আমাদের দেশে বয়ঃসন্ধিক্ষণের সূচনা হয় কিশোরদের ক্ষেত্রে 13-14 বছর বয়সে বীর্যোৎপাদনের মধ্য দিয়ে এবং কিশোরীদের ক্ষেত্রে 12-13 বছর বয়সে রজঃস্বলা হওয়ার সময় থেকে। মানবজীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরটিকে বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কোনো কোনো মনোবিদ বয়ঃসন্ধির এই সময়কে ‘যৌন পরিণতির স্তর’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার কোনো কোনো মনোবিদ একে ‘বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্তর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালের বিকাশগত বৈশিষ্ট্য

কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকাল [Adolescence]
আমাদের দেশে বয়ঃসন্ধিক্ষণের সূচনা হয় কিশোরদের ক্ষেত্রে 13-14 বছর বয়সে বীর্যোৎপাদনের মধ্য দিয়ে এবং কিশোরীদের ক্ষেত্রে 12-13 বছর বয়সে রজঃস্বলা হওয়ার সময় থেকে। মানবজীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরটিকে বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কোনো কোনো মনোবিদ বয়ঃসন্ধির এই সময়কে ‘যৌন পরিণতির স্তর’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার কোনো কোনো মনোবিদ একে ‘বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্তর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
- সমাজসেবিকা ডরোথি রজার্স (Dorothy Rogers)-এর মতে, বয়ঃসন্ধিকাল হল জীবনের এমন একটি সময় যখন সমাজ ব্যক্তিকে শিশু হিসেবেও বিবেচনা করে না, আবার প্রাপ্তবয়স্কের মর্যাদাও দেয় না (Adolescence, thus viewed as a socio-cultural phenomenon, is the period in his life when society ceases to regard a person as a child but does not yet accord him full adult’s status, role and function)।
- মনোবিদ এ টি জারশিল্ড (AT Jersild)-এর মতে, বয়ঃসন্ধিকাল হল এমন একটি বয়ঃস্তর যে সময়ে ছেলেমেয়েরা দৈহিক, মানসিক, বৌদ্ধিক, প্রাক্ষোভিক ও সামাজিক দিক থেকে শৈশব পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্কতার পথে এগিয়ে চলে।
- এই পর্যায়ের দৈহিক, মানসিক ও প্রাক্ষোভিক পরিবর্তনগুলি যেহেতু ছেলেমেয়েদের জীবনে নানান সমস্যা সৃষ্টি করে, তাই মনোবিদ ও শিক্ষাবিদ জি স্ট্যানলি হল্ (G Stanley Hall) কৈশোরকে ‘ঝড়ঝঞ্ঝার ও উৎকণ্ঠার কাল’ বলে অভিহিত করেছেন।
- মনোবিদ থর্নডাইক (Thorndike) এবং কিন্সে (Kinsey) বয়ঃসন্ধির এই পর্যায়কে ‘ক্রমবিকাশমূলক স্তর’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
বাল্য ও পূর্ণবয়স্কতার মধ্যবর্তী সময়কাল হল কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকাল। জীবনবিকাশের এই পর্যায়ে ছেলেমেয়েরা বাল্যাবস্থা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক স্তরের দিকে অগ্রসর হয়। এই পর্যায়ে তাদের দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, প্রাক্ষোভিক প্রভৃতি বিভিন্ন দিকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে যার সঙ্গে তারা সহজে মানিয়ে নিতে পারে না। ফলে তাদের জীবনে যেন ঝড় বয়ে যায়। কৈশোরের বিভিন্ন ধরনের সমস্যাগুলি সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হল।
(1) আচরণের পরিবর্তন ও মানসিক দ্বন্দ্ব:
বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের দেহমনে কতকগুলি আকস্মিক এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। হঠাৎ এই ধরনের পরিবর্তনের ফলে তাদের সামগ্রিক আচরণ বদলে যায়। এই বয়সে ছেলেমেয়েদের মধ্যে যৌন চেতনা দেখা দেয়। এর আকস্মিকতা এবং সামাজিক সমর্থনের অভাবে কিশোর-কিশোরীরা তাদের যৌন চেতনাকে অবদমন করতে বাধ্য হয়। ফলে তাদের মধ্যে নানা ধরনের মানসিক পীড়া দেখা দেয়। যৌনতা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার ফলে মানসিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। মনে পাপবোধ জন্মানোর ফলে তারা খানিকটা দিশেহারা হয়ে পড়ে।
(2) বয়স্কদের সমর্থনহীনতা:
এই স্তরের আর-এক সমস্যা হল নতুন পরিস্থিতিতে অভিযোজনের সমস্যা। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা বুদ্ধি, চিন্তা, বিচার-বিবেচনাতে বয়স্কদের সমকক্ষ হয়ে ওঠে। তারা বয়স্কদের ভূমিকা পালন করতে চায়। কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাসের প্রতিবাদ করতে চায়। কিন্তু বয়স্করা তা সমর্থন করেন না। তাঁরা কিশোরদের এই আচরণকে ‘জ্যাঠামো’, ‘এঁচোড়ে পাকামো’ বলে মন্তব্য করেন। আবার এদের বালকোচিত আচরণও তাঁরা সমর্থন করেন না, কিশোরদের কাছ থেকে দায়িত্বপূর্ণ আচরণ প্রত্যাশা করেন। এর ফলে কিশোররা তাদের অবস্থান সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারে না।
কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালের বিকাশগত বৈশিষ্ট্য
বয়ঃসন্ধিকালের বিকাশগত বৈশিষ্ট্যগুলি প্রধানত চারটি বিভাগে আলোচনা করা হয়। এই চারটি বিভাগ হল- দৈহিক বিকাশ, মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ, সামাজিক বিকাশ এবং প্রাক্ষোভিক বিকাশ। নীচে প্রতিটি বিভাগ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।
(1) দৈহিক বিকাশ :
বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে, মেয়ে উভয়ের মধ্যেই ব্যাপক দৈহিক পরিবর্তন দেখা দেয়। লিঙ্গভেদে এই পরিবর্তনের রকমফের ঘটে। বয়ঃসন্ধিকালে দৈহিক বিকাশের বিভিন্ন দিকগুলি হল-
- উচ্চতা ও ওজন বৃদ্ধি: এই সময়ে ছেলে ও মেয়েদের দেহের উচ্চতা ও ওজন বৃদ্ধি পায়। লিঙ্গভেদে এই ওজন ও উচ্চতা বৃদ্ধিতে পার্থক্য দেখা যায়। 13 বছরের বালিকাদের উচ্চতা ও ওজন বালকদের থেকে বেশি হয়। আবার 15 বছর বয়সে বালকেরা বালিকাদের থেকে এগিয়ে থাকে।
- দেহের বিভিন্ন অংশের পরিবর্তন: দেহের বিভিন্ন অংশের আনুপাতিক বৃদ্ধি ও হাড়ের পরিবর্তন ঘটে। কিশোরীদের পেলভিস হাড় চওড়া হয় এবং হাতের কবজি গোলাকার হয়। বক্ষ স্ফীত হয়, হাত ও পায়ের বৃদ্ধি হয় এবং তা সুঠাম হয়। কিশোরদের ক্ষেত্রে কাঁধের হাড় চওড়া হয়। মুখমণ্ডলে একটা কাঠিন্যভাব ফুটে ওঠে এবং পেশিসমূহ শক্তিশালী হয়।
- কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন: গলার স্বরের পরিবর্তন দেখা যায়। কিশোরদের গলার স্বর কর্কশ হয়। কিশোরীদের গলার স্বর মিষ্টি হয়।
- যৌন পরিবর্তন: যৌনাঙ্গের পরিবর্তন ঘটে। কিশোরদের ক্ষেত্রে লিঙ্গ বড়ো হয় এবং বীর্যোৎপাদন ঘটে। যৌনাঙ্গ পরিণত হলে কিশোরীরা রজঃস্বলা হয়।
- সঞ্চালনগত পরিবর্তন: অস্থি ও পেশি সুগঠিত হওয়ার ফলে সঞ্চালন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে কিশোরেরা এগিয়ে থাকে।
(2) মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ:
লিঙ্গগতভাবে বয়ঃসন্ধিক্ষণের ছেলেমেয়েদের মধ্যে মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশে পার্থক্য থাকে না। বয়ঃসন্ধিক্ষণে বৌদ্ধিক ও মানসিক বিকাশের বিভিন্ন দিকগুলি হল-
- বিমূর্ত চিন্তনের বিকাশ ঘটে।
- স্বাধীনভাবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়।
- যুক্তি ও বিচার ক্ষমতার বিকাশ ঘটে।
- স্মৃতি ও কল্পনা শক্তির বিকাশ ঘটে।
- নৈতিকতার বিকাশ ঘটে।
(3) সামাজিক বিকাশ:
বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক চেতনার বিকাশ ঘটে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-
- এই বয়সের বালক-বালিকারা নিজেদের পরিণত বলে মনে করে এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের ভূমিকা পালন করতে চায়। পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তারা অংশগ্রহণ করতে চায়।
- আগ্রহ বিশেষদিকে রূপ পাওয়ার ফলে বন্ধুসংখ্যা সীমিত হয়, কিন্তু বন্ধুত্বের গভীরতা বৃদ্ধি পায়।
- তারা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে।
- বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করতে চায়। নিজ স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যের জন্য কিছু করতে চায়।
(4) প্রাক্ষোভিক বিকাশ :
বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের প্রাক্ষোভিক বিকাশের বিভিন্ন দিকগুলি হল-
- এই বয়সের ছেলেমেয়েরা বড়োদের মতো দায়িত্ব পালন করতে চায়। বড়োরা কিন্তু এ ব্যাপারে অনেক সময় সহযোগিতা করে না, ফলে ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা দেখা যায়।
- এই বয়সের ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তিত হয়।
- প্রেম, ভালোবাসার মতো মানসিক অনুভূতি তীব্রভাবে দেখা দেয় ও তারা অত্যন্ত অনুভূতিশীল হয়।
- নৈতিক বিকাশ ঘটে, তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিবাদ করে।
- দুঃসাহসিক কাজে লিপ্ত হয়।
বয়ঃসন্ধিক্ষণের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিভিন্ন দিকের বিকাশ শৈশবের মতো পর্যায়ক্রমিকভাবে ঘটে না, ব্যাপক মাত্রায় পরিবর্তন দেখা যায়। ছেলেমেয়েরা এই বিষয়ে সচেতন থাকে না, ফলে তাদের মধ্যে অদ্ভুত আচরণ দেখা যায়।
কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালের চাহিদা
জি স্ট্যানলি হল্ (G Stanley Hall), জারশিল্ড (Jersild), বার্নার্ড (Bernard) প্রমুখ মনোবিজ্ঞানী বয়ঃসন্ধিকালের ওপর গবেষণা করেছেন এবং এই বয়সি ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার চাহিদার কথা উল্লেখ করেছেন-
- স্বাধীনতার চাহিদা: বয়ঃসন্ধির আগে পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা সব বিষয়েই পরনির্ভরশীল থাকে। বয়ঃসন্ধিতে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে এবং মতামত প্রকাশ করতে চায়।
- আত্মপ্রকাশের চাহিদা: তারা বিভিন্ন সৃষ্টিমূলক কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে চায় এবং বয়স্কদের সমর্থন চায়।
- দুঃসাহসিকতার চাহিদা: তারা বিভিন্ন ধরনের অ্যাডভেঞ্চারমূলক বা দুঃসাহসিক কাজ করতে চায়, তবে অনেক সময়ই এই দুঃসাহস হঠকারিতায় পরিণত হয়।
- আত্মনির্ভরতার চাহিদা: এই বয়সের ছেলেমেয়েরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়।
