বিকাশ বলতে কী বোঝো? বিকাশের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো

বিকাশ বলতে কী বোঝো? বিকাশের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো

বিকাশ বলতে কী বোঝো? বিকাশের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো
বিকাশ বলতে কী বোঝো? বিকাশের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো

শিশুর জন্মের পর তার জীবনে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। এই রূপ পরিবর্তন দুটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, একটি হল বৃদ্ধি (Growth) এবং অপরটি হল বিকাশ (Development)

বিকাশ

জীবনব্যাপী ক্রমোন্নতশীল সামগ্রিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকেই বিকাশ বলে। বিকাশ হল ব্যক্তির আকৃতি ও ক্রিয়ার পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া। যা ব্যক্তির ক্ষমতার সূচনা ও বৃদ্ধি ঘটায় এবং ব্যক্তিকে উৎকর্ষতার সঙ্গে কাজ করতে সাহায্য করে। অন্যভাবে বলা যায় – জন্মের পর থেকে মানবশিশুর জীবনব্যাপী, সামগ্রিক, গুণগত পরিবর্তনের ধারাবাহিক পরিবর্তনের স্বাভাবিক সময় নির্ভর প্রক্রিয়া যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অর্জিত হয়, তাকে বিকাশ বলে। মনোবিদ রেমন্ট (Raymont) বলেছেন – “Development is a continuous process, there are no gaps. The various physical and mental function, as they successively appear, ripen and parts into higher function.” অর্থাৎ বিকাশ হল একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, এর মধ্যে কোনো বিরতি নেই। যে সমস্ত দৈহিক এবং সামাজিক বৈশিষ্ট্য পর্যায়ক্রমে ব্যক্তির জীবনে উপস্থিত হয় তা পরিবর্তিত হয়ে অন্য একটি উন্নত ধরনের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তিত হয়।

বৈশিষ্ট্য

বিকাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। যেগুলি হল-

(1) বিকাশ একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া: বিকাশ হল একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। যা মাতৃগর্ভ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে থাকে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা বা বিরামমুক্ত ঘটনা নয়। এটি নিরবচ্ছিন্নভাবেই এগিয়ে চলে।

(2) ব্যক্তির বিভিন্ন বিকাশ পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত: ব্যক্তির দৈহিক বিকাশ, মানসিক বিকাশ, সামাজিক বিকাশ, প্রাক্ষোভিক বিকাশ পৃথকভাবে ঘটে না। এগুলি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং পরস্পর নির্ভরশীল।

(3) বিকাশ একটি ব্যক্তিগত প্রক্রিয়া: ব্যক্তিসকলের বিকাশে অসমতা পরিলক্ষিত হয়। দৈহিক, মানসিক, সামাজিক প্রভৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পার্থক্য শুধু ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে নয়, একই ব্যক্তির বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন হারে বিকাশ ঘটে।

(4) সামঞ্জস্য: বিকাশের ধারা সবসময় সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলে। কোন্ আচরণের পর শিশু কোন্ আচরণ করবে তা মোটামুটি ঠিক থাকে এবং সেই অনুযায়ী শিশুর বিকাশ হয়। বিকাশের এই নিয়ম সকলের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।

(5) মিথস্ক্রিয়ার ফল: বিকাশ আসলে মানুষের সঙ্গে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া বা মিথস্ক্রিয়ার ফল।

(6) লিঙ্গগত পার্থক্য: লিঙ্গভেদে বিকাশের তারতম্য ঘটে থাকে। সাধারণত ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বিকাশ দ্রুত ঘটে অর্থাৎ বালিকাদের বয়ঃসন্ধিক্ষণ বালকদের অনেক পূর্বেই আসে।

(7) জটিলতা: বিকাশ প্রক্রিয়া খুবই জটিল কারণ সমস্ত দিকের বিকাশ সবসময় একই হারে হয় না। বিভিন্ন বয়সে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী বিকাশের হার কখনও বৃদ্ধি পায় আবার কখনও হ্রাস পায়।

(8) বিকাশ পরিণমনের ফল: আরনল্ড জোন্স-এর মতে, বিকাশের উপর দৈহিক পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যায়। শৈশব থেকে বয়ঃসন্ধিক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তির দৈহিক পরিবর্তন তার জিনের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। এই স্বতঃস্ফূর্ত পরিবর্তন পরিণমন ঘটায় যা বিকাশকে সম্ভবপর করে তোলে।

