ভক্তি উপাসনার ধারায় শৈব ধর্ম ( Exclusive Answer For Class 12)

ভক্তি উপাসনার ধারায় শৈব ধর্ম – ভক্তিবাদের অন্যতম প্রাচীন পরম্পরা শৈব ধর্মের পরম আরাধ্য দেবতা শিব। সংস্কৃত শিব কথার মানে হল শুভ বা মঙ্গলময় এবং করুণাময়। আদিকাল থেকে রুদ্র, পশুপতি, মহাদেব ইত্যাদি নামগুলি একজনই ঈশ্বর অর্থাৎ, শিবকে বোঝাতে ব্যবহার করা হত বলে মনে করা হয়। শৈব ধর্ম অনুযায়ী এই জগতের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা হলেন শিব। আবার তিনিই রুদ্ররূপ ধারণ করে প্রলয়কালে সবকিছু ধ্বংস করেন। তিনি ত্রিগুণাত্মক (সত্ত্ব, রজ, তম), এই প্রকৃতির ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। শিব চিরপবিত্র আর শৈব ধর্মের অনুসরণ যিনি করেন, তিনিই শৈব (শৈব অর্থাৎ শিবসংক্রান্ত) নামে পরিচিত।

ভক্তি উপাসনার ধারায় শৈব ধর্ম

ভক্তি উপাসনার ধারায় শৈব ধর্ম
ভক্তি উপাসনার ধারায় শৈব ধর্ম

শৈব ধর্মের উদ্ভব

দেবতারূপে শিবের কল্পনা প্রাথমিকভাবে পুরাণকেন্দ্রিক। সম্ভবত প্রাক্-বৈদিক, বৈদিক ও বেদ-পরবর্তী ভাবধারার সংমিশ্রণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে শৈব ধর্ম গড়ে উঠেছিল।
ঋকবেদে বলা হয়েছে রুদ্রের কথা। এই রুদ্রকে প্রথমে প্রাক-বৈদিক দেবতার সঙ্গে অভিন্ন মনে করা হত। যজুর্বেদের শতরুদ্রীয় অংশে দেবতা রুদ্রের একশত নাম উল্লিখিত। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে রুদ্র সর্বপ্রধান দেবতারূপে চিহ্নিত।

সুতরাং পরবর্তী বৈদিক যুগে যে রুদ্র ক্রমশ মহোত্তম দেবতা মহাদেব হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তা সমসাময়িক সাহিত্যিক উপাদান থেকে স্পষ্ট। অর্থাৎ, হরপ্পা সভ্যতা, বৈদিক সভ্যতার সময়সারণী থেকে আধুনিক ‘শিব’ বা শৈব ধর্মের উৎপত্তি ঘটেছে বলা চলে। এ বিষয়ে প্রখ্যাত গবেষক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য লিখেছেন, “তাই এই অনুমান অসংগত নয় যে, শক্তিসাধনার মতো শৈবসাধনারও সূত্রপাত প্রাক্-বৈদিক যুগে (হরপ্পা সভ্যতা) এবং বেদোত্তর ভারতের ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে শক্তিসাধনার মতো শৈবসাধনাও অবিচ্ছিন্নভাবে টিকে আছে।”F

প্রাচীন ভারতীয় রচনাসমূহে শিবের উল্লেখ: প্রাচীন বৌদ্ধগ্রন্থ দীঘনিকায় গ্রন্থে ঈশানের নাম কীর্তিত রয়েছে। ড. জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত অনুসারে, বৌদ্ধ নিদ্দেস গ্রন্থটিতে দেব নামক যে দেবতার কথা বলা হয়েছে, তিনিই শিব। পাশাপাশি হিউয়েন সাঙ-এর লেখা, পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী, পতঞ্জলির মহাভাষ্য, রামায়ণ ও মহাভারতেও শিব এবং তাঁর অনুগামীদের কথা স্থান পেয়েছে।

শৈব ধর্মের প্রসার

ভারতবর্ষে সুপ্রাচীনকাল থেকে যে শৈব উপাসনার সূচনা হয়েছিল, ধীরে ধীরে তা আরও প্রসার লাভ করে। যথা-

  • পাণিনি, পতঞ্জলি ও মেগাস্থিনিসের রচনাবলি থেকে জানা যায় যে, মৌর্য ও শুঙ্গ রাজাদের আমলে উত্তর ভারতে শৈব ধর্ম বিশেষ জনপ্রিয় ছিল।
  • কুষাণ রাজাদের মুদ্রাতেও (উদাহরণ- বিম কদফিসেস) শিবের মূর্তি বা ষাঁড়ের প্রতিকৃতি খোদিত হত।
  • গুপ্তরাজা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মথুরা স্তম্ভলেখতে দুটি শিবমূর্তি প্রতিষ্ঠার কথা উৎকীর্ণ হয়েছে।
  • এ ছাড়া দক্ষিণ ভারতের সঙ্গমসাহিত্যে শৈবসাধনার উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের সাহিত্য সিলপ্পাদিকরম ও মনিমেকলই-তেও তামিল অঞ্চলে শিবপূজার উল্লেখ আছে।

