বংশগতিবাদী কাদের বলা হয়? শিশুর বিকাশে বংশগতির ভূমিকা সম্পর্কে তাঁদের পরীক্ষাগুলি আলোচনা করো

বংশগতিবাদী কাদের বলা হয়? শিশুর বিকাশে বংশগতির ভূমিকা সম্পর্কে তাঁদের পরীক্ষাগুলি আলোচনা করো

মাতৃগর্ভে যে সম্ভাবনা নিয়ে শিশুর জীবন সঞ্চার হয়, সেগুলিই পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়। জন্মগত সম্ভাবনা ছাড়া জীবনবিকাশ অর্থহীন। বংশগতিই মানুষের স্রষ্টা। তাই মানুষকে শিক্ষার দ্বারা সংস্কার করার পূর্বে তাকে আদর্শ বংশগতির অধিকারী করতে হবে।

বংশগতিবাদী

যেসকল মনোবিদ মানুষের মানসিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র বংশগতিকেই দায়ী করেছেন, তাঁদের বলা হয় বংশগতিবাদী।

পরীক্ষা

শিশুর বিকাশে বংশগতির প্রভাব সম্পর্কিত পরীক্ষাগুলি হল-

(1) গ্যালটনের পর্যবেক্ষণ : মনোবিদ গ্যালটন (Galton) 977 জন বিখ্যাত প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির আত্মীয়দের জীবন পর্যালোচনা করে দেখেন, তাদের মধ্যে 536 জন জীবনে কোনো-না-কোনো ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে 977 জন সাধারণ ব্যক্তির আত্মীয়দের জীবন পর্যালোচনা করে দেখেন, তাদের মধ্যে মাত্র 4 জন ব্যক্তি জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন। এর থেকে গ্যালটন সিদ্ধান্ত করলেন যে, মানুষের প্রতিষ্ঠার মূলে আছে তাদের বংশগতি।

(2) কার্ল পিয়ারসনের পর্যবেক্ষণ : কার্ল পিয়ারসন (Karl Pearson) গ্যালটন পরিবারের এক হাজার বছরের বংশতালিকা পর্যালোচনা করে দেখেন, এই পরিবারের বিভিন্ন ব্যক্তি পাঁচ পুরুষ ধরে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি প্রায় দুই হাজার ভাই-বোনকে বিভিন্ন দিক থেকে অনুশীলন করে সিদ্ধান্ত নেন, মানুষের দৈহিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য বংশানুক্রমে সঞ্চারিত হয়।

(3) গডার্ডের পর্যবেক্ষণ: মনোবিদ গডার্ড (Goddard), মার্টিন কালিকক নামে এক ব্যক্তির কুলপঞ্জি অনুশীলন করেন। মার্টিন কালিককের দুই স্ত্রীর মধ্যে একজন ছিলেন বুদ্ধিমতী এবং অন্যজন ক্ষীণবুদ্ধিসম্পন্না। গডার্ড লক্ষ করেন, বুদ্ধিমতী স্ত্রীর দরুন পরিবারের যে শাখা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে তারা সবাই বুদ্ধিমান। অন্যদিকে ক্ষীণবুদ্ধিসম্পন্না স্ত্রীর দরুন পরিবারের যে শাখা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে তারা সবাই ক্ষীণবুদ্ধিসম্পন্ন বা অসামাজিক। এর থেকে গডার্ড সিদ্ধান্ত নেন, মানুষের জীবনবিকাশ নির্ভর করে বংশগতির উপর।

(4) টারম্যানের পর্যবেক্ষণ: মনোবিদ টারম্যান (Tarman) ক্যালিফোর্নিয়ার এক হাজার উন্নত বুদ্ধিসম্পন্ন ছেলে-মেয়ের বুদ্ধি পরিমাপ করেন এবং সেইসঙ্গে তাদের বাবা-মায়ের বুদ্ধিরও পরিমাপ করেন। তুলনামূলক বিচারবিশ্লেষণ করে টারম্যান সিদ্ধান্ত নেন যে, বাবা-মায়ের বুদ্ধির সঙ্গে ছেলে-মেয়ের বুদ্ধির যথেষ্ট সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্ক নির্ভর করে বংশগতির উপর।