(9) বংশগতি ও পরিবেশের প্রভাব: বিকাশ দুটি শর্তের উপর নির্ভর করে, যেমন- বংশগতি এবং পরিবেশ। বংশগতি দ্বারা প্রাপ্ত সমস্ত বৈশিষ্ট্য উপযুক্ত পরিবেশের সহায়তায় বিকাশলাভ করে।

(10) সেফালোকডাল প্রবণতা: সঞ্চালনগত বিকাশ দেহের উপর থেকে নীচের দিকে থাকে। যেমন মস্তিষ্কের সঞ্চালন থেকে বিকাশ শুরু হয়। এই প্রবণতাই হল সেফালোকডাল প্রবণতা, অর্থাৎ প্রথমে মস্তিষ্কের তারপর যথাক্রমে ঘাড় বা গলা, হাত, পা প্রভৃতির বিকাশ ঘটে থাকে।

(11)  প্রক্সিমোডিস্টাল প্রবণতা: বিকাশ দেহকাণ্ডের অপেক্ষাকৃত কাছের অঙ্গে প্রথম ঘটে, যেমন- আঙুলের থেকে হাতের সঞ্চালন গড় বিকাশ আগে ঘটে, এই প্রবণতাকে বলা হয় প্রক্সিমোডিস্টাল প্রবণতা।

(12) বহিল্যাটারাল থেকে ইউনিল্যাটারাল: জন্মের পর শিশুর জোড়া অঙ্গ একই সঙ্গে ব্যবহার করতে থাকে। পরে দুই-আড়াই বছর বয়স থেকে অর্থাৎ বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে অঙ্গের প্রয়োজন হয় সে সেই  অঙ্গই ব্যবহার করে

(13) শিখনের সাথে সম্পর্কযুক্ত: শিখন হল আচরণ পরিবর্তন এবং এর মধ্যে দিয়ে পরিবেশের সঙ্গে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ফলে শিশু যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে তাই হল বিকাশ।

(14) পর্যবেক্ষণযোগ্য:  বিকাশ পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন নয়। এটি পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রক্রিয়া। অর্থাৎ বিকাশের সকল দিক আমরা পরিমাপ করতে পারি না। পর্যবেক্ষণ করতে পারি মাত্র। সবশেষে বলা যায় বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশুর আচরণ, চিন্তা, পরিবেশের সঙ্গে সংগতিবিধান ইত্যাদি বিষয়ের ক্ষেত্রে যে সকল পরিবর্তন দেখা যায় সেগুলি হল প্রকৃতপক্ষে বিকাশ প্রক্রিয়ার ফল। ভালো-মন্দ বিচারকরণ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস সম্পর্ক ধারণা গঠন, আত্মবিশ্বাসবোধ জাগরণ ইত্যাদি হল বিকাশ প্রক্রিয়ার ফলশ্রুতি।

(15) পরিমাণগত ও গুণগত প্রক্রিয়া: বিকাশ হল একটি পরিমাণগত এবং গুণগত প্রক্রিয়া। দৈহিক আকার এবং আয়তনের পরিবর্তনের ফলে ব্যক্তির মধ্যে যে পরিমাণ কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায় তাই হল বিকাশ।

(16) ধারাবাহিক প্রক্রিয়া: বিকাশ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া শুরু হয় শিশুর জন্মমুহূর্ত থেকে এবং প্রতি মুহূর্তে ব্যক্তির মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত নানা পরিবর্তন ঘটতে থাকে।

(17) বিকাশ হল সংশ্লেষণ: কোনো কোনো মনোবিজ্ঞানী বিকাশকে পরিণমন বা শিখনের ফল হিসেবে বিবেচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তাঁদের মতে, এই দুটি ব্যাখ্যায় বিকাশকে নিষ্ক্রিয় প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পিয়াজে বলেছেন- কোনো কোনো মনোবিদ বিকাশকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নির্দিষ্ট শিখন অভিজ্ঞতাগুলির সমন্বয় বলে মনে করেছেন। প্রকৃতপক্ষে বিকাশ হল একটি প্রক্রিয়া, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নির্দিষ্ট শিখন অভিজ্ঞতাগুলির সমন্বয় হল বিকাশ, এ ধারণা সঠিক নয়। পিয়ার্জের মতে, বিকাশের 4টি প্রক্রিয়া আছে। এগুলি হল- পরিণমন, অভিজ্ঞতা, মানসিক যোগাযোগ (ভাষার মাধ্যমে শিখন, শিক্ষালয়ের শিক্ষা বা পিতামাতার প্রশিক্ষণ) ভারসাম্যকরণ।

আরও পড়ুন – মনোবিজ্ঞানে অনুসন্ধানের পদ্ধতিসমূহ প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment