মুদ্রণবিপ্লবে গুটেনবার্গের অবদান লেখো

মুদ্রণবিপ্লবে গুটেনবার্গের অবদান লেখো

মুদ্রণবিপ্লবে গুটেনবার্গের অবদান লেখো
মুদ্রণবিপ্লবে গুটেনবার্গের অবদান লেখো

সচল ছাপার যন্ত্র উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে জোহানেস গুটেনবার্গের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

মুদ্রণবিপ্লবে গুটেনবার্গের অবদান

(1) প্রথম জীবন: ১৩৯৩ (মতান্তরে ১৪০৬ খ্রি.) খ্রিস্টাব্দে জার্মানির মেইনজ (Mainz) শহরে জন্ম হয় জোহানেস গেনসফ্লিশ গুটেনবার্গ (Johannes Gensfleisch zur Laden zum Gutenberg)-এর। পেশায় স্বণর্কার গুটেনবার্গের জীবন সম্পর্কে খুব বেশিকিছু জানা যায় না। তবে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ থাকায় নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশায় তিনি সর্বদা মেতে থাকতেন। অবশেষে পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি পর্বে ইতিহাসের এক বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। আর সেটি হল, গুটেনবার্গের কাঠের কাঠামোযুক্ত ছাপাখানার প্রতিষ্ঠা।

(2) আধুনিক মুদ্রণযন্ত্রের প্রতিষ্ঠা: পণ্ডিতগণের অনুমান অনুযায়ী, ১৪৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকেই মুদ্রণের কাজ শুরু করেন জোহানেস গুটেনবার্গ। তিনি প্রচলিত কাঠের টাইপ (হরফ) দিয়ে মুদ্রণের প্রক্রিয়াকে বহুগুণ উন্নত করে মুদ্রণশিল্পকে আধুনিক রূপ দেন। এরপর কাঠের বদলে ধাতুর পুনর্ব্যবহারযোগ্য হরফ তৈরি করে গুটেনবার্গ মুদ্রণ জগতে বিপ্লব নিয়ে আসেন। শুধু তাই নয়, তিনি ধাতুর প্লেটের উপর কালি লাগিয়ে উলটো দিকে ধাতুর অক্ষর (টাইপ) সাজিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে তার সঞ্চালন ঘটান এবং এই দুটি অংশের মাঝে কাগজ রেখে দ্রুত ছাপার বন্দোবস্ত করেন। এতে ছাপা যেমন স্পষ্ট হত, কম জায়গা লাগত, আবার এই ব্যবস্থায় প্রতি প্রিন্টের পর কালি লাগানোর প্রয়োজন পড়ত না।

তারপর ছাপানো কাগজ শুকিয়ে পুস্তক আকারে বাঁধাই করা হত। তাঁর টাইপ একাধিকবার ব্যবহার করা সম্ভবপর ছিল। আর এরূপ একই টাইপ বা হরফকে বারবার ব্যবহার করার পদ্ধতি মুদ্রণব্যবস্থাকে এক নতুন জীবন দেয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ভুল টাইপ থাকলে তাকে সরিয়ে সঠিক টাইপ লাগিয়ে ত্রুটিমুক্ত পুস্তক প্রকাশ করা সম্ভব হয়। একে বলা হয় প্রুফ সংশোধন। ব্যবহৃত হরফ পাল্টে দিয়ে প্রুফ (Proof) সংশোধনের ব্যবস্থা নির্ভুল গ্রন্থপ্রকাশের সুযোগ এনে দেয়। এভাবে সম্ভবত ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ মেইনজ শহরে গুটেনবার্গ প্রথম সচল টাইপ সংবলিত আধুনিক মুদ্রণযন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন, যার ফলে মুদ্রণ প্রক্রিয়ার বহুগুণ উন্নতি সাধিত হয়। নির্ভুল ছাপা এবং পরিবর্তনশীলতা মুদ্রণবিপ্লবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিগণিত হয়।

(3) মুদ্রিত রচনাসমূহ: গুটেনবার্গের ঢালাই ধাতুর টাইপের ব্যবহার মুদ্রণশিল্পে এনে দেয় গতির ছোঁয়া। তাঁর ছাপাখানা থেকে মুদ্রিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থটি (যা প্রচলিত অর্থে প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থের মর্যাদা পায়) হল বাইবেলের একটি অংশ। ১৪৫৫/৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ল্যাটিন ভাষায় লেখা এই বাইবেল ম্যাজারিন বাইবেল Mazarin Bible) বা গুটেনবার্গ বাইবেল (Gutenberg Bible) নামে পরিচিত। ঐতিহাসিকগণ আবার এই বাইবেলকে ৪২-লাইনের বাইবেল (পাতা প্রতি ৪২টি লাইন) বলে অভিহিত করেন। কারণ-প্রায় একই সময়ে মেইনজে প্রচলিত অন্য একটি মুদ্রিত বাইবেলের প্রতি পৃষ্ঠায় লাইনের সংখ্যা ছিল ৩৬টি। বইগুলির নিখুঁত ছাপা এবং সুন্দর বাঁধাই এদের আকর্ষণীয় করে তোলে। পরবর্তীকালে ল্যাটিন ভাষায় স্কুলপাঠ্য একটি গ্রামার বইও ছাপা হয় এই যন্ত্রে।

(4) মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার: গুটেনবার্গের মুদ্রণ পদ্ধতি অবলম্বন করে সপ্তদশ শতকের মধ্যে ইউরোপে প্রায় ১৫০০ ছাপাখানা গড়ে উঠেছিল। ইংল্যান্ডের উইলিয়ম ক্যাক্সটন (William Caxton) নামক এক বণিক ও লেখক জার্মানি থেকে মুদ্রণ পদ্ধতি এবং মুদ্রণযন্ত্রের যাবতীয় কৌশল শিখে তা প্রবর্তন করেন ইংল্যান্ডে (১৪৭৬ খ্রিস্টাব্দ)। ইউরোপের কোণে কোণে পৌঁছে যায় ছাপা বইপত্র, প্রকাশিত হতে থাকে বিভিন্ন প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন পুথির একাধিক নতুন নতুন সংস্করণ।

মন্তব্য

গুটেনবার্গকে তাঁর ছাপাখানার জন্য জোহান ফুস্টের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে তিনি প্রবল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। ১৪৬৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু ঘটে ‘ছাপাখানার জনক’ জোহানেস গুটেনবার্গের। তবে নানা বাধা সত্ত্বেও, আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের দ্বারা গুটেনবার্গ বই মুদ্রণের খরচ কমিয়ে তথা জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটিয়ে আধুনিক মানবসভ্যতা ও ইতিহাসের প্রতিটি ক্ষেত্রকে যেভাবে প্রভাবিত করেছিলেন, তার গুরুত্ব অপরিসীম।

আরও পড়ুন – মধ্যযুগীয় ভারতের শিক্ষা প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment