প্রত্যক্ষণের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো | শিক্ষায় প্রত্যক্ষণের তাৎপর্য (Class 11 Exclusive )

অর্থপূর্ণ সংবেদন হল প্রত্যক্ষণ। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আলোকরশ্মি কোনো বস্তুর ওপরে প্রতিফলিত হয়ে স্নায়ুতন্ত্রের মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কের দর্শনকেন্দ্রে পৌঁছোলে বস্তুর দর্শন সংবেদন ঘটে। আর বস্তুটির নাম, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতন হওয়াকে বলে প্রত্যক্ষণ। একইভাবে কোনো শব্দ শ্রবণ করা হল সংবেদন, আর শব্দটি কীসের, এর উৎস কোথায় ইত্যাদি সম্পর্কে জানা হল প্রত্যক্ষণ। সংবেদনে বস্তুর উপস্থাপন হয় মাত্র। কিন্তু প্রত্যক্ষণে বস্তুর উপস্থাপন ও পুনরুত্থাপন দুই-ই হয়ে থাকে।

প্রত্যক্ষণের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো
প্রত্যক্ষণের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো

প্রত্যক্ষণের সংজ্ঞা

  • স্টাউট (Stout)-এর মতে, প্রত্যক্ষণ একাধিক সংবেদনের সমন্বয়ে গঠিত।
  • পিলস্বারি (Pillsbury)-র মতে, প্রত্যক্ষণ হল সংবেদন ও স্মৃতির সংমিশ্রণ।
  • সমগ্রতাবাদীরা বলেন, প্রত্যক্ষণ কয়েকটি সংবেদনের সমন্বয় নয়। অভিজ্ঞতার সুসংবদ্ধ রূপই হল প্রত্যক্ষণ।

প্রত্যক্ষণের স্তর

প্রত্যক্ষণকে বিশ্লেষণ করে নিম্নলিখিত কয়েকটি স্তর পাওয়া যায়-

(1) পৃথকীকরণ: 

প্রত্যক্ষণের প্রথম স্তরে সংবেদনটিকে পৃথক করা হয়। এই স্তরে একদিকে যেমন সংশ্লিষ্ট সংবেদনকে অন্যান্য সংবেদন থেকে পৃথক করা হয়, অন্যদিকে তেমনই সংবেদন সৃষ্টিকারী বস্তুটিকে অন্যান্য সমজাতীয় বস্তু থেকে পৃথক করা হয়। যেমন, একটি কলম দেখলাম-কলম দেখা দর্শন সংবেদন, শ্রবণ বা ঘ্রাণজ সংবেদন নয়। এইভাবে সংশ্লিষ্ট সংবেদনকে অন্যান্য সংবেদনের দিক থেকে পৃথক করা হয়। আবার এটি যে কলম-খাবার, বই, খাতা ইত্যাদি অন্যান্য সমজাতীয় বস্তু থেকে পৃথক তা মনে করা হয়।

(2) সদৃশকরণ: 

এটি প্রত্যক্ষণের দ্বিতীয় স্তর। এই স্তরে বস্তু সম্পর্কে বর্তমান সংবেদনের সঙ্গে পূর্ব অর্জিত সংবেদনগুলির সাদৃশ্য অনুসন্ধান করা হয়।

(3) অনুষঙ্গ ও পুনরুত্থাপন: 

এই স্তরে অভিজ্ঞতার পুনরুত্থাপন ঘটে এবং পূর্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান অভিজ্ঞতার অনুষঙ্গ স্থাপিত হয়।

(4) স্থান-কাল নির্দেশ: 

এই স্তরে সংবেদনটির স্থান ও কাল নির্দেশ করা হয়। এখানে সংবেদনটি বহির্জগতের কোথা থেকে এবং কখন উৎপন্ন হয়েছে তা স্থির করা হয়।

(5) বিশ্বাস: 