- নিরাপত্তার চাহিদা: বিভিন্ন দিকে হঠাৎ করে ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে তাদের মধ্যে সংশয় দেখা দেয়। তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। সেজন্য নিরাপত্তার চাহিদা এই বয়সের চিরকালীন চাহিদা।
- নৈতিক চাহিদা: এই বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ন্যায়-অন্যায়বোধ তীব্র আকার নেয়। নৈতিকতার অভাব দেখলে তারা প্রতিবাদ করে।
- গণতান্ত্রিক চাহিদা: এই বয়সের ছেলেমেয়েরা গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় তাদের দায়িত্ব-অধিকার সম্পর্কে অবহিত হতে চায়। আদর্শ নাগরিক হিসেবে কাজ ক’রে সমাজ ও দেশের উন্নয়নে অংশ নিতে চায়।
- যৌন চাহিদা: যৌন বিকাশের ফলে তাদের মধ্যে যৌন চাহিদা দেখা যায়। তারা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। যৌনতা সম্পর্কীয় বিভিন্ন তথ্যের প্রতি তাদের কৌতূহল দেখা যায়।
- জীবনদর্শনের চাহিদা: মানবজীবনের লক্ষ্য কী এবং কেন, সৎভাবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছোনোর রাস্তা কী ইত্যাদি সম্পর্কে এই বয়সের ছেলেমেয়েরা জানতে চায়। একেই জীবনদর্শনের চাহিদা বলে।
উপরিউক্ত চাহিদাগুলিকে বাস্তব ও মনোবিজ্ঞানসম্মতভাবে পূরণ করতে হবে। এ ব্যাপারে বয়স্কদের বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। না হলে, চাহিদাগুলি পূরণ না হওয়ার কারণে বয়ঃসন্ধিক্ষণের ছেলেমেয়েদের মধ্যে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কৈশোরের চাহিদাপূরণে পিতা-মাতা ও শিক্ষক-শিক্ষিকার ভূমিকা
জীবনবিকাশের স্তরগুলির মধ্যে কৈশোর অত্যন্ত সংকটপূর্ণ কাল। এইসময় উপযুক্ত পরিচালনার মাধ্যমে একজন কিশোর বা কিশোরীকে যেমন সুস্থ, সবল, উৎপাদনশীল নাগরিকে পরিণত করা যায়, তেমনই সুপরিচালনা এবং নির্দেশনার অভাবে ‘বখে যাওয়া’ অকর্মণ্য কিশোর-কিশোরী সমাজের বোঝা হয়ে উঠতে পারে। তাই পিতা-মাতা, শিক্ষক ও অভিভাবককে যথেষ্ট সহানুভূতি এবং সতর্কতার সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের পরিচালনার ভার নিতে হবে।
কৈশোরে প্রকৃতিগতভাবেই কতকগুলি চাহিদা দেখা দেয়। এই চাহিদাগুলি যদি যথাযথভাবে পূরণ করা না হয়, সেক্ষেত্রে তাদের মধ্যে নানান সমস্যা, বিভিন্ন ধরনের মানসিক জটিলতা, অন্তর্দ্বন্দ্ব, উৎকণ্ঠা প্রভৃতি দেখা যায়। স্বাভাবিক উপায়ে নিজেদের তৃপ্ত করতে না পেরে অনেক সময় তারা অস্বাভাবিক উপায় অবলম্বন করে। অনেক সময় তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয়, আবার অনেক সময় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। কৈশোরের ছেলেমেয়েদের এই জটিল অবস্থা থেকে মুক্ত করতে হলে পিতা-মাতা ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কিছু বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। এইগুলি হল-
(1) পরিবর্তন সম্বন্ধে সচেতন করা:
প্রথমেই যেটা প্রয়োজন তা হল, বিদ্যালয়ের নির্দেশনা বিভাগ কিশোর-কিশোরীদের তাদের বিভিন্ন পরিবর্তন সম্বন্ধে সচেতন করবে, তাদের বোঝাবে যে এই পরিবর্তন স্বাভাবিক, সকলের জীবনেই ঘটে। কীভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন করতে হবে, সে সম্পর্কে তাদের পরামর্শ দেওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। পিতা-মাতাকেও এ বিষয়ে তৎপর হতে হবে।
(2) যথাযথ চাহিদা পূরণ করা:
গৃহে অভিভাবকদের এবং বাইরে বিদ্যালয়ের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের চাহিদা পূরণ করতে হবে এবং এই বয়সের বিশেষ ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে। এই সময়পর্বের চাহিদাগুলি হল-
- খাদ্যের চাহিদা: কিশোর-কিশোরীদের দৈহিক পরিবর্তনগুলি খুব সহজভাবে গ্রহণ করতে হবে। তাদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য ও নিয়মিত শারীরিক অনুশীলনের ব্যবস্থা করতে হবে।
- যৌন চাহিদা: যৌন চাহিদার সমাজ-অনুমোদিত সুষ্ঠু বহিঃপ্রকাশের জন্য বিদ্যালয়ে ছবি আঁকা, অভিনয়, নাচ-গান, সাহিত্য রচনা প্রভৃতির ব্যবস্থা করতে হবে। যৌন কৌতূহল পরিতৃপ্তির জন্য পাঠক্রমে যৌন শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- স্বাধীনতা ও আত্মপ্রকাশের চাহিদা: কিশোর-কিশোরীদের স্বাধীনতাবোধ ও আত্মপ্রকাশের চাহিদা মেটানোর জন্য তাদের বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। বনভোজন, ভ্রমণ, নাটক, অভিনয়, বিতর্কসভা সংগঠন ইত্যাদি কাজে তাদের উৎসাহিত করতে হবে।
- জীবনদর্শনের চাহিদা: জীবনদর্শনের চাহিদাপূরণের জন্য তাদের সামনে মহাপুরুষদের জীবনী তুলে ধরতে হবে। বহু কষ্ট স্বীকার করেও তাঁরা যে তাঁদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি, সেদিকে কিশোর-কিশোরীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে।
- যথাযথ পাঠক্রমের চাহিদা: এই স্তরের ছেলেমেয়েরা যাতে তাদের আগ্রহ ও সামর্থ্য অনুযায়ী পাঠক্রমের সুবিধালাভের সুযোগ পায় সেজন্য বহুমুখী পাঠক্রমের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
- নৈতিক চাহিদা: কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে নৈতিক চাহিদা প্রবল হয়। তাদের নীতিবোধকে উৎসাহ দিতে শিক্ষকশিক্ষিকা এবং পিতা-মাতাকে নিজেদের জীবনে ন্যায়নিষ্ঠ হতে হবে।
- জ্ঞানার্জনের চাহিদা: নতুন জ্ঞানার্জনের চাহিদাপূরণের জন্য বিদ্যালয়ে উপযুক্ত পাঠাগারের ব্যবস্থা করতে হবে। তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, বিতর্কসভা, কুইজ ইত্যাদির আয়োজন করতে হবে এবং তাতে সমস্ত ছেলেমেয়েকে অংশগ্রহণে উৎসাহ দিতে হবে।
- সামাজিক চাহিদা: সামাজিক চাহিদাপূরণের জন্য কিশোর-কিশোরীদের বিদ্যালয়ের এবং পরিবারের বিভিন্ন কাজে যুক্ত করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের সমাজসেবামূলক কাজ যেমন, সাক্ষরতা অভিযান, বন্যাত্রাণ, রক্তদান প্রভৃতি কাজে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে।
প্রাণশক্তিতে ভরপুর কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের বিকাশ ঘটাতে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার পথকে সুগম করতে শিক্ষক ও অভিভাবককে উপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বনে সচেষ্ট হতে হবে। জীবনের এই স্তরটি খুবই স্পর্শকাতর। শিক্ষক, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যালয়, পরিবার সবাইকে খুবই সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টি রেখে বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরীদের পরিচালনা করতে হয়। কোনো তরফে কোনো ত্রুটি ঘটলে এদের বিপথগামীতার সম্ভাবনা তুঙ্গে উঠবে এবং তার দ্বারা গোটা সমাজ বিপন্ন হবে।
আরও পড়ুন | Link |
নৈতিক প্রত্যয়সমূহ প্রশ্ন উত্তর | Click Here |
চার্বাক সুখবাদ প্রশ্ন উত্তর | Click Here |
পাশ্চাত্য নীতিবিদ্যা প্রশ্ন উত্তর | Click Here |