষ্য।
বাস্তবসম্মত: শিক্ষাক্ষেত্রে তাত্ত্বিক দিকের প্রতি গুরুত্ব কমানোর উপর জোর দেওয়া হয়। আধুনিক শিক্ষাবিদ ও মনোবিদগণের মতে, শিক্ষাকে বাস্তবসম্মত করে তুলতে হলে তাত্ত্বিক দিকের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাবহারিক দিকের উপর যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
মানবসম্পদরূপে মর্যাদা: শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী হল গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যথাযথ মর্যাদা দানের জন্য উভয়কেই মনোবিজ্ঞানসম্মত ধারণা দিতে হবে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীদের লক্ষ্য হবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মানবসম্পদ হিসেবে মর্যাদা দান।
মূল্যায়ন : শিক্ষাক্ষেত্রে মূল্যায়ন অতি গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বে মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রধানত ছিল পরীক্ষাকেন্দ্রিক, মুখস্থবিদ্যা নির্ভর, প্রশ্নপত্রের মধ্যে নৈর্ব্যক্তিকতা ও যথার্থতার অভাব ছিল। বর্তমানে মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন হয়েছে এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা অনেকটা মনোবিজ্ঞানসম্মত করার চেষ্টা করা হয়েছে। মূল্যায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য।
ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন: বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনের উন্নয়ন হল শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
সুতরাং শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য বিভিন্ন দিকে প্রসারিত। লক্ষ্যের যত দিকই থাকুক না কেন প্রকৃত লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছোতে সাহায্য করা।
শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্বদান: শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ব্যক্তি শিক্ষার্থীকে অধিক গুরুত্ব দেয়।
বিকাশমূলক বিজ্ঞান: প্রতিনিয়ত গবেষণার কারণে শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্ব, সূত্র ও তথ্যের আবিষ্কার ও পরিমার্জন হচ্ছে। তাই একে বিকাশমূলক বিজ্ঞান বলে।
শিক্ষাক্ষেত্রে ভূমিকা: শিক্ষাক্ষেত্রে পদ্ধতি প্রকরণ, সমস্যাসমাধান, পাঠক্রম প্রণয়ন, গবেষণা, মূল্যায়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে শিক্ষা মনোবিজ্ঞান।
অন্তর্দর্শন: শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের নিজস্ব পদ্ধতি হল অন্তর্দর্শন যা মনোবিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা থেকে স্বতন্ত্র।
আদর্শনিষ্ঠ বিজ্ঞান: শিক্ষা মনোবিজ্ঞান যেহেতু ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণকর বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করে তাই একে আদর্শনিষ্ঠ বিজ্ঞান বলে।
গতিশীলতা: মনোবিজ্ঞানের গবেষণার দ্বারা আবিষ্কৃত নতুন নতুন সূত্র ও তত্ত্ব শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগের মাধ্যমে তাকে উন্নত ও যুগোপযোগী করা হয়। তাই বলা হয় শিক্ষামনোবিজ্ঞান একটি গতিশীল ও প্রয়োগমূলক বিজ্ঞান।
আচরণমূলক বিজ্ঞান: আমরা কখন, কেন, কীভাবে আচরণ করি তা নির্ণয় করে মনোবিজ্ঞান এবং শিক্ষা হল আচরণের ব্যাবহারিক দিক।
সমন্বিত রূপ: সাধারণ মনোবিজ্ঞান, জীবনবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, প্রয়োগমূলক মনোবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ের একটি সমন্বিত রূপ হল শিক্ষা মনোবিজ্ঞান।
আচরণ অধ্যয়ন: শিক্ষার্থীর বিভিন্ন মানসিক প্রক্রিয়া তথা মনোযোগ, আগ্রহ, প্রেষণা, পরিণমন, সামর্থ্য ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে শিক্ষা মনোবিজ্ঞান।
যোগসূত্র রচনাকারী: যেহেতু মনোবিজ্ঞানের সূত্র, তত্ত্ব ও তথ্যাবলিকে শিক্ষার উন্নতিতে প্রয়োগ করা হয় তাই বলা হয় শিক্ষা মনোবিজ্ঞান হল শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানের যোগসূত্র রচনাকারী বিজ্ঞান।
পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান: যেহেতু শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন উপাদানের উপর প্রতিনিয়ত পরীক্ষানিরীক্ষা বা গবেষণা হচ্ছে, তাই শিক্ষা মনোবিজ্ঞানকে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান বলে।
শিক্ষাশ্রয়ী অভীক্ষা: শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের শিক্ষাশ্রয়ী অভীক্ষার (Educational Test) সাহায্যে শিক্ষার্থীদের সহজাত ও অর্জিত বৈশিষ্ট্যগুলি পরিমাপ করা যায়।
ব্যাবহারিক সমস্যা: শিক্ষার কিছু ব্যাবহারিক সমস্যা বর্তমান, যা সুষ্ঠুভাবে সমাধান করতে গেলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সেই বিষয়ের বৈজ্ঞানিক কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নিখুঁত ও নির্ভুল: শিক্ষা মনোবিদ্যা প্রকৃতিবিজ্ঞানের তুলনায় কম নিখুঁত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত বা ফলপ্রদান করতে পারে কারণ মানুষের আচরণকে একেবারে নির্ভুলভাবে অনুমান করা যায় না।
আরও পড়ুন | Link |
নৈতিক প্রত্যয়সমূহ প্রশ্ন উত্তর | Click Here |
চার্বাক সুখবাদ প্রশ্ন উত্তর | Click Here |
পাশ্চাত্য নীতিবিদ্যা প্রশ্ন উত্তর | Click Here |