চার্বাক সুখবাদ প্রশ্ন উত্তর

চার্বাক’ কথার অর্থ কী?
অনেকে বলেন, চার্বাকদের কথা (বাক) জনসাধারণের কাছে মধুর (বা চারু) লাগত বলে ‘চারু বাক’ কথাটি থেকে চার্বাক কথার উদ্ভব হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন ‘চর্ব’ ধাতু থেকে চার্বাক কথাটি এসেছে। ‘চর্ব’ মানে চর্বণ করা। চার্বাকরা দৈহিক ভোগবাদী। চর্ব, চোষ্য, লেহ্য, পেয় প্রভৃতি যাবতীয় বস্তু ভোগ করাকেই তারা পুরুষার্থ বলে মনে করেন। তাই তাদের নাম চার্বাক। আবার কেউ কেউ বলেন চারু হল বৃহস্পতির অপর নাম। এই জন্য চার্বাক দর্শনকে অনেকে বার্হস্পত্য দর্শনও বলে থাকেন।
চার্বাক মতের উল্লেখ আছে এমন গ্রন্থগুলির নাম লেখো।
বিভিন্ন ভারতীয় দর্শনে চার্বাক দর্শন সম্প্রদায়ের মতকে পূর্বপক্ষরূপে উল্লেখ করে তাদের মত খণ্ডন করা হয়েছে। মূলত সেইসকল গ্রন্থেই চার্বাক দর্শনের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন- নৈয়ায়িক জয়ন্তভট্টের ‘ন্যায়মঞ্জুরী’, বৌদ্ধ দার্শনিক শান্তরক্ষিতের ‘তত্ত্বসংগ্রহ’ ও কমলশীলের ‘তত্ত্বসংগ্রহপঞ্জিকা’। এ ছাড়াও জৈন দার্শনিক হরিভদ্রসুরির ‘ষড়দর্শনসমুচ্চয়’, মাধবাচার্যের ‘সর্বদর্শনসংগ্রহ’ ইত্যাদি গ্রন্থেও চার্বাক মতের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর সঙ্গে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে, ব্যাসদেবের পদ্মপুরাণ ও বিন্নুপুরাণে, রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডে, মহাভারতের শান্তিপর্বে, মনুসংহিতায়, বৌদ্ধ ত্রিপিটকে চার্বাক মতের উল্লেখ পাওয়া যায়।
চার্বাক দর্শনের সমর্থক গ্রন্থগুলি কী কী?
চার্বাক দর্শন সম্প্রদায়ের আকর গ্রন্থগুলির কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না। তবে চার্বাক দর্শনের সমর্থক কিছু গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায় অন্যান্য গ্রন্থের মাধ্যমে। চার্বাকদের সমর্থক গ্রন্থগুলি হল দেবগুরু বৃহস্পতি রচিত ‘বার্হস্পত্যসূত্রম’, সায়নমাধব রচিত ‘চার্বাক দর্শনম্’, জয়রাশিভট্ট রচিত ‘তত্ত্বোপপ্লবসিংহ’, মাধবাচার্য রচিত ‘চার্বাকষষ্টি’ ইত্যাদি।
চার্বাক দর্শনকে লোকায়তিক বলা হয় কেন?
সাধারণ লোক ইন্দ্রিয়সুখ ও জাগতিক পদার্থে কামনা-বাসনাকেই জীবনের মূল লক্ষ্য বলে গণ্য করে। তাদের কাছে এই জীবনের ওপারে পারলৌকিক সকল কিছুই অর্থহীন এবং কিছু ক্ষেত্রে অস্বীকার্য। সাধারণ লোকেদের এইপ্রকার চিন্তাধারার প্রতিফলনই যেন দেখা যায় চার্বাক দর্শনে। চার্বাক মতবাদ শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই চার্বাক দর্শনকে বলা হয় ‘লোকায়তিক’ বা ‘লোকায়ত দর্শন’।
স্বভাববাদ কাকে বলে? অথবা, চার্বাক জড়তত্ত্বের অপর নাম স্বভাববাদ কেন?
চার্বাক মতে ক্ষিতি, অপ্, তেজ ও মরুৎ এই চতুর্ভূত নিজ নিজ স্বভাববশেই পরস্পর সংযুক্ত হয়ে এই বৈচিত্র্যময় জগতের উৎপত্তি ঘটিয়েছে। চতুর্ভূতের সমন্বয়ে দেহ সৃষ্টি হলে সেই মুহূর্তেই আগন্তুক ধর্মরূপে দেহে চৈতন্যের আগমন ঘটে, আবার দেহের বিনাশ হলে চৈতন্যও বিনষ্ট হয়। চার্বাকদের এই জড়তাত্ত্বিক মতবাদ হল স্বভাববাদ।
দেহাত্মবাদের পক্ষে চার্বাকদের যুক্তি কী?
চার্বাকদের আত্মা সম্পর্কিত মতবাদ হল দেহাত্মবাদ। এই মতবাদের মূল বক্তব্য হল ‘দেহই আত্মা’ অর্থাৎ দেহের অতিরিক্ত নিত্য আত্মা বলে কিছু নেই। দেহের সৃষ্টিতেই চৈতন্যের আবির্ভাব এবং দেহের বিনাশেই চৈতন্য বা আত্মার বিনাশ। চার্বাকদের এইরূপ মতবাদের পক্ষে প্রধান যুক্তি হল এই যে, দেহকে আমরা প্রত্যক্ষের দ্বারা জানতে পারি, কিন্তু দেহ অতিরিক্ত আত্মাকে প্রত্যক্ষের দ্বারা জানা যায় না আর প্রত্যক্ষ ভিন্ন অন্য প্রমাণ চার্বাকরা স্বীকার করেন না। তাই চার্বাক মতে দেহই আত্মা।
চার্বাকদের কেন ‘বিষয়রসে মগ্ন’ বলা হয়?
অধিকাংশ ভারতীয় দর্শন সম্প্রদায়ের অন্যতম লক্ষ্য হল মোক্ষ বা মুক্তি লাভ করা। এই মুক্তি হল জাগতিক সকল দুঃখ থেকে মুক্তি। জাগতিক বস্তুগুলির থেকে সুখ লাভের আকর্ষণে মানুষ প্রায়ই সেই পথে ধাবিত হয়। তবে এই সুখের সঙ্গে মিশ্রিত থাকে দুঃখ। তাই এই আকর্ষণকে দমন করার পথ ভারতীয় দর্শনে দেখানো হয়। কিন্তু চার্বাক দার্শনিকগণ এই পথের সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে গিয়ে জাগতিক বিষয়ের রসে মগ্ন হয়ে সেখানেই চরম শান্তি খোঁজে।
সুখবাদ কাকে বলে?
দৈনন্দিন জীবনে আমরা যেসকল কর্ম করে থাকি তার ভালো-মন্দ বিচারের জন্য বিভিন্ন মানদণ্ডের প্রয়োজন হয়। যে মতবাদ অনুসারে সুখই পরমকল্যাণ, নৈতিক আদর্শ, নৈতিক বিচারের মাপকাঠি, যার সাহায্যে মানুষের কাজের নৈতিক বিচার করে ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত মূল্যায়ন করা হয় সেই মতবাদকে সুখবাদ বলা হয়।
সুখবাদকে কয়ভাগে ভাগ করা যায় ও কী কী?
সুখবাদকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়- আত্মসুখবাদ ও পরসুখবাদ। আত্মসুখবাদ অনুসারে কর্মকর্তার নিজের সুখই একমাত্র কাম্যবস্তু। তাই যে কাজ করলে তার নিজের সুখ লাভ হবে সেই কাজই তার পক্ষে উচিত কাজ। অপরপক্ষে, পরসুখবাদ অনুসারে শুধুমাত্র নিজের সুখ নয় যে কাজ করলে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের সর্বাধিক সুখ লাভ হবে সেই কাজ করাই কর্তব্য।
চার্বাক নীতিতত্ত্বের মূলকথা কী? অথবা, চার্বাক নীতিতত্ত্বের মূলসূত্রটি লেখো। অথবা, ‘যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ, ঋনং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’- চার্বাকদের এই উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
চার্বাক মতে, বর্তমানের তীব্রতম দেহসর্বস্ব ইন্দ্রিয়সুখই মানুষের চরম কাম্যবিষয়। তাই যে কাজ ইন্দ্রিয় সুখলাভ সহায়ক সেই কাজই ভালো, সেই কাজই করা উচিত এবং যে কাজ সহায়ক নয়, সেই কাজ মন্দ, সেই কাজ করা অনুচিত।
” যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ
ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ
ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ।”
অর্থাৎ মৃত্যুভয়ে ভীত না হয়ে যতদিন বাঁচ, সুখে বাঁচ; ঋণ করেও ঘি খাও; একবার দেহ বিনষ্ট হলে তার ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই।’ চার্বাকগণ বলেন, আত্মা, পুনর্জন্ম, পাপ-পুণ্য যখন কিছুই নেই তখন খাও, দাও, মজা করো। এটিই চার্বাক নীতিতত্ত্বের মূলকথা।
চার্বাক নীতিতত্ত্বের নাম সুখবাদ কেন? অথবা, চার্বাক নীতিতত্ত্ব অপর কী নামে পরিচিত?
চার্বাক নীতিতত্ত্বের অপর নাম হল সুখবাদ। প্রত্যক্ষের অতিরিক্ত আর কোনো প্রমাণ স্বীকার না করায় চার্বাকরা চৈতন্যগুণযুক্ত দেহকেই আত্মা বলে মানেন যেহেতু দেহের অতিরিক্ত আত্মা প্রত্যক্ষগ্রাহ্য নয়। এদের মতে তাই দৈহিক সুখ বা কামই হল পরমপুরুষার্থ। সুখকেই একমাত্র কাম্যবস্তু বলে স্বীকার করায় চার্বাক নীতিতত্ত্বের অপর নাম সুখবাদ।
চার্বাকদের সুখবাদী বলা হয় কেন?
চার্বাক দার্শনিকগণ মনে করেন সুখই একমাত্র কাম্যবস্তু। চার্বাক দার্শনিকদের মতে, জীবন একটাই; এক মৃত্যুতেই জীবনের শেষ। তাই যতদিন বাঁচবে, সুখ ভোগ করবে। এই সুখ বলতে চার্বাকগণ মূলত দৈহিক সুখের উপরই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। এই কারণে চার্বাকদের সুখবাদী বলা হয় এবং তাদের নীতিতত্ত্বকে বলা হয় সুখবাদ।
চার্বাকরা কি আত্মসুখবাদী না পরসুখবাদী?
জড়বাদী চার্বাক সম্প্রদায় তাদের জ্ঞানতত্ত্বে প্রত্যক্ষকেই একমাত্র প্রমাণ বলেছেন। দেহের অতিরিক্ত আত্মা প্রত্যক্ষযোগ্য নয়-এই যুক্তিতে দৈহিক সুখলাভকেই একমাত্র পুরুষার্থ বলে স্বীকার করেছেন। যদিও তারা সুখবাদী হলেও আত্মসুখবাদী না পরসুখবাদী তার কোনো স্পষ্ট উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায় না। তবে তাদের সামগ্রিক দর্শন ভাবনা পর্যালোচনা করে তাদের আত্মসুখবাদী বলেই গণ্য করা হয়।
চার্বাকদের স্থূল সুখবাদী বলা হয় কেন?
জ্ঞানতত্ত্বে প্রত্যক্ষকেই একমাত্র প্রমাণ বলে স্বীকার করায় প্রত্যক্ষযোগ্য দেহের অতিরিক্ত আত্মাকে চার্বাক সম্প্রদায় স্বীকার করেননি। কাজেই ভারতীয় দর্শনে স্বীকৃত চারটি পুরুষার্থের মধ্যে কাম বা ইন্দ্রিয় সুখসম্ভোগকেই তারা পরমপুরুষার্থরূপে স্বীকার করেন। ইন্দ্রয়সুখসম্ভোগ বা স্থূল দৈহিক সুখকেই পরমপুরুষার্থ বা কাম্যবস্তু বলে স্বীকার করায় চার্বাক সুখবাদ স্থূল সুখবাদ নামে পরিচিত আর তাই তারা স্থূল সুখবাদী।
চার্বাক নীতিতত্ত্বকে অসংযত আত্মসুখবাদ বলা হয় কেন? অথবা, চার্বাক সুখবাদ সংযত না অসংযত?
সাধারণত সূক্ষ্ম মানসিক সুখকেই সংযত ও স্থূল দৈহিক সুখকে অসংযত আখ্যা দেওয়া হয়। চার্বাকরা দেহের অতিরিক্ত মন বা আত্মাকে স্বীকার করেননি। কেন-না, মন ও আত্মা প্রত্যক্ষযোগ্য নয়। আর চার্বাক মতে প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ। কাজেই এদের কাছে পরম কাম্যবস্তু বা পুরুষার্থ হল কাম বা ইন্দ্রিয় সুখসম্ভোগ। চার্বাক মতে, মানুষের উচিত সেই কাজ করা যে কাজ মানুষকে নিজের জন্য সর্বাধিক সুখ দেবে। তাতে অপরের ক্ষতি হলেও হতে পারে। এইজন্য চার্বাক নীতিতত্ত্বকে বলা হয়েছে অসংযত আত্মসুখবাদ।
চার্বাকরা কয়টি সম্প্রদায়ে বিভক্ত ও কী কী?
চার্বাকদের মূলত তিনটি সম্প্রদায়ে ভাগ করা যায়। যথা- বৈতন্ডিক, ধূর্ত ও সুশিক্ষিত চার্বাকগণ। বৈতণ্ডিক চার্বাকদের আবার লোকায়ত ও তত্ত্বোপপ্লববাদী নামেও অভিহিত করা হয়। ধূর্ত চার্বাকদের স্থূল চার্বাক বলা হয়। সুশিক্ষিত চার্বাকগণ দৈনন্দিন জীবনে সুবিধার খাতিরে এমন তত্ত্বকেও স্বীকার করে নেয় যা বৈতন্ডিক ও ধূর্ত চার্বাকগণ স্বীকার করেননি।
ধূর্ত চার্বাকদের মতে সুখবাদের স্বরূপ কী?
ধূর্ত চার্বাকগণ ইন্দ্রিয়সুখকেই একমাত্র কাম্যবস্তু বলে গণ্য করেন। তারা একান্তভাবে আত্মকেন্দ্রিক, স্থূল, পশুসুলভ সুখকেই পুরুষার্থ বলেন। ভবিষ্যতে উৎকৃষ্টতর সুখের সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমানের তিলমাত্র সুখকেও তারা বর্জন করতে রাজী নন। সর্বদাই স্থূল দৈহিক সুখভোগের পিছনে ছোটার কারণে ধূর্ত চার্বাকদের স্থূল চার্বাকও বলা হয়। তাদের সুখবাদের ধারণা অত্যন্ত অসংযত প্রকৃতির।
বৈতন্ডিক চার্বাকদের মতে সুখবাদ কী?
