শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাচীন অনুবর্তনের গুরুত্ব: নিম্নশ্রেণির প্রাণী থেকে মানুষ পর্যন্ত প্রত্যেকের শিখনে প্রাচীন অনুবর্তন প্রক্রিয়ার ব্যবহার রয়েছে। এই ব্যবহারগুলি নীচে আলোচনা করা হল।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাচীন অনুবর্তনের গুরুত্ব

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাচীন অনুবর্তনের গুরুত্ব: নিম্নশ্রেণির প্রাণী থেকে মানুষ পর্যন্ত প্রত্যেকের শিখনে প্রাচীন অনুবর্তন প্রক্রিয়ার ব্যবহার রয়েছে। এই ব্যবহারগুলি হল-
(1) ভাষা শিক্ষা: শিশুকে ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ বস্তু বা ব্যক্তি বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশেষ একটি শব্দ বারবার উচ্চারণ করলে শিশু ওই শব্দটি অনুবর্তনের মাধ্যমে শেখে। যেমন- একজন পুরুষকে দেখিয়ে বারবার দাদু শব্দটি উচ্চারণ করলে ওই পুরুষই শিশুটির কাছে দাদু হিসেবে অনুবর্তিত হয়। অনুবর্তিত হওয়ার আগে ‘দাদু’ শব্দটি শিশুর কাছে অর্থহীন ছিল কিন্তু যখন অনুবর্তন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হল তখন ‘দাদু’ শব্দটি শিশুটির কাছে অর্থপূর্ণ হল।
(2) শিক্ষার্থীর আগ্রহ সৃষ্টি: একজন শিক্ষার্থীর কোনো বিষয়ের প্রতি ভয় ছিল। অনুবর্তনের মাধ্যমে সেই বিষয়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়। যেমন-একজন খুব রাগি শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীকে অঙ্ক শেখান, একটু ভুল করলে তাকে বকাবকি করেন, তখন শিক্ষার্থীর অঙ্কের প্রতি ভীতি সৃষ্টি হয়। কিন্তু একজন শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীকে সহানুভূতির মাধ্যমে যথাযথ শিক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমে অঙ্ক শেখান তখন শিক্ষার্থীর অঙ্কের ভীতি দূর হয়। সুতরাং অনুবর্তন কোনো বিষয়ে আগ্রহ সৃষ্টিতে সাহায্য করে।
(3) শিশুর শিখন : শিশুদের বর্ণ, শব্দ, নামতা, সাধারণ গাণিতিক প্রক্রিয়া ইত্যাদি শিখনে অনুবর্তন পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকরী।
(4) সু-অভ্যাস গঠন : শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অভ্যাস গঠন যেমন- বানান ভুলের শুদ্ধিকরণ, অশ্লীল ভাষা ব্যবহারের অভ্যাস পরিত্যাগ, মুদ্রাদোষ পরিত্যাগ ইত্যাদির মতন সু-অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনুবর্তন প্রক্রিয়াকে কাজে লাগানো হয়।
(5) দক্ষতা অর্জন: শিশুদের কথা বলা, লেখা, আঁকা, অঙ্ক কষা ইত্যাদি দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রাচীন অনুবর্তন প্রক্রিয়াকে কাজে লাগানো যায়।
(6) সামাজিক মনোভাব গঠন: শিশুদের মধ্যে সামাজিক মনোভাব যেমন- সহানুভূতি, সহযোগিতা, সহমর্মিতাবোধ ইত্যাদি মনোভাব গঠনের ক্ষেত্রে অনুবর্তন প্রক্রিয়া কার্যকরী।
(7) প্রাক্ষোভিক বিকাশ: শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন হিতকর প্রক্ষোভযেমন- আনন্দ, স্নেহ, ভালোবাসা ইত্যাদির মতন প্রক্ষোভের বিকাশ ও বিভিন্ন ধরনের অহিতকর প্রক্ষোভ যেমন- ভয়, রাগ, হিংসা ইত্যাদি দূরীকরণ-এই ক্ষেত্রগুলিতে অনুবর্তন প্রক্রিয়ার ব্যবহার করা হয়।
(৪) ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি: কোনো বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে অনুবর্তন প্রক্রিয়াকে কাজে লাগানো যায়।
(9) মানসিক চিকিৎসা : শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অপসংগতিমূলক আচরণ দূর করার জন্য বিভিন্ন সময়ে মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। এই মানসিক চিকিৎসার জন্য অনুবর্তন প্রক্রিয়া কাজে লাগে।
(10) শিক্ষকের আচরণ: শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ইত্যাদি শিক্ষকের আচার-আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ, অভ্যাস প্রভৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থী অনুবর্তিত হয়। তাই শ্রেণিকক্ষের ভিতরে বা বাইরে শিক্ষকের আচার-আচরণ, অভ্যাস, শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্যবহার এমন হওয়া উচিত, যাতে অনুবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষক ও গুরুজন সম্পর্কিত উপযুক্ত অভ্যাস গড়ে ওঠে।
শিশুর শিখন সবসময় উদ্দীপকনির্ভর নয়, শিখনে শিক্ষার্থীর সক্রিয় ভূমিকাও থাকে। অনুবর্তন কৌশল শিশুর ব্যক্তিগত উপাদানগুলিকে অগ্রাহ্য করে, তাই-অনুবর্তনের মাধ্যমে শিখন স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। তাই প্রাচীন অনুবর্তনবাদ মানুষের শিখন প্রক্রিয়ার আংশিক ব্যাখ্যা এবং অনুবর্তনমূলক মানুষের বিভিন্ন অভ্যাস, চর্চামূলক শিখনকে ব্যাখ্যা করতে পারে।
প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা
প্রাচীন অনুবর্তন উদ্দীপকনির্ভর। তাই সবধরনের শিখনের ক্ষেত্রে প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্ব কার্যকর নয়। যেসব ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব কার্যকরী নয়, সেগুলি হল—
- ধারণার শিখন, সমস্যা সমাধানের শিখন ইত্যাদি এই তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না।
- বয়স্কদের শিখনের ক্ষেত্রে এই তত্ত্বের কার্যকারীতা অপেক্ষাকৃত কম।
- যেসব শিখনের ক্ষেত্রে শিশুর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য যেমন- আগ্রহ, প্রেষণা, দৈহিক অবস্থা, মানসিক প্রস্তুতি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ, সেই ধরনের শিখনে অনুবর্তনবাদ খুব বেশি কার্যকর নয়।
- অনেক মনোবিদই মনে করেন, অনুবর্তনের দ্বারা ইতর প্রাণী ও শিশুদের শিখনকে ব্যাখ্যা করা গেলেও মানুষের সম্পূর্ণ শিখন প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
- অনেক অভিজ্ঞতা আছে যা চর্চা ছাড়াই বহুদিন মনে রেখে তার প্রয়োগ ঘটাতে পারা যায়। তার জন্য মাঝে মাঝে পুনঃসংযোজন (Reinforcement) প্রয়োজন হয় না। এই ধরনের বৈশিষ্ট্যের কোনো ব্যাখ্যা এই তত্ত্বের মধ্যে পাওয়া যায় না।
- প্যাভলভের মতানুযায়ী, উদ্দীপকের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে অনুবর্তন হয়। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে এমন অনেক বিষয় শেখা হয়, যার পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। প্রাচীন অনুবর্তনে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার স্থান না থাকায় এটি একটি যান্ত্রিক পদ্ধতি।
সুতরাং প্রাচীন অনুবর্তনবাদের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অভ্যাস ও চর্চামূলক শিখনের ক্ষেত্রে অনুবর্তনবাদ বহুল প্রচলিত।