শৈব ধর্মের বিবিধ সম্প্রদায় বা ধারাসমূহ

পাশুপত ধর্ম ও সম্প্রদায়: সম্ভবত মহাভারতের যুগ থেকে (খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক) পূর্বের শিব, রুদ্র বা সমজাতীয় দেবতাদের বিচ্ছিন্ন উপাসনা একটি সুনির্দিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করে এবং বিচ্ছিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, পূজাপদ্ধতি এবং ধ্যানধারণা সংহতি লাভ করে। এর ফলস্বরূপ খ্রিস্টীয় প্রথম শতক থেকে চতুর্থ শতক নাগাদ পাশুপত ধর্ম নামে শৈব ধর্মের একটি পর্যায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ঐতিহাসিকদের মতে, মহাদেবের ২৮তম ও শেষ অবতার বলে পুরাণে কথিত লকুলীশ দ্বিতীয় শতক নাগাদ প্রচলিত শৈব আচার-অনুষ্ঠানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত ধর্মই হল পাশুপত। পাশুপত ধর্মের আদি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় পাশুপত সূত্র গ্রন্থ থেকে। গুপ্ত যুগে কৌন্ডিন্য এই গ্রন্থের ভাষ্য লেখেন। এরই ভিত্তিতে মাধবাচার্য ‘শৈব-পাশুপত’ ধর্মের ব্যাখ্যাকে জনপ্রিয় করে তোলেন।

শৈব-পাশুপত ধর্মতত্ত্ব: শৈব-পাশুপত ধর্মের পাঁচটি মূলবস্তু হল- কার্য, কারণ, যোগ, বিধি ও দুঃখান্ত। শৈব-পাশুপত ধর্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল দুঃখান্ত। শৈব ধর্মের এই শাখার প্রধান বিধি হল চর্যা, যা দুই ভাগে বিভক্ত – ব্রত ও দ্বার। পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের বিবরণী, আর্য উদিতাচার্যের লেখমালা, চিন্ত্রপ্রশস্তি ইত্যাদি থেকেও পাশুপত সম্প্রদায় ও পাশুপতাচার্যদের কথা জানা যায়।

নায়নার সম্প্রদায়: নায়নাররা (নায়নার- শিবের শিকারি কুকুর । শৈব ধর্ম শিক্ষক) হলেন দক্ষিণ ভারতের একটি শৈব সাধক সম্প্রদায়। এঁরা তামিল ভাষায় ভক্তিগীতি রচনা করে শৈব ধর্মকে পৌঁছে দিতেন সাধারণ মানুষের কাছে।

সাধকগণ : ঐতিহ্য অনুসারে ৬৩ জন নায়নার সাধকের নাম পাওয়া যায়। ষষ্ঠ শতকে আবির্ভূত তিরুমুলর ছিলেন এঁদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতিমান। এ ছাড়া অপ্পর, সম্বন্দর, মাণিক্যবাচকর, সুন্দরর ছিলেন নায়নার সাধকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

নায়নার সাধকদের রচনাগুলিকে সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করেন শৈব ধর্মগুরু নম্বি অন্ডার নম্বি। পেরিয়া পুরনম সাহিত্যে ৬৩ জন শৈবসাধকের জীবনী ও কীর্তিকলাপ লিপিবদ্ধ রয়েছে। এঁদের মধ্যে উচ্চবর্ণের পাশাপাশি নিম্নবর্ণের মানুষরাও ছিলেন।

শৈব সিদ্ধান্ত বা তামিল শৈব ধর্ম

নায়নার সাধক তিরুমুলর, অপ্পর, সম্বন্দর, মাণিক্যবাচকর, সুন্দরর প্রমুখের রচনাবলির উপর ভিত্তি করে কালক্রমে দক্ষিণ ভারতে একটি বিশেষ শৈব মতবাদ গড়ে উঠেছিল। এটি শৈব সিদ্ধান্ত নামে পরিচিত। শৈব সিদ্ধান্ত মতে, জগৎ সৃষ্টির প্রধান উপকরণ হল মায়া। ম্যেকণ্ডদেব, অরুণন্দি, উমাপতি এবং মরয়জ্ঞানসম্বন্ধ – এই চারজন শিবাচার্য ছিলেন শৈব সিদ্ধান্ত মতের প্রধান প্রবক্তা। ম্যেকণ্ডদেবের উপর আরোপিত শিবজ্ঞানবোধম্ হল শৈব সিদ্ধান্তবাদীদের মৌলিক গ্রন্থ।

আগমান্ত শৈব ধর্ম

খ্রিস্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতক থেকে দক্ষিণ ভারতে উদ্ভব ঘটে আগমান্ত শৈব ধর্মের। চোল নৃপতিগণ আগমান্ত শৈবাচার্যদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। দ্বাদশ শতকে অঘোর শিবাচার্য বিরচিত ক্রিয়াকর্মদ্যোতিনী হল এই ধারার প্রামাণ্য গ্রন্থ। ‘তন্ত্র’ দ্বারা প্রভাবিত আগমান্ত শৈবগণ ছিলেন জাতিপ্রথার বিরোধী এবং এঁরা ত্রিতত্ত্ব অর্থাৎ, পতি (শিব), পশু (জীব) ও পাশ (বন্ধন)-এ বিশ্বাসী ছিলেন।

বীরশৈব বা লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়

দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক অঞ্চলে বীরশৈব বা লিঙ্গায়েত নামে এক ধরনের জঙ্গি শৈব ধর্ম গড়ে উঠেছিল। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে শ্রীবাসব (১১৩১-১১৬৭খ্রিস্টাব্দ) এবং তাঁর ভাগিনেয় চন্নবাসব বা চম্নবাসব-এর নেতৃত্বে লিঙ্গায়েত বা প্রাচীন সন্ন্যাসী বীরশৈবদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল এক চরমপন্থী আন্দোলন।

বাসব (বাসবল্লা): বাসব তথা বাসবন্না ছিলেন কল্যাণের চালুক্যরাজ (মতান্তরে কলচুরিরাজ) বিজ্জলের মন্ত্রী। তিনিই বহু পুরোনো যুগের ঐতিহ্যবাহী লিঙ্গায়েত ধর্মকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ দিয়েছিলেন। ১১৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শিবানুভব মণ্ডপ নামক একটি সংস্থা। বাসবের উপদেশসমূহের সংকলন বচন নামে খ্যাত।

মূল আদর্শ: বীরশৈব ধর্মের মূল আদর্শ হল- “সর্বেষাং স্থান ভূতত্বাল লয় ভূতত্ত্বতস্তথা। তত্ত্বানাং মহদাদিনাং স্থলমিত্যভিধীয়তে।।” এর অর্থ হল- দৃশ্যমান জগতের যিনি আদি কারণ, তিনি হলেন স্থল। এখানে ‘স্থ’ অর্থাৎ, স্থিতি এবং ‘ল’ মানে লীন।

লিঙ্গায়েত বা বীরৗশন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য: বীরশৈব বা লিঙ্গায়েত গোষ্ঠী-

  • মানুষের মুক্তির জন্য ভক্তিবাদের উপর জোর দিয়েছিলেন।
  • এঁরা ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যাবতীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আচার-অনুষ্ঠান বর্জন করেন।
  • এঁরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শরীরে শিবলিঙ্গ ধারণ করেন। কোনোরকম গায়ত্রী মন্ত্রপাঠ বা উপবীত ধারণ বীরশৈবরা করতেন না।
  • এঁদের কাছে জাতপাতের ঊর্ধ্বে মানুষের সমতা গুরুত্ব পেয়েছিল।
  • লিঙ্গায়েতরা বাল্যবিবাহের প্রতিবাদ করেছিলেন এবং অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদে সম্মতি দিয়েছিলেন।

অন্যান্য সম্প্রদায়: উপরোক্ত শৈববাদের ধারাগুলি ছাড়াও নবম শতকে আবির্ভূত কাশ্মীর শৈববাদ উল্লেখযোগ্য। শিবসূত্র গ্রন্থের রচনাকার বসুগুপ্ত ছিলেন কাশ্মীর শৈববাদের প্রবক্তা। এ ছাড়া শৈব ধর্মের দার্শনিক নিম্নতলে অবস্থিত সম্প্রদায়গুলি হল- কাপালিক, কালামুখ, মত্তময়ূর ইত্যাদি। সপ্তম শতকে চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, নাসিক অঞ্চলে কালামুখাদি বা কালামুখ সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। অধ্যাপক নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী দেখিয়েছেন, খ্রিস্টীয় নবম, দশম ও একাদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতে কালামুখ সম্প্রদায় বিশেষ সক্রিয় ছিল। অন্যদিকে মধ্যভারতের ত্রিপুরি এলাকায় ছিল মত্তময়ূরদের সাধনক্ষেত্র। ঈশান শিব প্রণীত ঈশান শিব গুরুদেব পদ্ধতি গ্রন্থে এই সম্প্রদায়ের দর্শনতত্ত্ব বর্ণিত রয়েছে।

আরও পড়ুন : বিড়াল প্রবন্ধ MCQ প্রশ্ন উত্তর

আরও পড়ুন প্রয়োজনে
আঞ্চলিক শক্তির উত্থান প্রশ্ন উত্তর – ইতিহাস প্রথম অধ্যায় Class 8 | ancholik shoktir utthan question answer Click here
জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় হিউমের ভূমিকা আলোচনা করো (Exclusive Answer) Click here
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের চরিত্র ও প্রকৃতি | The character and nature of the 1857 rebellion Click here
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব কেমন ছিল | Attitude of educated Bengali society towards the Great Revolt of 1857 Click here

Leave a Comment