বৈতণ্ডিক চার্বাকগণ সমাজব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য স্থূল পাশবিক সুখকে একমাত্র কাম্যসুখ বলে স্বীকার করেননি। বরং তারা উদার, বহুজনভোগ্য, কলঙ্কহীন ও দীর্ঘস্থায়ী, সূক্ষ্ম মানসিক সুখের অনুভূতিকেই জীবনে কাম্য বলে মনে করেছেন। বৈতন্ডিক চার্বাকদের স্বীকৃত সুখবাদের ধারণাটি তুলনামূলক সংযত।
সকল চার্বাক সম্প্রদায়ই কি ইন্দ্রিয়সুখকে কাম্যবস্তু বলে মনে করেন? অথবা, সুশিক্ষিত চার্বাক মতে সুখবাদ কী? তা আলোচনা করো।
সুশিক্ষিত চার্বাকগণ স্বীকৃত সুখবাদকে সম্পূর্ণভাবে সংযত আত্মসুখবাদ বলা যায়। এই শ্রেণির চার্বাকগণ মানুষ এবং মনুষ্যেতর প্রাণীর সুখের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। মানুষ হিসেবে যে সুখ কামনা করা উচিত তাকেই মানুষের কাম্য সুখ বলেছেন। তারা সুখ বলতে স্থূল দৈহিক সুখের ঊর্ধ্বে বৃহত্তর সুখকে বুঝিয়েছেন।
‘অর্থকামৌ পুরুষার্থঃ- চার্বাকদের এই বক্তব্য ব্যাখ্যা করো। অথবা, চার্বাক মতে পুরুষার্থ কী? অথবা, চার্বাক মতে, পুরুষার্থ কয়টি ও কী কী?
ভারতীয় দর্শন মতে পুরুষার্থ চারটি। যথা- ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ। কিন্তু চার্বাক দর্শনিকগণ এর মধ্যে দুটি পুরুষার্থকে স্বীকার করেছেন। চার্বাকগণ চারটি পুরুষার্থের মধ্যে কামকে প্রধান পুরুষার্থ এবং অর্থকে সহায়ক (গৌণ) পুরুষার্থ বলেছেন। কারণ, কাম অর্থাৎ কামনা-বাসনা ছাড়া মানুষ কোনো কার্য সাধনে প্রবৃত্ত হয় না এবং কামনা পূরণের জন্য, প্রয়োজনীয় ভোগ্যবস্তু আহরণের জন্য প্রয়োজন হল অর্থ।
দৈহিক ইন্দ্রিয়সুখ ক্ষণিক তবুও চার্বাক দৈহিক সুখকে পরমকাম্য বা পরমপুরুষার্থ বলেছেন কেন? অথবা, চার্বাক মতে মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষার্থ কী?
চার্বাক মতে মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষার্থ হল কাম অর্থাৎ দৈহিকসুখ সম্ভোগ। পুরুষ অর্থাৎ সচেতন মানুষ যা পেতে চায় তাই হল পুরুষার্থ। চার্বাকরা বলেন দৈহিক সুখ ক্ষণিক হলেও সেই ক্ষণিক সুখই পরমার্থ। কেন-না কৃত্রিম কুসুম অপেক্ষা উদ্যান কুসুম ক্ষণকাল স্থায়ী হলেও যেমন উদ্যান কুসুমকে আমরা বেশি সমাদর করি, তেমনই দৈহিক সুখ ক্ষণস্থায়ী হলেও তাকে পরিত্যাগ করা উচিত নয়। সুতরাং বর্তমানের তীব্রতম দৈহিক ইন্দ্রিয়সুখ কামনা করা উচিত।
চার্বাক মতে, মানবজীবনের চরম লক্ষ্য কী?
চার্বাক মতে, মানুষের উচিত যে কাজ করলে দুঃখ অপেক্ষা অধিক সুখ পাওয়া যায় সেই কাজ করা এবং যে কাজ করলে সুখ অপেক্ষা অধিক দুঃখ পাওয়া যায় সেই কাজ পরিত্যাগ করা। অর্থাৎ মানবজীবনের চরম লক্ষ্য হল সুখলাভ। এই মত তাদের নীতিতত্ত্ব সুখবাদেরই প্রতিফলন।
চার্বাক দার্শনিকগণ কেন সুখকে কাম্যবস্তু বলে মনে করেন? অথবা, কোন্ সুখ কাম্য ও কোন্ সুখ বর্জনীয়-এ বিষয়ে চার্বাকদের যে চারটি নীতি আছে তা লেখো। অথবা, চার্বাক মতে, কোন্ সুখ মানুষের কাম্য এবং কোন্ সুখ বর্জনীয়?
চার্বাক মতে, ইন্দ্রিয়সুখ বা দৈহিকসুখ মানুষের চরম কাম্যবিষয়। এবং নৈতিক সুখ বর্জনীয়। এই বিষয়ে চার্বাকদের চারটি নীতি হল-
- দুঃখের চেয়ে সুখের পরিমাণ বেশি হলে সেই সুখ কাম্য।
- দুঃখের চেয়ে সুখের পরিমাণ কম হলে সেই সুখ বর্জনীয়।
- সুখের চেয়ে দুঃখের পরিমাণ বেশি হলে সেই দুঃখ বর্জনীয়।
- সুখের চেয়ে দুঃখের পরিমাণ কম হলে সেই দুঃখ গ্রহণীয়।
চার্বাকরা অর্থকে গৌণ পুরুষার্থ হিসেবে স্বীকার করেছেন কেন? অথবা, চার্বাকরা কামের সহায়করূপে অর্থকে পুরুষার্থ বলেছেন কেন? অথবা, চার্বাকরা ‘অর্থ’-কে কি পুরুস্বার্থ হিসেবে স্বীকার করেন?
