গেস্টাল্ট মনোবিজ্ঞান একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব যা সংবেদন এবং প্রত্যক্ষণকে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত জার্মান মনোবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়ারদাইমার (Wertheimer), কুর্ট কঙ্কা (Kurt Koffka) ও উল্ল্ফগ্যাঙ কোহলার (Wolfgang Kohler) প্রমুখ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। গেস্টাল্ট তত্ত্ব বিশ্বাস করে যে, আমরা বিভিন্ন প্রকার জিনিসকে তাদের সম্পূর্ণতা হিসেবে উপলব্ধি করি, খণ্ডিত অংশ হিসেবে নয়। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই তত্ত্বের প্রভাব বিশাল এবং এর প্রয়োগ শিক্ষণ পদ্ধতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

গেস্টাল্ট তত্ত্ব ও অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন [Gestalt Theory and Insightful Learning]
গেস্টাল্ট তত্ত্বের মূলনীতি
গেস্টাল্ট তত্ত্বের কিছু নীতি রয়েছে যা আমাদের সংবেদন এবং প্রত্যক্ষণের প্রক্রিয়া বোঝাতে সাহায্য করে। এই নীতিগুলি হল-
(1) সম্পূর্ণতা: গেস্টাল্ট তত্ত্বের প্রধান ধারণা হল কোনো বস্তু বা ঘটনা তার পৃথক অংশগুলির সমষ্টির চেয়ে বেশি। আমরা জিনিসগুলিকে তাদের সম্পূর্ণতা হিসেবে উপলব্ধি করি। যেমন-একটি গাড়ির ছবি দেখে আমরা পুরো গাড়িকে চিনতে পারি। তার টায়ার, দরজা বা ইঞ্জিন আলাদ করে নয়।
(2) প্রেক্ষাপটের প্রভাব: আমাদের প্রত্যক্ষণ প্রেক্ষাপট বা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি নির্দিষ্ট রং আলাদা প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখাতে পারে।
(3) নৈকট্য: কাছাকাছি অবস্থিত উপাদানগুলোকে আমরা একটি গ্রুপ হিসেবে দেখি। একসাথে থাকা বিন্দুগুলোকে আমরা একটি রেখা হিসেবে দেখতে পারি। যেমন-তিনটি বিন্দু যদি খুব কাছাকাছি থাকে, তাহলে আমরা তাকে একটি ত্রিভুজ হিসেবে বুঝতে পারি।
(4) সাদৃশ্য: একই ধরনের বা সাদৃশ্যপূর্ণ উপাদানগুলোকে আমরা একটি গ্রুপ হিসেবে দেখি। উদাহরণস্বরূপ, একই রং বা আকারের বস্তুগুলোকে আমরা একই গ্রুপ হিসেবে চিনতে পারি।
(5) নিরবিচ্ছিন্নতা: আমরা নিরবিচ্ছিন্ন বা ধারাবাহিক ধরনগুলিকে সহজে বুঝতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, একটি বাঁকানো রেখাকে আমরা একটি ধারাবাহিক রেখা হিসেবে বুঝি।
(6) বন্ধন: আমরা অসম্পূর্ণ আকার বা ছবি সম্পূর্ণ করার প্রবণতা রাখি। উদাহরণস্বরূপ, একটা ভাঙা বৃত্তকে আমরা সম্পূর্ণবৃত্ত হিসেবে দেখি।
(7) গঠন: আমরা জিনিসসমূহকে প্রধান বস্তু (figure) এবং পটভূমি (ground) হিসেবে ভাগ করে দেখি। উদাহরণস্বরূপ, একটি ছবি দেখে আমরা মূল অবজেক্ট এবং তার পটভূমি আলাদা করতে পারি।
গেস্টাল্ট তত্ত্বের উপকারিতা
গেস্টাল্ট তত্ত্বের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা রয়েছে যা শিক্ষাক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
(1) অর্থপূর্ণ শিখন: গেস্টাল্ট তত্ত্ব শিক্ষার্থীদের অর্থপূর্ণ শিখন অভিজ্ঞতা প্রদান করতে সক্ষম। শিক্ষার্থীরা বিষয়বস্তু সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারে এবং তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারে।
(2) দ্রুত ও সঠিক প্রত্যক্ষণ: গেস্টাল্ট তত্ত্বের নীতি অনুসারে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন উপাদান দ্রুত এবং সঠিকভাবে প্রত্যক্ষণ করতে পারে, যা তাদের শিক্ষার প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে তোলে।
(3) উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল চিন্তা: গেস্টাল্ট তত্ত্ব শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী এবং সৃজনশীল চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। এটি তাদের নতুন ধারণা তৈরি করতে এবং সমস্যাসমাধানে নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে সহায়তা করে।