প্রত্যক্ষণের শেষ স্তর হল বিশ্বাস স্থাপন। প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়, সেই বিষয়ে প্রত্যয়ই হল বিশ্বাস। এই স্তরেই প্রত্যক্ষণ সম্পূর্ণতা লাভ করে।

ওপরের আলোচনা থেকে বলা যায় পৃথকীকরণ, সদৃশকরণ, অনুষঙ্গ ও পুনরুত্থাপন, স্থান-কাল নির্দেশ এবং বিশ্বাস এই পাঁচটি স্তরের মধ্য দিয়ে সংবেদন প্রত্যক্ষণের রূপ নেয়।

প্রত্যক্ষণের বৈশিষ্ট্য

দার্শনিক ও মনোবিদগণ প্রত্যক্ষণের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। এই বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল-

(1) মানসিক প্রক্রিয়া: 

প্রত্যক্ষণে দু-ধরনের জ্ঞানমূলক মানসিক ক্রিয়া সম্পাদিত হয়-অবগতি ও প্রত্যাভিজ্ঞা। অবগতি বস্তুর অস্তিত্বকে প্রকাশ করে আর প্রত্যাভিজ্ঞা বস্তুকে চিনতে সাহায্য করে।

(2) চারটি ধর্মবিশিষ্ট প্রক্রিয়া: 

প্রত্যক্ষণের চারটি ধর্ম আছে-গুণ, তীব্রতা, ব্যাপ্তি এবং স্থায়িত্ব। প্রত্যক্ষণের গুণ বলতে বোঝায় এটি কী প্রকৃতির সংবেদনজাত, অর্থাৎ দর্শন, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ না ত্বক সম্পর্কীয় সংবেদন। তীব্রতা বলতে গুণের তীব্রতা বোঝায়-গাঢ় রং বা হালকা রং, আস্তে শব্দ না জোরে শব্দ ইত্যাদি। প্রত্যক্ষণ কতটা স্থানে ছড়িয়ে আছে, তাকে প্রত্যক্ষণের ব্যাপ্তি বলে। প্রত্যক্ষণের অস্তিত্ব যতটা সময় ধরে থাকে, তাকে বলে প্রত্যক্ষণের স্থায়িত্ব।

(3) পুনরুৎপাদনমূলক প্রক্রিয়া: 

প্রত্যক্ষণ পুনরুৎপাদনমূলক মানসিক প্রক্রিয়া। বর্তমান সংবেদনের সঙ্গে পূর্বার্জিত প্রত্যক্ষণের অনুষঙ্গ থাকায় পূর্বের অভিজ্ঞতাটির পুনরুৎপাদন ঘটে, যা নতুন সংবেদনের অর্থ বুঝতে সাহায্য করে অর্থাৎ সংবেদনটি প্রত্যক্ষণে রূপ নেয়।

(4) ব্যক্তিভেদে পৃথক: 

ব্যক্তিভেদে প্রত্যক্ষণে পার্থক্য দেখা যায়। একই বস্তু বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে প্রত্যক্ষণ করে। দৈহিক ও মানসিক অবস্থা, প্রত্যাশা এবং অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যক্তিগত পার্থক্য থাকায় একই বস্তুর প্রত্যক্ষণের মধ্যে পার্থক্য দেখা দেয়।

(5) সক্রিয় প্রক্রিয়া: 

প্রত্যক্ষণ একটি সক্রিয় মানসিক প্রক্রিয়া। ব্যক্তির সক্রিয়তা ছাড়া প্রত্যক্ষণ সম্ভব নয়। পরিবেশে কোনো বস্তু থেকে কিছু সংকেত-সহ উদ্দীপনা প্রাণীর মধ্যে আসে। প্রাণী সেই সংকেত বুঝতে পারে, ফলে প্রত্যক্ষণের সৃষ্টি হয়।

(6) মনোযোগের সঙ্গে সম্পর্ক:

প্রত্যক্ষণ মনোযোগনির্ভর। কারণ প্রত্যক্ষণের জন্য অপরিহার্য সংবেদনের বৈশিষ্ট্যাবলি বিশ্লেষণ, যা মনোযোগ ব্যতীত সম্ভব নয়।

(7) সুসংবদ্ধ প্রক্রিয়া: 

প্রত্যক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এটি সুসংবদ্ধ সামগ্রিক অভিজ্ঞতা। স্টাউট প্রমুখের মতে প্রত্যক্ষণ অনেকগুলি সংবেদনের যোগফল।

(8) স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্ক: 

প্রত্যক্ষণ একটি পুনরুৎপাদনমূলক প্রক্রিয়া হওয়ায় এক্ষেত্রে স্মৃতির ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

(9) পটভূমির সঙ্গে সম্পর্ক: 

প্রত্যক্ষণে কোনো বস্তুর প্রত্যক্ষণের সময় বিশেষ পটভূমিতে অবয়বরূপে দেখি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো দৃশ্যপটের সামনে ছবি থাকলে দৃশ্যপটটিকে পটভূমি বা ক্ষেত্র এবং ছবিকে অবয়ব বলা হয়।

সমগ্রতাবাদীরা এর বিরোধিতা করে বলেন, প্রত্যক্ষণ সামগ্রিক অভিজ্ঞতা, একাধিক অভিজ্ঞতার সমষ্টি নয়। তাঁরা পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে, সামগ্রিকভাবে প্রত্যক্ষণ করার প্রবণতা সমস্ত প্রাণীর মধ্যেই দেখা যায়।

শিক্ষায় প্রত্যক্ষণের তাৎপর্য

আধুনিক শিক্ষায় প্রত্যক্ষণের গুরুত্ব একদিকে যেমন শিক্ষার্থীকে বস্তুধর্মী অভিজ্ঞতা লাভে সাহায্য করে, তেমনই বস্তুর সামগ্রিক রূপটিকে শিক্ষার্থীর কাছে তুলে ধরে। এর ফলে শিখন সহজ ও স্থায়ী হয়। প্রত্যক্ষণের কয়েকটি শিক্ষামূলক গুরুত্ব নীচে উল্লেখ করা হল-

(1) শিখনের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী: 

সঠিক প্রত্যক্ষণ একদিকে যেমন শিখনকে সহজ করে তোলে, অন্যদিকে প্রত্যক্ষণ যদি অসম্পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট শিখনে শুধু অসুবিধা হয় তা-ই নয়, পরবর্তী শিখনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

(2) অনুকরণের ক্ষেত্রে আবশ্যক:

শৈশবকালীন শিখনের একটা বড়ো অংশ ঘটে অনুকরণের মাধ্যমে। শিক্ষক এবং অভিভাবক এখানে ‘রোল মডেল’ হিসেবে কাজ করেন, শিশু যাকে বা যাদের অনুকরণ করবে তাদের প্রত্যেকটি আচার-আচরণ সে প্রত্যক্ষ করে।

(3) দক্ষতা-শিখনে সহায়ক: 

শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হল দক্ষতা-শিখন। নির্দিষ্ট দক্ষতাটি কী উপায়ে সম্পন্ন হচ্ছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রত্যক্ষণ না করলে দক্ষতা-শিখনে সমস্যা দেখা দেয়। তাই প্রত্যক্ষণ দক্ষতা-শিখনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

(4) সমস্যাসমাধান শিখনে সহায়ক: 

সমস্যাসমাধান একটি গুরুত্বপূর্ণ শিখন। সমস্যাপূর্ণ পরিস্থিতিতে কী ধরনের ঘটনাক্রম বা উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়, তার প্রকৃতি কী, অর্জিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য প্রত্যক্ষণ সমস্যাসমাধান শিখনে বিশেষ প্রয়োজন।

(5) পঠনের সহায়ক: 

প্রতিদিনকার পাঠ প্রস্তুতকালে শিক্ষার্থী অবশ্যই পাঠ্য বিষয়গুলিকে যথেষ্ট মনোযোগ সহকারে প্রত্যক্ষণ করবে।