(5) নিউম্যানের পর্যবেক্ষণ : মনোবিদ নিউম্যান (Newman) ফ্রেড ও এডুইন নামে দুজন সমকোশী যমজের সন্ধান পান। এরা শৈশব থেকেই পৃথক পরিবারে মানুষ হয়। 26 বছর পর নিউম্যান পর্যবেক্ষণ করে দেখেন। যে, দৈহিক, মানসিক সমস্ত দিক থেকে তাদের মধ্যে মিল আছে। পরিবারের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এরকম মিল দেখে নিউম্যান সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, তাদের এই মিল বংশগতির প্রভাবেই সম্ভব হয়েছে। এই ধরনের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে মনোবিদগণ সিদ্ধান্ত নেন যে, ব্যক্তিজীবনের স্বাতন্ত্র্য পরিবেশের প্রভাব বা বাইরের কোনো প্রচেষ্টার দ্বারা আনা সম্ভব নয়। মানুষের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বিকাশ তার বংশগতির দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়।

(6) ডাগডেল (Dugdale)-এর পরীক্ষা: ডাগডেল ডিউক নামে এক কয়েদির পাঁচ পূর্বপুরুষের কুলপঞ্জি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে, তাদের বংশের বেশিরভাগ মানুষই চোর, ডাকাত, খুনি, জেলখানার কয়েদি ইত্যাদি। এর থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে, বংশগতির প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। আবার Dugdale পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করেছেন, উন্নতমানের পরিবারের ব্যক্তিরা যেমন তাদের উন্নতমানের বাবা-মায়ের বৈশিষ্ট্য পেয়েছে, তেমনই নিম্নমানের ব্যক্তিরা নিম্নমানসম্পন্ন বাবা-মায়ের সন্তান হয়েছে।

(7)  ম্যাকপার্সন (McPerson)-এর পরীক্ষা: ম্যাকপার্সন হোমিনি পরিবারের উপর পর্যবেক্ষণ করেন। হোমিনি পরিবারের পিতা ছিলেন দৈহিক প্রতিবন্ধী ও ক্ষীণবুদ্ধিসম্পন্ন এবং ওই পরিবারের জননী ছিলেন মানসিক প্রতিবন্ধী। তাদের সাতটি ছেলেমেয়ের মধ্যে পাঁচ জন মানসিক প্রতিবন্ধী এবং সবাই অপরাধপ্রবণ। এইসব বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, কোনো শিশুর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রকৃতি ও বিকাশ বংশগতির উপর নির্ভর করে।

(8) Weismann’s Experiment: Weismann ইঁদুরের পর পর কয়েকটি বংশধরদের লেজ কেটে দেখলেন। যে পরবর্তী কোনো প্রজন্মে লেজবিহীন ইঁদুর জন্ম নেয়নি। এর থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, বংশধারার গুণগুলিই শুধু পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।

(9) সোরেন সেনের পরীড্ডা: সোরেন সেন দেখেন যে-সমস্ত পিতা- মাতার বুদ্ধ্যঙ্কের পরিমাণ 130 বা তার বেশি, তাঁদের সন্তানদের মধ্যে। ক্ষীণবুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা দশমিক এক (0.1) ভাগ।

(10) মানব শিশু ও বানর শিশু পর্যবেক্ষণ:

  •  কেলগ (Kellog)-এর পরীক্ষা: মনোবিজ্ঞানী কেলগ ও তাঁর স্ত্রী নিজেদের শিশুসন্তানের সঙ্গে একটি বানর শিশু প্রতিপালন করেন। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাঁরা দেখলেন যে, ভাষামূলক নির্দেশ অনুধাবন, হাতের কাজে দক্ষতা অর্জন ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানবশিশু বানরশিশু অপেক্ষা অনেক বেশি দক্ষ। তাই তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, বংশগতিই। মানব শিশুকে এইরূপ কাজে দক্ষতাসম্পন্ন করে তুলেছে।

অনাথ আশ্রমের শিশু পর্যবেক্ষণ: সাধারণত অনাথ আশ্রমে বিভিন্ন। বংশগতিযুক্ত শিশু প্রতিপালিত হয়। সকলের ক্ষেত্রে একইরকম পরিবেশ। প্রযুক্ত হওয়ার ফলে তাদের সকলের বিকাশ একইরকম হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাস্তবক্ষেত্রে কিন্তু সেরূপ হয় না। তাদের মধ্যে বুদ্ধ্যঙ্কের দিক থেকে পার্থক্য দেখা যায়। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, বংশগতির প্রভাবের জন্যই এরূপ পার্থক্য সূচিত হয়।

আরও পড়ুন – মনোবিজ্ঞানে অনুসন্ধানের পদ্ধতিসমূহ প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment