নৈতিক তত্ত্বসমূহ প্রশ্ন উত্তর Class 11 Second Semester Philosophy WBCHSE

নৈতিক তত্ত্বসমূহ প্রশ্ন উত্তর

নৈতিক তত্ত্বসমূহ প্রশ্ন উত্তর
নৈতিক তত্ত্বসমূহ প্রশ্ন উত্তর

১। মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদ কী আলোচনা করো। 

অথবা, মনোবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ ব্যাখ্যা ও বিচার করো।

মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদ

মনোবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ অনুসারে মানুষ স্বভাবত সুখ কামনা করে। সুখ কামনা ঐচ্ছিক ক্রিয়ার একমাত্র প্রেরণা। যে কাজ আমাদের সুখের আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্ত করে তাই শুভ কাজ। সেই কাজকে আমরা কামনা করি। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দ্বারা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে এই সিদ্ধান্ত করা হয়েছে বলে এই মতবাদকে মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদ বলা হয়।

সূচিপত্র

মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদীরা বলেন কোনো বস্তুকে তার নিজের জন্য কামনা করা হয় না। যে কোনো বস্তু থেকে সুখ পাওয়ার প্রত্যাশায় আমরা বস্তুকে কামনা করি। মানুষের প্রধান প্রবণতা হল ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্ত করা। অবিরত সুখের সন্ধান করাই হল জীবন।

(1) সমর্থক: প্রাচীনকালের সিরেনেইক মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদের এবং বর্তমানকালের হক্স, বেশাম ও মিল এই মতবাদের সমর্থক ও প্রচারক।

(2) বজ্রব্য: বেথাম বলেন প্রকৃতি মানুষকে সুখ এবং দুঃখ এই দুই সাম্রাজ্যের অধীন করেছে। তাই তারাই কেবল নির্দেশ দিতে পারে আমাদের কী করা উচিত বা অনুচিত। মিল বলেন, কোনো জিনিসকে কামনা করা ও তাকে সুখদায়ক মনে করা, কোনো বস্তুর প্রতি বিরাগ হওয়া ও তাকে দুঃখদায়ক মনে করা এরা একই ঘটনার দুটি দিক। সুতরাং মিলের মতে, আমাদের সর্বদা সুখ কামনা করা উচিত।

(3) সমালোচনা: মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদ সম্পূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য মতবাদ নয়। এই মতবাদের বিরুদ্ধে যে আপত্তিগুলি ওঠে তা নিম্নরূপ-

  • প্রথমত:  সুখ আমাদের কর্মের প্রেরণা নয়। আমরা সরাসরি সুখ কামনা করি না। আমাদের কর্মের মূলে থাকে কোনো অভাববোধ। ওই অভাব দূর করতে পারে এমন কোনো দ্রব্য আমরা কামনা করি।
  • দ্বিতীয়ত:  মতবাদটি সুখবাদের বিরোধাভাস দোষে দুষ্ট। সুখের প্রতি আকর্ষণ তীব্র হলে সুখকে হারাতে হবে। তাই সুখ লাভের শ্রেষ্ঠ উপায় হল সুখকে ভুলে যাওয়া।
  • তৃতীয়ত:  বাটলার বলেন সব ক্ষেত্রে সুখ কামনা বস্তুর আকাঙ্ক্ষার পূর্ববর্তী নয়। পরোপকারের ইচ্ছা মনে আগে সৃষ্টি না হলে পরোপকার করে সুখ লাভ করা যায় না। সুতরাং সুখের কামনা সব কর্মের প্রেরণা একথা সত্য নয়।

পরিশেষে বলা যায় মনোবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ সত্য হলে নীতিবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ অর্থহীন হয়ে পড়ে। যদি মানুষ স্বভাবত সুখ কামনা করে তবে একথা বলার কোনো অর্থ হয় না যে মানুষের সুখ কামনা করা উচিত। তাই মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদ কতটা যথার্থ তা আলোচনাসাপেক্ষ।

২। মনোবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ ও নীতিবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ-এর মধ্যে মূল পার্থক্য দেখাও। প্রথমটি কি দ্বিতীয়টির ভিত্তি হতে পারে?

মনোবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ ও নীতিবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ

নীতিবিজ্ঞানে আলোচ্য বিভিন্ন প্রকার নৈতিক আদর্শ সম্পর্কীয় মতবাদের মধ্যে সুখবাদ অন্যতম। সুখবাদ অনুসারে নৈতিক জীবনের পরমপুরুষার্থ হল সুখ। সুখ একমাত্র কাম্যবস্তু। সুখ নৈতিক কর্মের মানদণ্ড। যে কাজ দুঃখের তুলনায় অধিক সুখ প্রদান করে, সেই কাজ ভালো কাজ। সুখলাভের পরিপন্থী কাজ হল মন্দ কাজ। সুখবাদ দুই প্রকার- মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদ, নীতিবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ।

(1) মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদ : মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদ অনুসারে মানুষ স্বভাববশত সুখকে কামনা করে। সুখদায়ক বস্তু কামনা করাই হল মানুষের স্বভাব। সুখই হল সেই নৈতিক মানদণ্ড যা নির্ধারণ করে যে কোন্ কাজ ভালো এবং কোন্ কাজ মন্দ।

(2) নীতিবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ: এটি একটি নৈতিক আদর্শ সম্পর্কিত মতবাদ, এই মতবাদ অনুসারে সুখ বা ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তি হল মানুষের নৈতিক আদর্শ বা পরমার্থ। সুখ হল নৈতিক কর্মের মানদন্ড। যে কাজ সুখদায়ক তা ন্যায়সম্মত এবং যে কাজ দুঃখদায়ক তা অন্যায় আচরণ। লিলি বলেন সুখবোধ হল একমাত্র গুণ যার জন্য একটি অভিজ্ঞতা বা কাজ ভালো বা মূল্যবান হয়ে থাকে।

(3) মূল পার্থক্য: মনোবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ অনুসারে মানুষ স্বভাবত সুখ চায় এবং দুঃখ পরিহার করতে চায়। কোনো বস্তুকে তার নিজের জন্য কামনা করা হয় না, বস্তু থেকে সুখলাভ হবে-এই প্রত্যাশায় সুখ কামনা করা হয়। অপরপক্ষে নীতিবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ অনুসারে মানুষের সুখ কামনা করা উচিত। মনোবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ অনুসারে বলা হয় ‘আমরা সুখ চাই’। এই অভিমত বর্ণনামূলক। কারণ মনোজগতে স্বাভাবিকভাবে যা ঘটে এই মতবাদটি তার বর্ণনা দেয়। অপরদিকে নীতিবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ অনুসারে বলা হয় ‘আমাদের সুখ চাওয়া উচিত’। এই মতবাদটি ঔচিত্যমূলক ও নৈতিক আদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

মনোবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ সত্য হলে নীতিবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদ অর্থহীন হয়ে পড়ে। যদি ‘মানুষ স্বভাবত সুখ কামনা করে’ মনোবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদের এই বক্তব্য সত্য হয় তবে, ‘মানুষের সুখ কামনা করা উচিত’ নীতিবিজ্ঞানসম্মত সুখবাদের এই উক্তি তাৎপর্যহীন হয়ে পড়ে। এই কারণে প্রথমটি দ্বিতীয়টির ভিত্তি হতে পারে না। যা ঘটে এবং যা হওয়া উচিত এই দুটির পার্থক্য এতই বেশি যে এদের মধ্যে কোনো অনিবার্য সম্বন্ধ স্থাপন করা যায় না।

৩। আত্মসুখবাদ কাকে বলে? ফলমুখী নৈতিক মতবাদ হিসেবে  আত্মসুখবাদের পরিচয় দাও।

আত্মসুখবাদ

যে মতবাদ অনুসারে মানুষের জীবনের একমাত্র কাম্যবস্তু বা লক্ষ্য হল তার নিজের সুখ কামনা করা তাকে আত্মসুখবাদ বলে।

