কলকাতা বইমেলা – মানস মানচিত্র অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা

মেলা বঙ্গসংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। মেলা বাঙালির মহামিলনস্থল। মেলায় বাঙালি পেয়েছে সঞ্জীবনী প্রাণশক্তি। একদা একটি মেলাকে কেন্দ্র করে বাংলার নবজাগরণ দেখা দিয়েছিল। সেটি নবগোপাল মিত্র মহাশয়ের ‘হিন্দুমেলা‘। বর্তমানে ‘বইমেলা’-কে কেন্দ্র করেও বলা যায় একটা জাগরণ দেখা দিয়েছে শহরে, নগরে, গ্রামে-গঞ্জে।
জ্ঞানের প্রসারের ক্ষেত্রে বই হল একটি বড়ো মাধ্যম। তাই ইংল্যান্ড, আমেরিকা, জার্মানি প্রভৃতি স্থানে প্রতি বছর বৃহৎ জাতীয় মেলার অঙ্গ-স্বরূপ বইয়ের প্রদর্শনী বসে। পরবর্তীকালে একক ও স্বতন্ত্র মেলা রূপে বইমেলা প্রচলিত হয়। পৃথিবীর বইমেলাগুলির মধ্যে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের স্থায়ী বইমেলাটি সবচেয়ে বড়ো। কলকাতায় প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৪ ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম পর্বে বইমেলা অনুষ্ঠিত হত পার্কস্ট্রিট-সংলগ্ন ময়দানে,
পরবর্তীতে তা স্থানান্তরিত হয় বাইপাসের পার্শ্ববর্তী মিলনমেলা প্রাঙ্গণে। শেষ দু-বছর অর্থাৎ ২০১৮ ও ২০১৯ কলকাতা বইমেলা আয়োজিত হয়েছে সেন্ট্রাল পার্ক-সংলগ্ন অঞ্চলে। ২০২০-তে অতিমারি কোভিড-১৯-এর প্রভাবে কলকাতা বইমেলার আয়োজন সেই যে বন্ধ হয়েছে, তা ২০২১ খ্রিস্টাব্দেও অব্যাহত ছিল। তবে ২০২২ থেকে কলকাতা বইমেলা দেরি করে হলেও আবার তার পুরোনো চেহারা ফিরে পেয়েছে। ২০২২-এর কোভিড-পূর্ব সময়ের মতোই মেলায় ছিল পুরোনো জৌলুস, মাঠ-জুড়ে বইপ্রেমী মানুষের ভিড় এবং বই নিয়ে বাঙালির চিরকালীন উন্মাদনার চিরপরিচিত ছবি।
২০২৩-এ কলকাতা বইমেলা একেবারে তার স্বাভাবিক ছন্দেই আত্মপ্রকাশ করে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কলকাতা শহরের, গ্রাম-মফস্সলের মানুষেরাও সল্টলেকে মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় জমায়। তরুণ কবিদের নতুন কবিতার বইয়ের উদ্বোধন থেকে প্রতিষ্ঠিত কবি-লেখকদের বইয়ের জন্য হুড়োহুড়ি-এসব কোনোকিছুই বাদ ছিল না। গিল্ডের কর্তাব্যক্তিদের মতে মানুষের ভিড় এবং বই কেনার অর্থমূল্যের পরিমাণ নাকি বিগত বছরের সমস্ত রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেছে। অর্থাৎ মহামারির চোখরাঙানিকে অতিক্রম করে কলকাতা বইমেলা ফিরে পেয়েছে তার স্বাতন্ত্র্য এবং বিশেষত্ব।
শিক্ষিত মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম রসদ হল বই। বই হল আয়নার মতো, যাতে আমাদের মনের প্রতিবিম্ব ধরা পড়ে। বইয়ের মতো অন্তরঙ্গ সহচর পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আমাদের নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলিকে বই আনন্দে ভরিয়ে তোলে। শিশু-কিশোরের কাছে বই দিগ্দর্শনের কাজ করে। তবে বইমেলা সাধারণভাবে অনুষ্ঠিত রথের মেলা, গাজন মেলা প্রভৃতি মেলাগুলি থেকে একটু স্বতন্ত্র। এটি বইপ্রেমী মানুষের মিলনতীর্থ।
বইকে কেন্দ্র করে বইমেলা প্রাঙ্গণে এক হৃদ্য পরিবেশে সামাজিক মেলবন্ধন গড়ে উঠতে দেখা যায়। বইমেলায় প্রকাশক এবং পুস্তক বিক্রেতারা বিশ্বের নানা প্রান্তের নানা বিষয়ের বই এনে বিভিন্ন রুচির মানুষের সামনে হাজির করেন। সাধ আছে সাধ্য নেই, এমন বইপ্রেমী মানুষ বইমেলায় এসে বিভিন্ন বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। বইমেলা জ্ঞানের অসীম ভান্ডারকে আমাদের সামনে উন্মুক্ত করে দেয়। বইমেলার উপযোগিতা দ্বিবিধ। বইমেলায় পাঠক বিপুলসংখ্যক বইয়ের সান্নিধ্যে এসে যেমন আনন্দ পায়, তেমনি প্রকাশক ও বিক্রেতারা বাণিজ্য করার সুযোগে সামগ্রিকভাবে লাভবান হন।
পৃথিবীর সবদেশেই এখন বইমেলা বসে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও বইমেলার আয়োজন হয়। কলকাতার বইমেলা আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে ‘পশ্চিমবঙ্গ গ্রন্থমেলা’ অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় তিন-চার দিনের বইমেলাও হয়। এইসব মেলায় মফস্সল গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ ভিড় করেন। যাঁরা সবসময় বই কেনা বা পড়ার সুযোগ পান না, এইসব মেলায় এসে তাঁরা বহু নতুন বই হাতে করে দেখতে ও পড়তে পারেন। কলকাতার বইমেলা প্রায় তিন-চার দশক ধরে চলে আসছে। বই পড়তে উৎসাহ দেওয়ার পক্ষে এই মেলার ভূমিকা ভোলার নয়।
বইমেলা আসলে আনন্দমেলা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “মানুষ বই দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে সাঁকো বেঁধে দিয়েছে।” ভিক্টর হুগো বলেছেন, “বই বিশ্বাসের অঙ্গ, বই মানবসমাজকে সভ্যতা টিকিয়ে রাখার জ্ঞান দান করে। অতএব বই হচ্ছে সভ্যতার রক্ষাকবচ।” সভ্যতার প্রতিবিম্বকে স্থায়ীরূপে ধরে রাখে বই। সুখে-দুঃখে, সুন্দরে-অসুন্দরে, ভালো-মন্দে মানুষের জীবন। এক-একটা বই যেন এক-একটা জীবনের চলমান প্রতিবিম্ব। অনন্ত মানুষের অফুরন্ত জীবন নিয়েই মানুষের পরিপূর্ণ মহাজীবন। সেই মহাজীবনের মেলা ‘বইমেলা’। বইকে সর্বজনীন করার জন্য বইমেলার গুরুত্ব অপরিসীম। বইমেলা নবীন লেখকদের কাছে প্রতিভা-বিকাশের মুক্তমেলা। নবীন লেখকদের রচনা প্রকাশিত হয় বইমেলায়। তা ছাড়া এই মেলা উপলক্ষ্যে শিল্পী-কলাকুশলীরাও তাঁদের সৃষ্টিসম্ভার নিয়ে উপস্থিত হতে পারেন। এইভাবে বইমেলা প্রকৃতই এক মিলনমেলা হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন – মধ্যযুগীয় ভারতের শিক্ষা প্রশ্ন উত্তর