প্রাচীন সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উদ্ভব ও বিকাশের প্রক্রিয়া আলোচনা করো
অথবা,
মানবসভ্যতার বিবর্তন কীভাবে ভারতে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষালয়ে। বিকাশ লাভ করল- সে সম্পর্কে আলোচনা করো

মানবসভ্যতার বিবর্তনে ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয় বিকাশ লাভ করল। সে সম্পর্কে শিক্ষার ইতিহাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথাক্রমে- প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগ।
প্রাচীন যুগ
(1) বৈদিক যুগ: প্রাচীন বৈদিক যুগে উত্তর-পশ্চিম ভারতবর্ষে গড়ে ওঠা বেশিরভাগ শিক্ষাকেন্দ্রগুলি ধীরে ধীরে আর্যসভ্যতার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। এইসময় শিক্ষা ছিল অপ্রথাগত। মৌখিক পদ্ধতিতে শিক্ষাদান করত, শিক্ষার প্রথম পর্যায়ে বেদ আবৃত্তি করা হত এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে সমষ্টি থেকে পৃথক করে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষা দেওয়া হত। গুরুকুল বা আচার্যের আশ্রমে শিক্ষা দেওয়া হত। পরবর্তী বৈদিক যুগে গুরুগৃহে শিক্ষাগ্রহণ পদ্ধতি দেখা যায়। ব্রাহ্মণ্য যুগে ছিল আশ্রমভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। যেমন- ভরদ্বাজ ঋষির আশ্রম, কণ্বমুনির আশ্রম।
(2) রাজশক্তির উত্থান :
- রাজশক্তির উত্থানের পর কাশী, কোশল, বিদেহ, পাঞ্চাল প্রভৃতি রাষ্ট্রকেন্দ্র শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। বারাণসী, মিথিলা, গৌড় প্রভৃতি কয়েকটি জনপদে শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। বারাণসী ধামে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুণ্যার্থীর সমাগম হত, যা ধীরে ধীরে টোল চতুষ্পাঠী তৈরি করে। বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থায় সুদীর্ঘ বিবর্তনের পথ ধরে শিক্ষাকেন্দ্রসমূহ গড়ে উঠতে থাকে। প্রথম দিকে বেণুবন, কপিলাবস্তু, শ্রাবস্তী, বৈশালী প্রভৃতি বিহারগুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব ভারতে মগধ এবং গয়া প্রসিদ্ধি লাভ করে।
- মৌর্য পরবর্তী যুগে সিংহল, এশিয়া, কাশ্মীরে বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হয়। গুপ্ত যুগে হিন্দু শিক্ষার পাশাপাশি বৌদ্ধ শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। এই যুগের শ্রেষ্ঠ ফলশ্রুতি নালন্দা ও বিক্রমশীলার মতো বিশ্ববিদ্যালয়।
মধ্যযুগের শিক্ষাব্যবস্থা
মধ্যযুগে ভারতে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষার এক নতুন অধ্যায়-এর সূচনা হয়। ইসলামীয় ব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মক্তব আর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল মাদ্রাসা। এখানে একজন শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনের উপযোগী সৎ, চরিত্রবান, আদর্শপরায়ণ ও ধার্মিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দেওয়া হত। এই শিক্ষাব্যবস্থায় পবিত্র কোরান পাঠের উপর গুরুত্ব দেওয়া হত। উচ্চশিক্ষার আর-একটি প্রতিষ্ঠান ছিল দরগা। মধ্যযুগে মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থা ভারতবর্ষে দীর্ঘদিন ছিল। মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রথমদিকে মুসলিম শাস্ত্র পড়ানো হত, তবে পরবর্তীকালে মাদ্রাসাগুলিতে হিন্দুশাস্ত্রাদি পাঠেরও ব্যবস্থা হয়েছিল।
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা
(1) ব্রিটিশ যুগ: আঠারো শতকের দ্বিতীয় ভাগে ব্রিটিশ শাসনের সময় ভারতে দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টি পড়েছিল অনেক দেরিতে। বেসরকারি উদ্যোগে ভারতে প্রথম পাশ্চাত্য শিক্ষা শুরু হয়। এর দুটি ধারা হল-
- খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রচেষ্টা: খ্রিস্টান মিশনারিগণ পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ব্যাপটিস্ট মিশনারি উইলিয়ম কেরি, মার্শম্যান ও উইলিয়ম ওয়ার্ড (শ্রীরামপুর ত্রয়ী) শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। এঁরা মোট 126টি বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। 1820 সালে শিবপুরে বিশপ্স কলেজ স্থাপিত হয়।
- প্রগতিশীল ভারতীয় ও বিদেশিদের প্রচেষ্টা: ব্রিটিশদের সংস্পর্শে এসে প্রগতিশীল ভারতীয়রা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে সচেষ্ট হয়। এক্ষেত্রে প্রগতিশীল বিদেশিদের ভূমিকাও ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। 1815 সালে রাজা রামমোহন রায় কলকাতার শুঁড়িপাড়ায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা 1822 সালে অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল নামে পরিচিত হয়। ডুমন্ড প্রতিষ্ঠা করেন এর উচ্চ বিভাগটি ধর্মতলা আকাদেমি। 1817 সালে ডেভিড হেয়ারের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দু কলেজ, যা পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত হয়েছে।
(2) বর্তমান যুগ: বর্তমানে প্রথাগত ও অপ্রথাগত উভয় ধরনের পদ্ধতিকে বেছে নেওয়া হয়েছে শিক্ষার প্রসারের জন্য। এই কারণে বিদ্যালয় শিক্ষা, নৈশ বিদ্যালয়, বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র, জাতীয় সেবাকেন্দ্র, দূরশিক্ষা, মুক্তশিক্ষা ইত্যাদি পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।
আরও পড়ুন – বিকাশের স্তরসমূহ প্রশ্ন উত্তর