ফলমুখী নৈতিক মতবাদ হিসেবে আত্মসুখবাদের পরিচয়

এই মতবাদ অনুসারে প্রত্যেক মানুষের উচিত তার নিজের জন্য সর্বাধিক সুখ কামনা করা। সুখের পরিমাণ নির্ধারিত হয় তার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব দ্বারা।

(1) প্রবন্ধা: প্রাচীন গ্রিসে সর্বপ্রথম এই মতবাদ প্রচারিত হয়েছিল। অ্যারিস্টিপাস ও এপিকিউরাস হলেন এই মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা। আধুনিক যুগে নীৎসে, হক্স প্রমুখের দর্শন আলোচনায় আত্মসুখবাদের পরিচয় পাওয়া যায়।

(2) আত্মসুখবাদের মূলনীতি: আত্মসুখবাদের মূলনীতিগুিলি হল-

  • নিজের জন্য সর্বাধিক পরিমাণ সুখ কামনা করা হল উচিত কর্ম।
  • সুখের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব দ্বারা সুখের পরিমাণ নির্ধারিত হয়।
  • ব্যক্তিগত সুখের পরিমাণের বিচারে কাজের নৈতিক বিচার করা হয়।
  • নিজের সুখলাভই হল আত্মসুখবাদের প্রধান উদ্দেশ্য।

(3) আত্মসুখবাদের প্রকারাভদ: আত্মসুখবাদ দুই প্রকার। যথা- স্থূল বা অমার্জিত আত্মসুখবাদ (Gross Egoistic Hedonism) এবং সংযত বা মার্জিত আত্মসুখবাদ (Refined Egoistic Hedonism)।

  • স্থূল বা অমার্জিত আত্মসুখবাদ: স্থল বা অমার্জিত আত্মসুখবাদ অনুসারে, মানুষের একমাত্র লক্ষ্য হল নিজের ইন্দ্রিয়সুখ কামনা করা। যে-কোনো উপায়ে নিজের সুখ উপভোগ করাই হল একমাত্র কাম্য বিষয়। এই মতবাদ অনুসারে, পৃথিবীতে আমরা যে বিভিন্ন প্রকার সুখ উপভোগ করি তার মধ্যে কোনো গুণগত পার্থক্য নেই, আছে কেবল পরিমাণগত পার্থক্য। গ্রিক পণ্ডিত অ্যারিস্টিপাস ছিলেন স্থূল বা অমার্জিত সুখবাদের প্রবর্তক ও প্রচারক।
  • সুক্ষ্ম বা মার্জিত আত্মসুখবাদ: সুক্ষ্ম বা মার্জিত আত্মসুখবাদে বলা হয় মানুষের লক্ষ্য হল সুখলাভ করা। কিন্তু এই সুখলাভের পথ নির্দেশ শুধুমাত্র অন্ধ আবেগ-অনুভূতির দ্বারা হওয়া উচিত নয় তার জন্য প্রয়োজন বুদ্ধির। বুদ্ধি হল নৈতিক জীবনের এক অপরিহার্য বিষয়। এই বুদ্ধির মাধ্যমেই উচ্চতর সুখের সন্ধান পাওয়া যায়। এই মতবাদে বলা হয়, শারীরিক সুখ নিম্নস্তরের ও মানসিক সুখ হল উচ্চস্তরের। প্রাচীন গ্রিসের এপিকিউরাস সূক্ষ্ম বা মার্জিত আত্মসুখবাদের প্রবর্তক ও প্রচারক।

(4) সমালোচনা: বিভিন্ন দার্শনিক আত্মসুখবাদের বিরুদ্ধে নানা আপত্তি উত্থাপন করেছেন। সেগুলি নিম্নরূপ-

  • প্রথমত:  আত্মসুখবাদে নিজের সুখকেই একমাত্র কাম্য বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এই কর্তব্যনীতি ব্যক্তিকে প্রকৃতপক্ষে স্বার্থপর করে তোলে যা কোনো প্রকৃত মানুষের পক্ষে শোভনীয় নয়। তাই আত্মসুখবাদকে গ্রহণযোগ্য মতবাদ বলা যায় না।
  • দ্বিতীয়ত:  আত্মসুখবাদকে সম্পূর্ণভাবে মেনে নিলে সামাজিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। কারণ এই মতবাদ অনুসারে, মানুষ নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্যের দুঃখ হলেও নিজের সুখকেই প্রাধান্য দেয়। যার ফলে সমাজের সার্বিক কল্যাণ সাধিত হয় না বরং বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। যেমন-মানুষ নিজের স্বার্থে কোনো অঙ্গীকার পালন করবে না, চৌর্যবৃত্তিকে প্রশ্রয় দেবে। এর ফলে সমাজের কল্যাণ সাধনের পরিবর্তে অকল্যাণ সাধিত হবে।
  • তৃতীয়ত:  আত্মসুখবাদের বিরুদ্ধে আর একটি আপত্তি হল-এই মতবাদ মনুষ্যজাতির নৈতিক অন্তর্দৃষ্টির বিরুদ্ধে অত্যন্ত বিতৃয় মনোভাব পোষণ করে। কারণ একজন প্রকৃত বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কখনোই কেবল নিজের সর্বাধিক পরিমাণ সুখের কথা চিন্তা করেন না, বরং অপরের সুখ কামনাও তার চিন্তার বিষয়।

৪। আত্মসুখবাদ-এর ববিরুদ্ধে সমালোচনাগুলি আলোচনা করো।

আত্মসুখবাদ

আত্মসুখবাদ অনুসারে দাবি করা হয় যে প্রত্যেক মানুষের উচিত তার নিজের কল্যাণের জন্য সর্বাধিক পরিমাণে সুখ কামনা করা। আত্মসুখবাদ অনুসারে সুখের পরিমাণ নির্ধারিত হয় সুখের তীব্রতা এবং স্থায়িত্বের দ্বারা। তাদের মতে কাজের নৈতিকতা বিচার করা যায় সুখের পরিমাণ বিচারের দ্বারা।

(1) আত্মসুখবাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা বা আপত্তি: নৈতিক বিচারের মানদণ্ড হিসেবে আত্মসুখবাদ একটি উল্লেখযোগ্য মতবাদ। তবে এই মতবাদ সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। আত্মসুখবাদের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা বা আপত্তিগুলি উত্থাপিত হয় সেগুলি নিম্নরূপ-

  1. আত্মসুখবাদের ভিত্তি হল মনস্তত্ত্বসম্মত সুখবাদ: সুখবাদের দুটি রূপ আছে, একটি হল মনস্তত্ত্বসম্মত সুখবাদ এবং অপরটি হল নৈতিক সুখবাদ। আত্মসুখবাদ নৈতিক সুখবাদের একটি প্রকার হলেও এর ভিত্তি হল মনস্তত্ত্বসম্মত সুখবাদ। যার ফলে মনস্তত্ত্বসম্মত সুখবাদে যে ত্রুটিগুলি রয়েছে সেগুলি এই আত্মসুখবাদে পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ মনস্তত্ত্বসম্মত সুখবাদে যেমন কাম্যবিষয় নির্বাচনে ভুল রয়েছে তেমনি আত্মসুখবাদে এই একই ভুল রয়েছে।
  2. সুখের পরিমাণ নির্ধারণ: আত্মসুখবাদ অনুসারে সুখের পরিমাণনির্ধারিত হয় সুখের তীব্রতা এবং স্থায়িত্বের দ্বারা। কিন্তু সুখের অনুভূতি কখনোই পরিমাপযোগ্য বিষয় নয়। এটি হল এক প্রকার মানসিক অনুভূতি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মসুখবাদ সমালোচিত হয়েছে।
  3. আত্মসুখ নৈতিক আদর্শ নয়: আত্মসুখবাদ অনুসারে নৈতিক আদর্শ হবে মানুষের আত্মসুখ, কিন্তু এই মতকে সমর্থন করা যায় না। আত্মসুখকে যদি নৈতিক আদর্শ বলা হয় তাহলে তা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হবে। কিন্তু নৈতিক আদর্শ কখনোই ভিন্ন ভিন্ন হয় না, সেটি সার্বিক হয়। সুতরাং আত্মসুখবাদীদের তত্ত্ব স্বীকার করা যায় না।
  4. আত্মসুখবাদে স্বার্থপরতার প্রবেশ: আত্মসুখবাদী হিসেবে আধুনিক নীতি দার্শনিক টমাস হবসের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতে মানুষ নিজ স্বভাবগুণে স্বার্থপর এবং মানুষের সমস্ত ক্রিয়াকলাপের মূলে থাকে স্বার্থপর মনোভাব। টমাস হবসের এরূপ বক্তব্য সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ মানব প্রকৃতির এরূপ ব্যাখ্যা প্রদান করা হলে মানুষের সহানুভূতি, সহমর্মিতা, ভালোবাসা, দয়া-মায়া প্রভৃতি গুণগুলিকে অগ্রাহ্য করা হয়, যা কখনোই সঠিক বলা যায় না।
  5. ইন্দ্রিয়সুখ মানব জীবনের পরম আদর্শ নয়: স্থূল আত্মসুখবাদীদের মতে ইন্দ্রিয়সুখ বা দৈহিকসুখ হল জীবনের পরম আদর্শ। কিন্তু এ কথাকে যথার্থ বলা যায় না। কারণ মানুষের যেমন জৈবিক বা দৈহিক কামনা থাকে তেমনি মানুষের মধ্যে বৌদ্ধিক জ্ঞানের কামনা থাকে।
  6. আত্মসুখবাদ না-সূচক মতবাদ: স্থূল আত্মসুখবাদের তুলনায় সংযত আত্মসুখবাদ অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মতবাদ হলেও, এই মতবাদে মানুষের সুখকে নঞর্থক দিক থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। সংযত আত্মসুখবাদী দার্শনিক এপিকিউরাস সুখের বর্ণনা না দিয়ে বরং সুখ কী নয় তা উল্লেখ করেছেন।

৫। বিভিন্ন প্রকার উপযোগবাদ আলোচনা করো? 

অথবা, উপযোগবাদের বিভিন্ন রূপগুলি সংক্ষেপে উল্লেখ করো।

উপযোগবাদের বিভিন্ন প্রকার

উপযোগবাদ হল সেই মতবাদ যেখানে বলা হয়-কোন্ কাজটি ন্যায়, কোন্টি অন্যায় তা বিচার করার চূড়ান্ত মানদণ্ড হল উপযোগনীতি। ফ্র্যাঙ্কেনা। তাঁর ‘Ethics’ গ্রন্থে তিন প্রকার উপযোগবাদের কথা বলেছেন-  সাধারণ উপযোগবাদ, কর্ম উপযোগবাদ,  নিয়ম উপযোগবাদ।

(1) সাধারণ উপযোগবাদ : সাধারণ উপযোগবাদ অনুসারে কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সকলে যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজ করে এবং তার ফল যদি ভালো হয় তবে সেই কাজের উপযোগিতা আছে। এই বক্তব্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের চিন্তাধারার মিল আছে। সেইজন্য এই মতবাদকে সাধারণ উপযোগবাদ বলা হয়।

(2) কর্ম উপযোগবাদ: কর্ম উপযোগবাদের বক্তব্য হল উপযোগ বিধির দ্বারা, আমাদের সাধারণভাবে স্থির করতে হবে কোন্ কাজ যথোচিত বা কোন্ কাজ করা আমাদের কর্তব্য। আমাদের বিবেচনা করতে হবে সম্ভাব্য বিকল্প গুলির মধ্যে কোন্ কাজটি সম্পাদন করলে সুখের পরিমাণ দুঃখের পরিমাণ অপেক্ষা বেশি হবে। এই মতবাদ অনুসারে কোনো কাজের নৈতিক গুণ পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।