(6) জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগে প্রয়োজনীয়: 

শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হল অর্জিত জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যক্তির অভিযোজনে সাহায্য করা। এটি সম্ভব করতে হলে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা অর্জনকালে বিষয়টির বাস্তব প্রয়োজনীয়তা প্রত্যক্ষ করতে হবে।

(7) সক্রিয়তানির্ভর: 

প্রত্যক্ষণে সক্রিয়তা প্রয়োজন। আর এই সক্রিয়তা শিক্ষার বিভিন্ন নীতির মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি।

ওপরের আলোচনা থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, শিক্ষার উদ্দেশ্যকে সফল করে তুলতে প্রত্যক্ষণের ওপরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রকৃতির শিখনকে সহজ ও স্থায়ী করে তুলতে সুপ্রত্যক্ষণের প্রয়োজন। উত্তম প্রত্যক্ষণ পূর্ব-অভিজ্ঞতা ও বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য তুলে ধরে শিক্ষাপ্রক্রিয়াকে কার্যকরী করে তুলতে সহায়তা করে।

প্রত্যক্ষণমূলক প্রশিক্ষণ

শিখনে প্রত্যক্ষণের প্রভাব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উত্তম শিখনের জন্য প্রয়োজন সঠিক প্রত্যক্ষণ। এর জন্য বর্তমান শিক্ষাবিদগণ প্রত্যক্ষণ প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ইন্দ্রিয় যেহেতু সংবেদনের দুয়ার এবং প্রত্যক্ষণ যেহেতু সংবেদনের ওপর নির্ভরশীল, সেজন্য শৈশবকাল থেকেই ইন্দ্রিয়গুলি তীক্ষ্ণ ও শক্তিশালী করার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের কথা প্রায় সব শিক্ষাবিদই সুপারিশ করেছেন। এই প্রসঙ্গে ফ্রয়েবেল এবং মন্ডেসরির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।

ফ্রয়েবেল তাঁর ‘কিন্ডারগার্টেন’ পদ্ধতিতে উপহার (gift) এবং বৃত্তির (occupation) কথা বলেছেন। মন্তেসরি তাঁর শিক্ষাপদ্ধতিতে স্বয়ংশোধনযোগ্য (didactic) উপাদানের কথা বলেছেন। তিনি দর্শন প্রত্যক্ষণের জন্য বিভিন্ন বর্ণের রেশমি কাপড়ের কথা, উচ্চতা, ঘনত্ব ও ওজনের পার্থক্য নির্ধারণ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের কাঠের টুকরো ব্যবহারের কথা বলেছেন। শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষণ আরও শক্তিশালী করতে এবং পাঠ্য বিষয়বস্তুকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য বর্তমানে শিক্ষকরা বিভিন্ন ধরনের শ্রুতিনির্ভর, দর্শননির্ভর, শ্রাব্য-দৃশ্যনির্ভর ইত্যাদি শিক্ষাপোকরণের সাহায্য নিয়ে থাকেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষণ হয়। অসংখ্য বিষয়বস্তুর মধ্যে যাতে শিক্ষার্থীরা প্রাসঙ্গিক প্রত্যক্ষণের বিষয়টিকে নির্দিষ্ট করতে পারে সে-ব্যাপারে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নির্দেশনা দেবেন। শিক্ষার্থীরা যাতে ভ্রান্ত প্রত্যক্ষণের শিকার না হয়, সেজন্য নিখুঁত প্রত্যক্ষণের কৌশলগুলি শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বোঝাবেন। সবচেয়ে বড়ো কথা হল, প্রত্যক্ষণে দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রত্যক্ষণ অনুশীলনে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে হবে।

আরও পড়ুনLink
নৈতিক প্রত্যয়সমূহ প্রশ্ন উত্তরClick Here
চার্বাক সুখবাদ প্রশ্ন উত্তরClick Here
পাশ্চাত্য নীতিবিদ্যা প্রশ্ন উত্তরClick Here

Leave a Comment