গেস্টাল্ট তত্ত্বের প্রবর্তক
ওয়ারদাইমার (Wertheimer), কুর্ট কঙ্কা (Kurt Koffka) ও উলফগ্যাং কোহলার (Wolfgang Kohler) প্রমুখ সমগ্রতাবাদীগণ শিখনের কৌশল হিসেবে অন্তর্দৃষ্টি কৌশলের কথা বলেন। অন্তর্দৃষ্টির মূল কথা, সমস্যামূলক পরিস্থিতিকে আমরা সামগ্রিকভাবে প্রত্যক্ষ করি এবং প্রতিক্রিয়া করি। এই সামগ্রিক প্রত্যক্ষণের ফলেই পরিস্থিতির অর্থ পরিষ্কার হয়।
গেস্টাল্ট তত্ত্বের মূল ভিত্তি
গেস্টাল্ট তত্ত্বানুযায়ী, আমাদের প্রত্যক্ষণের প্রত্যেক বস্তুর একটি সামগ্রিক সত্তা আছে, যাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিশ্লেষণ করলে সেই সমগ্র সত্তাটির পরিচয় পাওয়া যায়। সমস্যামূলক পরিস্থিতির সমগ্ররূপ উপলক্ষ হয় অন্তর্দৃষ্টির জাগরণের মাধ্যমে। এই অন্তর্দৃষ্টির জাগরণই হল শিখনের মূলকথা।
অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে শিখনের স্তরসমূহ
অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে শিখনের স্তরগুলি হল-
(1) সামগ্রিক প্রত্যক্ষণ: এক্ষেত্রে শিক্ষার্থী প্রধানত চারটি নীতি অনুসরণ করে, যথা-[i] বিচ্ছিন্নকরণের নীতি, [ii] সাদৃশ্যের নীতি, [iii] নৈকট্যের নীতি এবং [iv] পরিমিতির নীতি।
(2) উন্নততর প্রতিক্রিয়া: সমগ্র সমস্যাটির উদ্দেশ্যে সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া।
(3) প্রাগনাঞ্চ: অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য শিক্ষার্থীর মধ্যে একটা ছটফটানি ভাব জাগ্রত হয়।
(4) পৃথকীকরণ: শিক্ষার্থী পৃথকীকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে শিখন পরিস্থিতির অপ্রয়োজনীয় অংশগুলিকে বাদ দিয়ে প্রয়োজনীয় অংশগুলি গ্রহণ করে।
(5) সামান্যীকরণ: শিক্ষার্থী পৃথকীকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রয়োজনীয় অংশগুলির মধ্যে সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে সাধারণ সূত্র গঠন করে।
(6) উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার সমন্বয়: এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয়সাধনের চেষ্টা করে।
(7) অন্তর্দৃষ্টি: এই স্তরে সমস্যাটির সমাধান শিক্ষার্থীর মনে বিদ্যুৎ চমকের মতো উদয় হয়। ফলে অকস্মাৎ আচরণের পরিবর্তন ঘটে। একে অন্তর্দৃষ্টির জাগরণ বলে।
(8) শিখন: অন্তর্দৃষ্টির জাগরণে আচরণের পরিবর্তন ঘটে এবং আচরণের পরিবর্তনে শিখন সংঘটিত হয়।
অন্তর্দৃষ্টি শিখনের বৈশিষ্ট্য
(1) সামান্যীকরণ ও পৃথকীকরণ: সমগ্রতাবাদীগণ অন্তর্দৃষ্টি জাগ্রত হওয়ার জন্য দুটি মানসিক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এই দুটি প্রক্রিয়া হল-সামান্যীকরণ এবং পৃথকীকরণ। শিখন পরিস্থিতির মধ্যে যেগুলি অপ্রাসঙ্গিক সেগুলিকে বাতিল করে কেবলমাত্র প্রাসঙ্গিক ও সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলিকে বেছে নেওয়ার নামই হল পৃথকীকরণ এবং পরে ওই সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলির ওপর ভিত্তি করে সামান্যধর্মী সূত্র তৈরি করার নামই হল সামান্যীকরণ।
(2) নিজস্ব বৈশিষ্ট্যাবলি: শিখনের ক্ষেত্রে কোনো কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে বাধাপ্রাপ্ত হলে শিখনে অংশগ্রহণকারীর অর্থাৎ শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি অতৃপ্তিকর অবস্থার উন্মেষ ঘটে। তখন সে তার ওই ধরনের অতৃপ্তিকর অবস্থার সমাধানের উদ্দেশ্যে শিখন পরিস্থিতির সম্পূর্ণ অংশকে বিশ্লেষণ করে তার মধ্য থেকে এলোমেলো বিষয়গুলি বাদ দিয়ে সঠিক গুণকে নির্বাচন করে। এর ফলে তার সামনে সম্পূর্ণ সমস্যার সমাধান প্রস্ফুটিত হয়।
(3) সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধান: সমগ্রতাবাদীদের মতে অন্তর্দৃষ্টি শিখনের নিজস্ব কতকগুলি বৈশিষ্ট্য বা স্তর রয়েছে। এগুলি হল-[i] শিখন পরিস্থিতি বা সমস্যাকে সামগ্রিকভাবে প্রত্যক্ষ করা; [ii] অংশ বিশেষের পরিবর্তে সমগ্র সমস্যাটির উদ্দেশ্য সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করা; [iii] পরিস্থিতির অংশগুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা; [iv] সমস্যাটির অন্তর্নিহিত তত্ত্ব এবং বৈশিষ্ট্যগুলির পৃথকীকরণ ও সামান্যীকরণ ঘটানো এবং [v] সবশেষে হঠাৎই নিজের (শিক্ষার্থীর) আচরণের পরিবর্তন ঘটানো।
অন্তর্দৃষ্টি শিখনকৌশলের শিক্ষাগত প্রয়োগ
সমগ্রতাবাদী বা গেস্টাল্টবাদীদের মতে, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘটে অন্তর্দৃষ্টির ফলে। অন্তর্দৃষ্টি শিখনকৌশলকে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে গেলে নিম্নলিখিত উপায় অবলম্বন করতে হবে-
(1) বিষয়বস্তুর সামগ্রিক উপস্থাপনা: শিক্ষার্থীর শিখন পরিস্থিতির সামগ্রিকতার ওপর নির্ভরশীল। তাই শ্রেণিতে পাঠ পরিচালনার সময় শিক্ষক-শিক্ষিকারা শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুর ছোটো ছোটো অংশ উপস্থাপন না করে, যাতে সামগ্রিকভাবে তা উপস্থাপন করে, সেদিকে নজর দিতে হবে।
(2) সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে যান্ত্রিক প্রচেষ্টা নিরসন: শিক্ষার্থীরা পাঠ গ্রহণকালে বা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অন্ধ বা যান্ত্রিক প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকে, সে বিষয়টিও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের লক্ষ রাখতে হবে।
(3) পৃথকীকরণ ও সামান্যীকরণ সহায়তা: প্রতিটি শিক্ষার্থী যাতে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুর অন্তর্গত অপ্রয়োজনীয় অংশগুলি বাদ দিয়ে প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় সাধারণধর্মী বৈশিষ্ট্যগুলিকে আলাদা করে নিয়ে একটি সর্বজনীন সূত্র গঠনে সমর্থ হয়, সেই বিষয়টির প্রতি শিক্ষক-শিক্ষিকাকে যত্নবান হতে হবে।
(4) শিখনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা: পাঠ গ্রহণের পূর্বে শিক্ষার্থীরা যাতে শিখনের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পায়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে।
(5) বিষয়বস্তুর ধারাবাহিক উপস্থাপনা: শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্তর্দৃষ্টি জাগিয়ে তোলার জন্য শিক্ষাদানকালে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পাঠ বিষয়ের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। তবেই শিক্ষার্থীদের পক্ষে শিখনলক্ষ অভিজ্ঞতা আয়ত্ত করা সহজ হবে।
(6) শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা ও আগ্রহ সৃষ্টি: শিক্ষার্থী যেহেতু শিখন পরিস্থিতির একটি সক্রিয় অঙ্গ, তাই তাকে সমস্যাভিমুখী এবং সমস্যাসমাধানে আগ্রহী করে তোলার জন্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপযুক্ত শিক্ষা সহায়ক উপকরণের সাহায্য গ্রহণ করতে হবে। আকষর্ণীয় বাচনভঙ্গি, সুন্দর ও সাবলীল বিষয় উপস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ্য বিষয়ের প্রতি প্রেষণা সৃষ্টি করতে হবে। শিখনের অন্তর্দৃষ্টির তত্ত্বে শিক্ষার্থীদের আত্মসক্রিয়তা এবং শিক্ষণীয় বিষয়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির উপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের পক্ষে শিক্ষণীয় বিষয়টি সহজে আয়ত্ত করা যে সম্ভবপর হবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আরও পড়ুন | Link |
নৈতিক প্রত্যয়সমূহ প্রশ্ন উত্তর | Click Here |
চার্বাক সুখবাদ প্রশ্ন উত্তর | Click Here |
পাশ্চাত্য নীতিবিদ্যা প্রশ্ন উত্তর | Click Here |