(3) নিয়ম উপাযাগবাদ: নিয়ম উপযোগবাদ অনুসারে নৈতিকতার ক্ষেত্রে কোনো বিধি অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা থাকে। কোন্ কাজ করা যথোচিত হবে তা কোনো বিধির দ্বারা নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের বিচার্য বিষয় এই নয় যে কোন্ কাজ সর্বপেক্ষা উপযোগী, বরং আমাদের প্রশ্ন হবে কোন্ বিধি সর্বাপেক্ষা উপযোগী। উপযোগিতার মানদণ্ডে যে বিধি সর্বাপেক্ষা উপযোগী বা অনুসরণযোগ্য বলে মনে হবে সেই বিধি অনুসরণ করে যে আচরণ করা হবে, তা যথোচিত কাজ। এই আচরণ বিধি আমাদের ক্ষেত্র বিশেষে নির্বাচন করতে হবে। প্রয়োজনে পরিমার্জিত বা পরিত্যাগ করতে হবে। দার্শনিক মিল ও ব্রান্ডট্ এই মতবাদের প্রচারক।

৬। সাধারণ উপযোগবাদের বক্তব্য বিষয়টি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।

সাধারণ উপযোগবাদ

নীতিদর্শনে নৈতিকতা দুই প্রকার হতে পারে। যথা-ফলমুখী বা উদ্দেশ্যমুখী নৈতিকতা এবং নিয়মভিত্তিক নৈতিকতা। উপযোগবাদ যেমন ফলমুখী নৈতিকতাকে আশ্রয় করে হতে পারে তেমনি আবার নিয়মভিত্তিক নৈতিকতাকে কেন্দ্র করেও হতে পারে। উপযোগবাদের মূল কথা হল যে কাজ বহু লোকের সুখ উৎপাদনের উপযোগী সেই কাজ যথোচিত আর যে কাজ সুখ উৎপাদনের উপযোগী নয় তা অনুচিত বা মন্দ। অর্থাৎ এই মতবাদের উপযোগিতাকেই নৈতিক বিচারের মানদণ্ডরূপে স্বীকার করা হয়েছে। অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্কেনা তাঁর ‘Ethics’ গ্রন্থে তিন প্রকার উপযোগবাদের উল্লেখ করেছেন। সেগুলি হল- সাধারণ উপযোগবাদ, কর্ম উপযোগবাদ এবং নীতি উপযোগবাদ।

(1) মূল বক্তব্য: সাধারণ উপযোগবাদ অনুসারে একটি পরিবেশে কোনো একজনের যদি একটি কাজ ভালো বলে গৃহীত হয় তবে সেই একই পরিবেশে অপর সকল ব্যক্তির জন্য কাজটি ভালো বলে গ্রহণ করা যায়। এই তথ্য অনুসারে উপযোগিতার বিষয়টি বিশেষ কোনো পরিস্থিতি বা নিয়মের উপর নির্ভর করে না। তবে এই তত্ত্বে সর্বজনীনতার তত্ত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

(2) সমর্থক: এম জি সিঙ্গার হলেন এই মতবাদের সমর্থক। সাধারণ উপযোগবাদ-এর ক্ষেত্রে যে নিয়মটি অনুসৃত হয় তা হল- ‘যদি বিশেষ একটি পরিস্থিতিতে একটি কাজ যথোচিত হয় তাহলে ওইরকম পরিস্থিতিতে ওই কাজটি সকলের কাছেই যথোচিত হবে।’

উদাহরণ 

একজন দরিদ্র ব্যক্তি যদি কোনো এক ধনী ব্যক্তির সম্পদ চুরি করে এবং তাতে বহুজনের উপকার হয়, তা সত্ত্বেও সাধারণ উপযোগবাদ অনুসারে বলা যায় যে, চুরি করা কাজটি উচিত কাজ নয়। কারণ সব দরিদ্র ব্যক্তিই যদি সম্পদ চুরি করে তাহলে সমাজের সর্বাধিক লোকের কাছে কাজটি যথোচিত বলে গণ্য হয় না।

মন্তব্য 

সাধারণ উপযোগবাদ-এর সাথে সাধারণ নীতিবিজ্ঞানের এক প্রকার সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। কারণ, সাধারণ উপযোগবাদে যেমন বিশেষ কোনো কর্মের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা যায় না তেমনই বিশেষ কোনো কর্ম নিয়মের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় না। এক্ষেত্রে সাধারণ একপ্রকার কর্মের উল্লেখ করা হয়।

৭। কর্ম উপযোগবাদের বিরুদ্ধে সমালোচনাগুলি কী কী?

কর্ম উপযোগবাদ

কর্ম উপযোগবাদ অনুসারে একটি কর্মের যদি কোনো একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে সর্বাধিক কল্যাণ উৎপাদনের সামর্থ্য থাকে সেক্ষেত্রে কোনো কর্মনীতি বিবেচনা না করেই কাজটির ফলাফলের ভিত্তিতে কাজটিকে যথোচিত বলা যায়। অর্থাৎ বিশেষ পরিস্থিতিতে ‘সত্য কথা বলা’-এই কাজটির দ্বারা যদি সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণ হয় তবেই কাজটি যথাযথ, অন্যথায় কাজটিকে যথাযথ বলা যায় না। কর্ম উপযোগবাদীদের মতে সত্য কথা বলার নিয়ম অনুসরণ না করে বরং পরিস্থিতি বিচার করে সত্য কথা বলা সর্বাধিক লোকের কল্যাণ সাধন করে কিনা সেটি বিচার করতে হবে। কর্ম উপযোগবাদে অতীত অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুসরণ করতে আপত্তি করে না।

(1) কর্ম উপযোগবাদের সমালোচনা: কর্ম উপযোগবাদের বিরুদ্ধে যেসব সমালোচনাগুলি উস্থাপিত হয় তা নিম্নরূপ-

  • প্রথমত: কর্ম উপযোগবাদের বিরুদ্ধে বাটলার এবং রস যে যুক্তি উত্থাপন করেছেন তা ফ্র্যাঙ্কেনা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। কোনো একটি পরিস্থিতিতে ‘ক’ ও ‘খ’ নামক দুটি কাজ সম্ভব। এই দুটি কাজ এমন যে সেই কাজের দ্বারা অমঙ্গলের থেকে মঙ্গল কতটা বেশি হবে আমরা তা পরিমাপ করতে পারি। ধরা যাক, দুটি কাজের ফল একই। ফলাফলকে যদি সংখ্যায় প্রকাশ করি তবে উভয়ক্ষেত্রে তা ১০০ একক। তথাপি ‘ক’ নামক কাজের মধ্যে হয়তো মিথ্যা কথা বলা বা কোনো অন্যায় কাজ যুক্ত আছে। কিন্তু খ-এর মধ্যে এসব কিছু নেই। বাটলার এবং রস-এর মতে, কর্ম উপযোগবাদী উভয় কাজকেই ঠিক বলবেন। কিন্তু স্পষ্টতই এরূপ ক্ষেত্রে ‘খ’ নামক কাজটিই ঠিক এবং ‘ক’ ঠিক নয়। অতএব, কর্ম উপযোগবাদ সঠিক নয়। কোনো একটি পরিস্থিতিতে ‘ক’ ও ‘খ’ নামক দুটি কাজ সম্ভব। তাদের ফলাফল পরিমাপ করলে দেখা যাবে ‘ক’ নামক কাজ ‘খ’-এর চেয়ে সামান্য বেশি পরিমাণে অমঙ্গলের চেয়ে মঙ্গল উৎপন্ন করে। কিন্তু ‘ক’-এর মধ্যে মিথ্যা কথা বলা বা কোনো অন্যায় কাজ যুক্ত আছে। এখানে কর্ম উপযোগবাদী বলবেন ‘ক’ নামক কাজ ঠিক ও ‘খ’ ঠিক নয়। বাটলার এবং রস-এর মতে, ‘খ’ নামক কাজই সঠিক বা অন্ততপক্ষে সঠিক হতে পারে এবং ‘ক’ নামক কাজ ঠিক নয়। সুতরাং কর্ম উপযোগবাদ অবশ্যই বর্জন করতে হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে যদি সর্বাধিক সাধারণ মঙ্গল সাধিত নাও হয় তথাপি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার নিয়ম বা মিথ্যা না বলার নিয়ম অবশ্যই মানতে হবে। 

বলা যেতে পারে যদিও এই যুক্তি কর্ম উপযোগবাদকে অপ্রমাণ করে না, কিন্তু ফ্র্যাঙ্কেনার মত থেকে একথা স্পষ্ট যে, কর্ম উপযোগবাদ নৈতিক দিক থেকে সন্তোষজনক নয়।

দ্বিতীয়ত: ইউয়িং-এর মতে কর্ম উপযোগবাদকে সঠিকভাবে মানলে এমন অনেক প্রবঞ্চনা, অসত্য ভাষণ, অন্যায় কাজ ইত্যাদিকে সমর্থন করতে হয় যা কোনো সৎ ব্যক্তি করতে পারেন না। কাজেই আমাদের সাধারণ বুদ্ধির কাছে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

৮। নীতি উপযোগবাদের বিরুদ্ধে সমালোচনাগুলি কী কী

নীতি উপযোগবাদ

নীতি উপযোগবাদের বিভিন্ন প্রকার আছে। প্রকারগুলি হল- আদি নীতি উপযোগবাদ, বাস্তব নীতি উপযোগবাদ, ও আদর্শ নীতি উপযোগবাদ। নীতি উপযোগবাদের প্রকারগুলির কোনোটিই ত্রুটিমুক্ত নয়।

(1) নীতি উপযোগবাদের সমালোচনা 

  • প্রথমত: নীতি উপযোগবাদের অন্তর্গত আদি নীতি উপযোগবাদ আসলে সাধারণ উপযোগবাদের একটি ভিন্ন প্রকার হওয়ায় সাধারণ উপযোগবাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তিগুলি এর বিরুদ্ধেও ওঠে।
  • দ্বিতীয়ত: বাস্তব নীতি উপযোগবাদও ত্রুটিমুক্ত নয়, কেন-না, বাস্তব নীতি উপযোগবাদে যেসব চলতি নৈতিক নিয়মের উল্লেখ করা হয় সেগুলি সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণ উৎপাদনের সহায়ক কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। তাছাড়া সমাজে প্রচলিত এই নৈতিক নিয়মগুলি চিরস্থায়ী নয়, কালের গতিতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো পরিবর্তিত হয় এবং ভিন্ন ভিন্ন সমাজে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যাত হয়। অর্থাৎ নিয়মগুলো স্পষ্টার্থক নয়। এই জন্য অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্কেনা বাস্তব নীতি উপযোগবাদকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন না।

তৃতীয়ত: আদর্শ নীতি উপযোগবাদও ত্রুটিহীন নয়। এর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হল এখানে সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণের কথা বলা হয়। উপযোগবাদে কেবল সর্বাধিক কল্যাণের কথাই বলা হয় না, ওই কল্যাণের ব্যাপ্তি বা বিস্তারেরও উল্লেখ থাকে। সমস্ত উপযোগবাদেই বলা হয়- সর্বাধিক কল্যাণ যেন জনসংখ্যার অধিকাংশের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হতে পারে। স্পষ্টতই উপযোগিতা দুটি ভিন্ন নীতিতে বিশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে। যথা – অকল্যাণ অপেক্ষা বেশি কল্যাণ উৎপন্ন করা। যতটা সম্ভব ব্যাপকভাবে ওই কল্যাণ বিতরণ করা। প্রথম নীতিটি উপযোগনীতি অনুসরণ করলেও দ্বিতীয় নীতিটি ন্যায়নীতি অনুসরণ করে। যেমন- কোনো কিছু বহুজনের মধ্যে বিতরণ করা- এটি উপযোগনীতির পরিবর্তে ন্যায়নীতি অনুসরণ করে। কাজেই আপত্তি হল- কোনো উপযোগবাদই বিশুদ্ধ নয়, তারা প্রত্যেকে উপযোগিতা ও ন্যায়বিচারের সংমিশ্রণ। ফ্র্যাঙ্কেনার মতে, উপযোগিতার সঙ্গে ন্যায়বিচারের উল্লেখ করে উপযোগবাদীরা শুদ্ধ উপযোগবাদকে বাতিল করেছেন।

আরও পড়ুন – মধ্যযুগীয় ভারতের শিক্ষা প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment