রাজা রামমোহন রায়ের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার আলোচনা করো | Education and Social Reforms of Raja Rammohan Roy

রাজা রামমোহন রায়ের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার – অষ্টাদশ শতাব্দীর হৃতসর্বস্বতা এবং মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা সেই সময়ের বাংলার সমাজজীবনকে এক অবর্ণনীয় দুরবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। যুক্তির বদলে অন্ধবিশ্বাস, সামাজিক রক্ষণশীলতা, জাতপাতের ভিত্তিতে নানা অবিচার ও অত্যাচার, রক্ষণশীলতার ফলে নারীস্বাধীনতার সম্পূর্ণ বিলোপ, গঙ্গাবক্ষে শিশু বিসর্জন, সতীদাহ প্রভৃতি সবই ছিল মধ্যযুগীয় সংকীর্ণতার চিহ্ন। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা থেকে আলোয় উত্তরণের লক্ষ্যে বাংলায় নবজাগরণের যে সূচনা হয়, তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কয়েকজন প্রতিভাশালী ব্যক্তি। এঁদের মধ্যে উজ্জ্বলতম হলেন রাজা রামমোহন রায়। সেই সময়কার সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে রামমোহনের ভূমিকা আলোচনার মাধ্যমে নবজাগরণে রামমোহনের অবদান সম্পর্কে সম্যকভাবে জানা যায়।

রাজা রামমোহন রায়ের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার

রাজা রামমোহন রায়ের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার আলোচনা করো
রাজা রামমোহন রায়ের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার আলোচনা করো

রাজা রামমোহন রায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী

আধুনিক ভারতবর্ষের জনক বলে খ্যাত রামমোহন 1772 খ্রিস্টাব্দে হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে রক্ষণশীল ও সম্পন্ন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পনেরো বছর বয়সের আগেই তিনি সংস্কৃত, পারসি ও আরবি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। কোরান এবং সুফি দর্শন অধ্যয়ন করার ফলে হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হন। এই নিয়ে পিতার সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়ায় গৃহত্যাগ করে চার বছর তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। এই সময় তিনি বিভিন্ন ধর্ম এবং তার আনুষঙ্গিক সামাজিক ক্রিয়াকলাপগুলি সম্পর্কে সম্যকভাবে জ্ঞান লাভ করেন। 1803 খ্রিস্টাব্দে তাঁর পিতার মৃত্যু হয় এবং তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন।

1804 খ্রিস্টাব্দে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে কর্মচারী হিসেবে যোগদান করেন। নিষ্ঠা ও অধ্যাবসায়ের ফলে অচিরেই তিনি কোম্পানিতে ভারতীয়দের জন্য সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ দেওয়ান পদে উন্নীত হন। 1814 খ্রিস্টাব্দে তিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে দেশ ও দশের কাজে নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করেন এবং আমৃত্যু (1833 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) তিনি জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তিনি ছিলেন পৌত্তলিকতা বিরোধী নিরাকার ব্রহ্মের উপাসক। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং সভা-সমিতি গঠনের মাধ্যমে তিনি সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।

রাজা রামমোহন রায়ের অবদা

রাজা রামমোহন রায়ের কার্যাবলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করে পর্যালোচনা করা যায়- শিক্ষার বিস্তার ও শিক্ষাসংস্কার এবং সামাজিক, ধর্মীয় ও প্রশাসনিক সংস্কার।

(1) শিক্ষার বিস্তার ও শিক্ষাসংস্কার: 

ভারতবর্ষে শিক্ষার বিস্তার ও সংস্কারে রামমোহন রায়ের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রামমোহনের শিক্ষাসংস্কারের বিভিন্ন দিকগুলি হল-

  1. প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সমন্বয়: রাজা রামমোহন রায় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন সনাতন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা এবং পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা কোনোটিকেই পরিত্যাগ করা যাবে না। তিনি দেখেছিলেন যে, প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষার মধ্যে যে উচ্চমূল্যবোধগুলি রয়েছে, সেগুলিকে অস্বীকার করা যায় না বা তার প্রাসঙ্গিকতাকে উপেক্ষা করা যায় না। অথচ, অন্ধ কুসংস্কার ও ধর্মীর মতান্ধতার জাল এটাকে জড়িয়ে আছে। আবার পাশ্চাত্য শিক্ষায় যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানের উপর যে গুরুত্ব দান করা হয়েছে, তার তাৎপর্যও অপরিসীম। তিনি বুঝেছিলেন যে, ভারতের সনাতনী শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে হবে। পাশ্চাত্যের উৎকৃষ্ট উপাদানগুলিকে আত্মীকরণ করে প্রাচ্যশিক্ষার সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণই ছিল তাঁর লক্ষ্য। একদিকে যেমন তিনি হিন্দু কলেজ স্থাপনে সর্বতোভাবে এগিয়ে এসে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরাগ প্রদর্শন করেছিলেন; অন্যদিকে তেমন বেদান্ত কলেজ স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রাচ্য শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এইভাবে রামমোহন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার মধ্যে সমন্বয়সাধনের চেষ্টা করেছেন। তিনি অন্ধ অনুকরণ ও অন্ধ বর্জন উভয় পথকেই পরিহার করেছেন।
  2. ইংরেজি ভাষার চর্চা ও প্রসার: ইংরেজি ভাষার চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষাসংস্কার তথা ভারতের সনাতনী শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টায় রামমোহনের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি যথার্থই বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিজ্ঞানশিক্ষা ছাড়া ভারতবর্ষ কেন, কোনো দেশেরই অগ্রগতি সম্ভব নয়। আর সেই যুগে পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার জন্য ইংরেজি ভাষার সঙ্গে পরিচয় ছিল অপরিহার্য। তাই 1823 খ্রিস্টাব্দে রামমোহন লর্ড আমহার্স্টের কাছে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্য চেয়েছিলেন এবং সংস্কৃত কলেজ স্থাপনের বিরোধিতা করেছিলেন।হিন্দু ছেলেদের ইংরেজি শিক্ষার জন্য রামমোহন মুদি পাড়ায় একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন, 1822 খ্রিস্টাব্দে সেটি ‘অ্যাংলো হিন্দু স্কুল’ নামে পরিচিত হয়। এই বিদ্যালয়ে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্য পড়ানো হত। তিনি বেদান্ত দর্শন, পাশ্চাত্য দর্শন এবং বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার জন্য 1826 খ্রিস্টাব্দে বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোগী। কলেজের কর্মসমিতিতে তাঁর নাম থাকা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে তিনি নিজেই তাঁর নাম তুলে নেন। কিন্তু নানাভাবে তিনি এই কলেজের কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত থাকেন। শ্রীরামপুর মিশন, স্কটিশ মিশন ও অন্যান্য ইংরেজি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে তিনি আন্তরিক সহযোগিতা করেছেন।
  3. দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি পাশ্চাত্যের মনোযোগ আকর্ষণ: রাজা রামমোহনই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি ব্রিটিশ তথা ইউরোপীয় ব্যক্তিদের কাছে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির গভীরতা ও প্রসারতা সম্পর্কে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছিলেন। বেদ-বেদান্তের ভাষা, উপনিষদের ইংরেজি অনুবাদ ও অন্যান্য ইংরেজি পুস্তক প্রকাশ করে তিনিই ভারতের ঐতিহ্যের প্রতি ব্রিটিশ জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই জন্যই রাজা রামমোহন রায়কে ব্রিটেনে ভারতের প্রথম সাংস্কৃতিক দূত বলা হয়। ভারতীয় দর্শন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং এর প্রাসঙ্গিকতাকে এমন আকর্ষণীয়ভাবে তিনি পাশ্চাত্যের শিক্ষাবিদদের কাছে তুলে ধরেছিলেন যে, 1854 খ্রিস্টাব্দে উডের ডেসপ্যাচের খসড়ায় প্রাচ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত হয়।
  4. বাংলা সাহিত্যের উন্নয়ন: রামমোহনই ছিলেন আধুনিক বাংলা গদ্যসাহিত্যের জনক। সংস্কৃত প্রভাবিত বাংলা সাহিত্যকে সকলের বোধগম্য করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। 1815 থেকে 1830 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি প্রায় তিরিশটি গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-বেদ-বেদান্ত ও উপনিষদের অনুবাদ, কুসংস্কারের প্রতিবাদে লেখা বিভিন্ন রচনা, ব্রাহ্মসংগীত, গৌড়ীয় ব্যাকরণ ইত্যাদি। এ ছাড়াও তিনি ব্যাকরণ, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা এবং জ্যামিতির ওপর বাংলা গ্রন্থ রচনা করেন। বাংলা ও ইংরেজি ভাষার পাংচুয়েশন ও ন্যারেশনের ওপরও তিনি কাজ করেছেন। তৎকালীন বাংলাদেশে ফারসি ও বর্তমান রাষ্ট্রভাষা হিন্দির বিকাশের ক্ষেত্রেও তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল।
  5. পত্রপত্রিকা ও সংবাদপত্র প্রকাশনা: সেই সময়ে সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমের উপযুক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে রামমোহনের খ্যাতি ছিল অপরিসীম। তিনি ব্যক্তিগতভাবে দুটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এগুলি হল- 1821 খ্রিস্টাব্দের 4 ডিসেম্বর থেকে প্রকাশিত সম্বাদ কৌমুদী (বাংলা ভাষায়) এবং 1822 খ্রিস্টাব্দের 12 এপ্রিল থেকে প্রকাশিত মিরাৎ-উল-আখবার (ফারসি ভাষায়)। 1829 খ্রিস্টাব্দে তিনি রবার্ট মার্টিন, দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রভৃতি কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে Bengal Herald নামে একটি ইংরেজি পত্রিকাও প্রকাশ করেন। পত্রিকা প্রকাশ ছাড়াও নিজস্ব মতামত প্রকাশের জন্য নিয়মিত ছোটো ছোটো পুস্তিকা এবং প্রবন্ধ প্রকাশ করতেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যও তিনি সংগ্রাম করেছিলেন। 1823 খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার অর্ডিনান্স জারি করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকোচন করলে এর বিরুদ্ধে তিনি সুপ্রিমকোর্ট ও পরে প্রিভি কাউন্সিলে আবেদন জানান।
  6. নারীশিক্ষার প্রসার: শিক্ষাক্ষেত্রে রামমোহনের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল নারীশিক্ষার প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ। নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। অজস্র প্রবন্ধে তিনি লিখে দেখান যে, প্রাচীন ভারতে নারীশিক্ষার প্রচলনই শুধু ছিল না, বরং সমাজে নারীরা কত মর্যাদাপূর্ণ আসন লাভকরেছিলেন। তাঁর লেখা থেকে জানা যায় বৌদ্ধধর্মের প্রসার, কৌলীন্যপ্রথার প্রসার এবং মুসলিম শাসনকালে কীভাবে নানা ঘাতপ্রতিঘাতে নারীশিক্ষা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তিনি পুনরায় আধুনিক ভারতে নারীশিক্ষার প্রসারের ওপর জোর দেন। নারীশিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি বহু প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন এবং অন্যদেরও নারীশিক্ষার কেন্দ্র স্থাপনে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

(2) সামাজিক, ধর্মীয় ও প্রশাসনিক সংস্কার: রামমোহন রায় শুধু শিক্ষা সংস্কারকই নন, সামাজিক, ধর্মীয় ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও তাঁর সংস্কারগুলি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

  1. সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা: রামমোহন তৎকালীন হিন্দুসমাজে প্রচলিত নিষ্ঠুর সতীদাহপ্রথার প্রবল বিরোধী ছিলেন। আইন পাস করিয়ে এই প্রথা রদ করাতে তিনি বিশেষ উদ্যোগী হয়েছিলেন। তাঁরই সর্বতো সহযোগিতায় 1829 খ্রিস্টাব্দে লর্ড বেটিক সতীদাহপ্রথা রদ আইন প্রণয়ন করেন।
  2. নারীর অধিকার রক্ষা: সমাজে নারীর উপযুক্ত স্থান এবং সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের জন্য রামমোহন লড়াই করেছিলেন। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর কোনো সন্তান যদি একাধিক বিবাহ করেন, তাহলে তাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার কথা উইলে উল্লেখ করেছিলেন। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ তাঁর নাতনিকে তিনি 16 বছর বয়সে বিবাহ দিয়েছিলেন। নারীদের কোনোরকম মর্যাদাহানির বিরুদ্ধে তিনি আজীবন প্রতিবাদ করে গেছেন। সংক্ষেপে বলা যায় যে, সেই সময়ে ভারতে নারীর সমানাধিকার এবং নারীমুক্তির আন্দোলনের সূচনা তিনি করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়।
  3. ধর্মীয় সংস্কার: তিনি বড়ো মাপের ধর্মীয় সংস্কারক ছিলেন। নিজে একজন ধর্মীয় বিশ্লেষক হওয়ায় তিনি সব ধর্মের মধ্যে যে অনেক সাদৃশ্য আছে তা উপলখি করেছিলেন। তিনি হিন্দুসমাজে মূর্তি পূজার বিরোধী ছিলেন। হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতার চেয়ে তাঁর কাছে নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা অনেক বেশি শ্রেয় বলে মনে হয়েছিল। তাঁর এই উপলব্ধি তাঁকে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
  4. প্রশাসনিক সংস্কার: রামমোহন ছিলেন আধুনিক ভারতের জাতীয় চেতনার পথিকৃৎ। তিনিই প্রথম শিক্ষিত, সাংস্কৃতিক চেতনাসমৃদ্ধ স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সেই সময়কার প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে কিছু সংস্কার আনতে চেষ্টা করেছিলেন। আদালতে ইংরেজির প্রচলন, জুরিদের দ্বারা বিচার, প্রশাসনের সঙ্গে বিচারব্যবস্থার পৃথকীকরণ, ফৌজদারি ও অন্যান্য আইন বিধিবদ্ধকরণ প্রভৃতির ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। রায়তদের স্বার্থে ভূমি সংস্কারের কথা বলেন। জমিদারদের অত্যাচার এবং চাষিদের দুর্দশার বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন।

রামমোহন রায়ের কার্যাবলির মূল্যায়ল

(1) অন্ধকারে আলোর দীপ্তি: 

উনবিংশ শতাব্দীর অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলির মধ্যে রামমোহনের কার্যাবলি যে আলোর দীপ্তি এনে দেয় তাতে এক নতুন জীবনের সৃষ্টি হয়। প্রবল বিরোধিতা ও অসহযোগিতা সত্ত্বেও শিক্ষা, ধর্ম, সমাজ, প্রশাসনিক ব্যবস্থা সবক্ষেত্রে যে পচন ধরেছিল তার সংস্কারের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া রামমোহনের মতো ব্যক্তিত্বের পক্ষেই সম্ভব ছিল। তাঁর বুদ্ধি, ধৈর্য, পান্ডিত্য, একনিষ্ঠতা, সপ্রতিভতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে একার লড়াই-এগুলি সম্ভব হয়েছিল মানুষের প্রতি অগাধ আস্থা ও ভালোবাসার জন্যই। তিনি শিক্ষাকে কোনো মামুলি বিষয় হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন সুস্থ, সুন্দর মানুষ ও সমাজ গড়ার একটি অস্ত্র হিসেবে। কোনোরকম গোঁড়ামি বা কোনোরকম আবেগতাড়িত হয়ে শিক্ষাসংক্রান্ত ব্যাপারে কোনো অতিসরলীকৃত অবস্থান তিনি নেননি।

তিনি বুঝেছিলেন যে ভারতীয় সমাজ এবং পাশ্চাত্য সমাজ, উভয় সমাজেরই ভালোমন্দ উভয়দিকই আছে। উভয় সমাজের শুধু ভালো দিকটুকু আমাদের গ্রহণ করতে হবে; আর মন্দ দিকগুলিকে বর্জন করতে হবে। এই গ্রহণ ও বর্জনের পরে গৃহীত আদর্শগুলিকে সমন্বিত করে শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের কাছে তা পৌঁছে দিতে হবে। এটা করতে পারলে ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়েরই মঙ্গল। বলা বাহুল্য যে রামমোহন রায় আমরণ এই প্রয়াস চালিয়ে গেছেন।

(2) ভারতপথিক: 

রাজা রামমোহন রায়ের জীবন এবং কাজ ভারতীয় সমাজে প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা এবং সংস্কারের এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। তাঁর ধর্মীয়, সামাজিক এবং শিক্ষামূলক সংস্কারগুলি ভারতীয় সমাজকে আধুনিকীকরণের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই কারণেই তাঁকে ‘ভারত পথিক’ বা ‘আধুনিক ভারতের পথিক’ বলা হয়। তাঁর অবদান আজও সমাদৃত এবং তাঁর জীবন আমাদের সকলের জন্য একটি প্রেরণা।

(3) পশ্চিমি শিক্ষা ও আধুনিকতার প্রবর্তন: 

রাজা রামমোহন রায় পশ্চিমি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টার ফলে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ভারতের প্রথম আধুনিক কলেজগুলির মধ্যে অন্যতম। তিনি বিশ্বাস করতেন যে পশ্চিমি শিক্ষার মাধ্যমে ভারতের মানুষ, আধুনিক জ্ঞান এবং বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনা অর্জন করতে পারবে।

আরও পড়ুনLink
নৈতিক প্রত্যয়সমূহ প্রশ্ন উত্তরClick Here
চার্বাক সুখবাদ প্রশ্ন উত্তরClick Here
পাশ্চাত্য নীতিবিদ্যা প্রশ্ন উত্তরClick Here

Leave a Comment