চার্বাকরা ‘অর্থ’-কে গৌণ বা সহায়ক পুরুষার্থ হিসেবে স্বীকার করে উত্ত নিয়েছেন। কেন-না, তাদের মতে, কাম বা ইন্দ্রিয়সুখই হল মুখ্য বা শ্রেষ্ঠ পুরুষার্থ। কিন্তু ইন্দ্রিয়সুখের জন্য প্রয়োজনীয় যেসকল সামগ্রী তা লাভ করার জন্য প্রয়োজন হল অর্থ। অর্থ যেহেতু সুখ লাভের উপায় সেহেতু তারা অর্থকে পুরুষার্থ হিসেবে স্বীকার করেন।
চার্বাকরা ধর্মকে কেন পূরুষার্থ বলে স্বীকার করেননি?
চার্বাক মতে ধর্ম পুরুষার্থ নয়। এ কথা বলার কারণ হল ধর্ম মোক্ষেরই সহায়ক। মোক্ষকে চার্বাকগণ পরুষার্থ হিসেবে স্বীকার করেন না। কেন-না তাদের মতে দেহের বিনাশেই মুক্তিলাভ হয়ে যায়। তাই পৃথকভাবে মোক্ষ বা মোক্ষের সহায়করূপে ধর্মকে পুরুষার্থরূপে স্বীকার করা অর্থহীন।
চার্বাক মতে মোক্ষ কেন পুরুষার্থ নয়?
চার্বাকভিন্ন সকল ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ বা মুক্তিকেই জীবনের পরমপুরুষার্থরূপে স্বীকার করা হয়েছে। চার্বাক দর্শনে মোক্ষ পুরুষার্থরূপে স্বীকৃত হয়নি। চার্বাকগণ যেহেতু দেহাতিরিক্ত আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করেন না সেহেতু তাদের মতে দেহের বিনাশেই জীবও মুক্তি পেয়ে যায়। তাই মোক্ষ নামক পুরুষার্থ তাদের কাছে অর্থহীন।
চার্বাক সুখবাদকে কেন চার্বাক জড়বাদের পরিণতি বলা হয়?
চার্বাক জড়বাদ অনুসারে ক্ষিতি, অপ্, তেজ ও মরুৎ এই চারটি ভূত বা জড়দ্রব্যের এক বিশেষ আনুপাতিক সংমিশ্রণে জড়দেহেই ‘চৈতন্য’ নামক গুণের উৎপত্তি হয়। চার্বাক মতে চৈতন্যবিশিষ্ট দেহই আত্মা। কাজেই দেহের সুখ বা ইন্দ্রিয় সুখসম্ভোগই এদের মতে পরমপুরুষার্থ। দৈহিক সুখকেই পরম কাম্যবস্তু বলে স্বীকার করার কারণেই চার্বাক নীতিতত্ত্ব সুখবাদ নামে পরিচিত।
দেবগুরু বৃহস্পতি সুখমের পুরুষার্থ’ কথাটির দ্বারা কী বোঝাতে চেয়েছেন?
দেবগুরু বৃহস্পতি ‘সুখমেব পুরুষার্থ’-উক্তির দ্বারা যে প্রকার সুখকে বুঝিয়েছেন তা স্থূল দৈহিক সুখ নয়। এখানে সুখ বলতে বৃহত্তর সুখকে বোঝানো হয়েছে। ক্ষণিক বা সীমিত জৈব সুখই সুখ নয়, বরং অসীম, অনন্ত, আনন্দময় সুখই প্রকৃত সুখ। কাজেই গুরু বৃহস্পতি সুখ বলতে দৈহিক সুখ নয়, মানসিক সুখকেই বুঝিয়েছেন।
চার্বাক মতে সুখভোগকারী আত্মা কীরূপ?
চার্বাক অধিবিদ্যায় দেহাতিরিক্ত আত্মা স্বীকৃত হয়নি কারণ তা প্রত্যক্ষযোগ্য নয়। অথচ চার্বাকরা তাদের নীতিতত্ত্বে সুখবাদকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রশ্ন হল আত্মাই যদি না থাকে তাহলে সুখভোগ কীভাবে সম্ভব? চার্বাকরা বলেন যে প্রত্যক্ষযোগ্য ক্ষিতি, অপ, তেজ ও মরুৎ-এই চারটি ভূত বা জড়দ্রব্যের এক বিশেষ আনুপাতিক সংমিশ্রণে জড়দেহে ‘চৈতন্য’ গুণের আবির্ভাব হয় আর এই চৈতন্যগুণ যুক্ত দেহই আত্মা। দেহই আত্মা হওয়ায় দেহের বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে আত্মাও বিনাশপ্রাপ্ত হয়। কাজেই পরলোক বলে কিছু নেই। যতকাল এই নশ্বর দেহ থাকবে ততকাল ঐ দেহস্থিত আত্মাই সুখভোগ করবে।
চার্বাক সুখবাদের সঙ্গে কোন্ কোন্ মতবাদের মিল আছে?
চার্বাক সুখবাদের সঙ্গে প্রাচীন গ্রিক সুখবাদের মিল লক্ষ করা যায়। সিরেনিক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা গ্রিক চিন্তাবিদ অ্যারিস্টিপাস (Aristippus) -এর স্থূল আত্মসুখবাদের সঙ্গে চার্বাকদের সুখবাদের অনেক মিল রয়েছে। চার্বাকদের মতো অ্যারিস্টিপাস মনে করেন মানুষের নিজের সুখই তার জীবনের একমাত্র কাম্যবস্তু।
গ্রিক চিন্তাবিদ এপিকিউরাস (Epicurus) -এর সংযত আত্মসুখবাদের সঙ্গেও চার্বাক সুখবাদের কিছুটা মিল দেখা যায়।
ভোগকালস্কাই জীবনের লক্ষ্য।’- ব্যাখ্যা করো।
চার্বাক দর্শনিকগণ তাদের নীতিতাত্ত্বিক আলোচনায় সুখভোগকেই জীবনের চরম লক্ষ্য বলেছেন। চার্বাক দর্শন জড়বাদে বিশ্বাসী। তাদের মতে চতুর্ভূতের সমন্বয়ে এই জড়জগতের উৎপত্তি এবং জড়দেহে আগন্তুক – ধর্মরূপে চৈতন্যের আবির্ভাব হয়। দেহের অতিরিক্ত আত্মা ও মন নেই। তাই চার্বাকদের মতে আত্মিক বা মানসিক সুখেরও কোনো গুরুত্ব নেই। কাজেই, – চার্বাক মতে ভোগাকাঙ্ক্ষাই হল জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
‘দুঃখ পরিহার জীবনের লক্ষ্য নয়।’- ব্যাখ্যা করো।
চার্বাক মতে দুঃখকে এড়ানোর জন্য সুখ থেকে বঞ্চিত হওয়া উচিত নয়। আধ্যাত্মিক দর্শনে দুঃখ থেকে মোক্ষ বা মুক্তিলাভকেই জীবনের পরম লক্ষ্য বলে মনে করা হয়। কিন্তু চার্বাক দর্শনে দুঃখমুক্তিকে জীবনের লক্ষ্যরূপে গণ্য করা হয় না। সুখলাভের পথে যদি দুঃখকেও গ্রহণ করতে হয় তবে সেই দুঃখকে সুখলাভের বাধারূপে চিহ্নিত করা এবং তাকে পরিহারের চেষ্টা কাম্য নয়।
‘ কৃচ্ছসাধন চার্বাকদের অভিপ্রেত নয়।’- ব্যাখ্যা করো।
কৃচ্ছসাধন ভারতীয় দর্শনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু চার্বাক দার্শনিকগণ কৃচ্ছসাধনে আগ্রহী ছিলেন না। নিয়মের কাঠিন্যের বন্ধনে নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করে শুদ্ধ চিত্তে কঠোর নিবৃত্তিমূলক পথে জীবনকে প্রবাহিত করাই হল কৃচ্ছসাধন। কিন্তু চার্বাকগণ ইহজগতের ভোগ সুখকে উপেক্ষা করে কৃচ্ছতার পথে চলাকে জীবনের লক্ষ্য বলে মনে করেননি। তারা বলেন ভোগাকাঙ্ক্ষার পথে ঔচিত্য ও অনৌচিত্য গুরুত্বপূর্ণ নয়।
চার্বাক নীতিতত্ত্ব কি তুমি সন্তোষজনক বলে মনে করো?
চার্বাক নীতিতত্ত্ব সম্পূর্ণরূপে আত্মসুখবাদ, যা স্বার্থপরতারই নামান্তর। ফলে তা নৈতিক আদর্শ হতে পারে না। তা ছাড়া দৈহিক সুখ একমাত্র পরমকাম্য হলে মানুষকে পশু থেকে আলাদা বলা যাবে না। মানুষের মন আছে, বুদ্ধি আছে। তাই রতিসুখ (কামসুখ), দেহজসুখ অপেক্ষা মানুষ প্রেম-ভালোবাসা কামনা করে, শাশ্বত সুখ কামনা করে, যা চার্বাক নীতিতত্ত্বে নেই। কাজেই চার্বাক নীতিতত্ত্ব সন্তোষজনক নয়।
চার্বাক সুখবাদের বিরুদ্ধে দুটি আপত্তি লেখো।
চার্বাক সুখবাদের বিরুদ্ধে যে গুরুত্বপূর্ণ আপত্তিগুলি লক্ষ করা যায় সেগুলি হল-
চার্বাক নৈতিক মতবাদ যে সুখবাদের কথা বলে তা দেহসর্বস্ব আত্মসুখবাদ, পরসুখবাদ নয়। চার্বাক সুখবাদকে মেনে চললে মানুষ অসামাজিক জীবে পরিণত হবে। তাতে সমাজ গড়ার বদলে সমাজ ভেঙে পড়বে।
চার্বাক নীতিতত্ত্বে দৈহিক সুখকে চরমকাম্য বলে স্বীকার করার ফলে মানুষের মানসিক দিকটির সঙ্গে সঙ্গে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিকটিও সম্পূর্ণ অবহেলিত হয়েছে।
চার্বাক দার্শনিকগণ কি ভবিষ্যৎ সুখে বিশ্বাসী?
চার্বাক দর্শনে ভবিষ্যৎ সুখের তুলনায় বর্তমান জীবনের সুখকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চার্বাক মতে অতীত ও ভবিষ্যতের সুখের অন্বেষণ অর্থহীন। কেন-না, চার্বাক মতে অতীত কালের গর্ভে বিলীন, ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণরূপে অনিশ্চিত। আমাদের সামনে শুধুমাত্র বর্তমানই আছে। তাই বর্তমান সুখকেই আমাদের বেছে নিতে হবে।
চার্বাকগণকে নাস্তিক বলা হয় কেন?
ভারতীয় দর্শন অনুসারে যারা বেদের প্রামাণ্যে অবিশ্বাসী তাদের নাস্তিক বলা হয়। চার্বাকগণ বেদের প্রামাণ্যে অবিশ্বাসী। তাদের মতে, বেদকে স্বীকার করা যায় না। কেন-না বেদ প্রত্যক্ষযোগ্য নয়। বেদ অনুমানগ্রাহ্য। কিন্তু চার্বাক মতে অনুমান প্রমাণ নয়; প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রামণ। তাদের মতে বেদ ধূর্ত ব্রাহ্মণের দ্বারা রচিত। এই কারণে চার্বাক দর্শন সম্প্রদায়কে নাস্তিক বলা হয়।
চার্বাকরা জন্মান্তর স্বীকার করেন না কেন? অথবা, চার্বাক সম্প্রদায় কি কর্মবাদে বিশ্বাসী?
কর্মবাদের মূল বক্তব্য হল মানুষ তার কর্ম অনুযায়ী ফলভোগ করে। ভালো কর্মের ফল হয় ভালো এবং খারাপ কর্মের ফল হয় খারাপ। কর্মের ফলভোগ এই জীবনে শেষ না হলে সেই ফলভোগের জন্য পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয়। অর্থাৎ কর্মবাদ থেকে নিঃসৃত হয় জন্মান্তরবাদ। কিন্তু এই নিয়মগুলি কোনোটাই প্রত্যক্ষযোগ্য নয়। চার্বাক মতে প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ। তাই চার্বাক দর্শন কর্মবাদ, জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করে না।
চার্বাক দর্শন বেদবিরোধী কেন?
চার্বাক দার্শনিকরা যে শুধু বেদে বিশ্বাসী নন তাই নয়, তারা বেদবিরোধীও। চার্বাক মতে বেদ রচয়িতাগণ হলেন ‘ভণ্ড’। তারা বেদকে অপ্রামাণ্য বলেন। কারণ অনেক সময়ই বেদবিহিত কর্ম করলে তার ফললাভ হয় না। এ ছাড়া বেদে তিনটি দোষ আছে- অন্ত, ব্যাঘাত ও পুনরুক্ত দোষ। দোষদুষ্ট বেদকে প্রমাণরূপে স্বীকার করা অর্থহীন। চার্বাক মতে, বেদের বিধানগুলিও অনুমোদিত নয়। এভাবে চার্বাকগণ বেদের বিরোধিতা করেছেন।
চার্বাকরা বেদের মন্ত্রগুলিকে প্রলাপ বলেছেন কেন? অথবা, চার্বাকরা কেন বেদকে অপ্রামাণ্য বলেছেন? অথবা, চার্বাক দর্শনে বৈদিক বিধানসমূহ অনুমোদিত নয় কেন?
চার্বাক সম্প্রদায় বেদবিরোধী। তাদের মতে বেদ ব্যক্তিবিশেষের দ্বারা রচিত, যারা ভণ্ডামিতে উন্নততর। গুরু বৃহস্পতি বেদের মন্ত্রগুলিকে বলেছেন প্রলাপ। এ ছাড়া বেদ রচয়িতাদের উদ্দেশ্যে ‘ধূর্ত’, ‘নিশাচর’, ‘রাক্ষস’ ইত্যাদি নিন্দাসূচক শব্দ ব্যবহার করা হয়। তাদের মতে, বেদবিহিত কর্ম সম্পাদন করলেও যে স্বর্গসুখাদি ফললাভ হয় তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই বেদ অপ্রামাণ্য এবং বৈদিক বিধানসমূহ চার্বাক দর্শনে অনুমোদিত নয়।
বেদের অন্ত দোষ কী?
চার্বাকগণ মনে করেন বেদে অনৃত দোষ আছে। তথ্যে মিথ্যাত্ম বা অর্ধসত্য বা অসম্পূর্ণতা থাকলে অনূত দোষ হয়। বেদে বলা হয়েছে যে, পুত্রকামী ব্যক্তি পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করলে পুত্র লাভ করবেন। কিন্তু বাস্তবে বহুক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, যজ্ঞ করার পরেও ফললাভ হয় না। ফলে বেদবাক্য মিথ্যা হয়ে যায় এবং তাতে অনৃত দোষ হয়।
বেদের ব্যাঘাত দোষ কী?
কোনো বিষয়ে পরস্পর বিরোধী যুক্তির অবতারণা হলে ব্যাঘাত দোষ ঘটে। চার্বাক মতে বেদে ব্যাঘাত দোষ ঘটেছে। বেদের বহুস্থানে একটি মন্ত্রের সঙ্গে অপর মন্ত্রের বিরোধ ঘটেছে। যেমন- অগ্নিহোত্র যজ্ঞের ক্ষেত্রে কোথাও সূর্যোদয়ের পরে, আবার কোথাও সূর্যোদয়ের আগে, আবার কোথাও সূর্যাস্তের পরে আহুতি প্রদানের বিধান আছে। এই কারণে বেদে ব্যাঘাত দোষ হয়েছে বলে চার্বাকদের অভিমত।
বেদের পুনরুক্ত দোষ কী?
চার্বাক মতে বেদে পুনরুক্ত দোষ আছে। একই বিষয়ের একাধিকবার উল্লেখ হলে পুনরুক্ত দোষ হয়। বেদে ‘সামিধেনী’ নামক এগারোটি অগ্নি প্রজ্বলনমন্ত্রের উল্লেখ আছে। তার মধ্যে প্রথম এবং শেষ মন্ত্রের দুই থেকে তিনবার পাঠের বিধান আছে। তাই চার্বাক মতে বেদে পুনরুক্ত দোষের অবতারণা হয়েছে।
সমাজের প্রতি চার্বাকদের সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গিটি আলোচনা করো।
আপাতদৃষ্টিতে চার্বাক দৃষ্টিভঙ্গি কিছুক্ষেত্রে উচ্ছৃঙ্খল ও অশোভনীয় মনে হলেও বাস্তবে তা ছিল না। গুরু বৃহস্পতি ও তাঁর শিষ্যরা নারীর প্রতি অত্যাচারের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তারা সামাজিক শৃঙ্খলতা বজায় রাখার জন্য সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। জাতপাতের ভেদাভেদ তারা মনেতেন না। ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল নির্বিশেষে সকলের সুখভোগের অধিকার আছে বলে তারা মনে করতেন।
এপিকিউরাসের সংযত সুখবাদটি কী? অথবা, গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাসের সংযত আত্মসুখবাদের ভিত্তিস্বরূপ যে চারটি সূত্র, সেগুলি উল্লেখ করো।
চার্বাক প্রদত্ত সুখবাদের ধারণাটি প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাসের সংযত আত্মসুখবাদের সঙ্গে তুলনীয়। এপিকিউরাস মনে করেন, আমাদের সকল কাজের পিছনেই একটি উদ্দেশ্য থাকা উচিত, তা হল সুখ গ্রহণ এবং দুঃখ বর্জন। এই বিষয়ে তিনি চারটি সূত্রের অবতারণা করেন। যথা-
- যে সুখ দুঃখের কারণ হয়না তাকে গ্রহণ করতে হবে।
- যে দুঃখ সুখের কারণ হয় না তাকে বর্জন করতে হবে।
- বৃহত্তর সুখের পক্ষে বাধা সৃষ্টিকারী সুখকে বর্জন করতে হবে।
- পরবর্তীকালে সুখ উৎপাদন করবে এমন দুঃখকে গ্রহণ করতে হবে।
অ্যারিস্টিপাসের সুখবাদ কীরূপ তা আলোচনা করো।
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টিপাস যে সুখবাদের আলোচনা করেছেন তার সঙ্গে চার্বাক সুখবাদের সাদৃশ্য লক্ষণীয়। অ্যারিস্টিপাস স্থূল আত্মসুখবাদের সমর্থক। তিনি বিভিন্ন সুখের মধ্যে পরিমাণগত পার্থক্য করেছেন। তাঁর মতে, মানসিক সুখ বা শান্তির থেকে দৈহিকসুখ অনেক বেশি কাম্য। ভবিষ্যতের সুখের তুলনায় বর্তমানের সুখ অধিক কাম্য। জা
চার্বাক সুখবাদ কি আজকের দিনে সমাজের পক্ষে কল্যাণময়?
চার্বাক স্বীকৃত সুখবাদ হল অসংযত বা স্থূল আত্মসুখবাদ। এই মতবাদের মূলকথাই হল নিজের জন্য যতটা সম্ভব সুখ কামনা করা উচিত। সেই সুখ হবে তীব্রতম এবং দীর্ঘস্থায়ী সুখ। এই তীব্রতম সুখ পাশবিক, দৈহিক সুখেরই নামান্তর। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে থেকে প্রত্যেকেই যদি কেবল নিজ দৈহিক ভোগাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থের কথা চিন্তা করে তবে সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট হবে। তাই বর্তমান সমাজের পক্ষে চার্বাক সুখবাদ কল্যাণজনক নয়।
Read More – The Garden Party Question Answer