মক্তব এবং মাদ্রাসার শিক্ষাদান পদ্ধতি | Teaching methods of Maktabs and Madrasas (Class 11 Exclusive Answer)

আলোচ্য পর্বে একাদশ শ্রেণির শিক্ষাবিজ্ঞান বিষয়ের দ্বিতীয় সেমিস্টারের মধ্যযুগীয় শিক্ষাব্যবস্থা অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে মক্তব এবং মাদ্রাসার শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হল-

মক্তব এবং মাদ্রাসার শিক্ষাদান পদ্ধতি

মক্তব এবং মাদ্রাসার শিক্ষাদান পদ্ধতি
মক্তব এবং মাদ্রাসার শিক্ষাদান পদ্ধতি

মক্তব এবং মাদ্রাসার শিক্ষাদান পদ্ধতি

(1) মক্তব

[i] মক্তবের শিক্ষাপদ্ধতি ছিল মৌখিক। পড়া মুখস্থ করানোই শিক্ষকের প্রধান কাজ ছিল। [ii] মক্তবে সাধারণত কোনো লিখিত বই অনুসরণ করা হত না। [iii] লেখার আগে পড়ার ব্যবস্থা ছিল। [iv] পাঠের সময় শুনেই শিক্ষার্থীরা শিখত। [v] হাতের লেখা ভালো করার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হত। [vi] শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল যান্ত্রিক। শিশুরা স্পষ্টভাবে কথা বলতে শিখলে, তাকে দিয়ে বার বার উচ্চারণ করিয়ে কোরানের কিছু পঙ্ক্তি মুখস্থ করানো হত। শিশুরা কোনো কিছু না বুঝে কেবল অনুকরণ করেই মুখস্থ করত। [vii] শিশুর বয়স সাত বছর হলে মক্তবে তাকে বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত করানো হত। [viii] লেখাপড়া শেখানোর পর শিশুদের স্বাধীনভাবে পড়া ও লেখারও সুযোগ দেওয়া হত।

(2) মাদ্রাসা

[i] মাদ্রাসার শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল মূলত মৌখিক। [ii] শিক্ষার মাধ্যম ছিল ফারসি ভাষা। [iii] শিক্ষকগণ শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বক্তৃতা পদ্ধতির প্রয়োগ করতেন। [iv] মুখস্থ ছিল শিখনের প্রধান পদ্ধতি। [v] তর্কবিদ্যা, দর্শন, ধর্ম প্রভৃতি বিষয়গুলির শিক্ষাদানের জন্য আলোচনাচক্রের ব্যবস্থা করা হত। এতে আত্মশিখনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের গভীরতা বৃদ্ধি পেত। [vi] উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ব্যাবহারিক বিষয়সমূহের শিক্ষাদানের জন্য হাতেকলমে কাজের ব্যবস্থা করা হত। [vii] চিকিৎসাবিদ্যা, শারীরতত্ত্ব, জ্যোতিষশাস্ত্র, গণিত প্রভৃতি বিষয়গুলির ক্ষেত্রে সক্রিয়তাভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হত।

(7) শৃঙ্খলা: 

[i] শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশ ইসলামীয় শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য ছিল। মক্তবে কঠোর শৃঙ্খলা মেনে চলা হত তাদের। [ii] স্কুল-পালানো এবং অপরাধপ্রবণ ছাত্রদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হত। দৈহিক শাস্তি কখনো-কখনো নির্দয়তার স্তরেও পৌঁছে যেত। [iii] মস্তবের মতো মাদ্রাসাতেও কঠোরভাবে শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা রক্ষা করা হত। ইসলামের নির্দেশানুযায়ী নির্দিষ্ট সময়-নির্ঘণ্ট মেনে নামাজ পড়া, পড়াশোনা করা, ধর্মীয় এবং সামাজিক কতর্ব্যপালনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হত। তবে কোনোরকম অনৈতিক আচরণ করলে কঠোর শাস্তি পেতে হত।

(8) শিক্ষার সুযোগ: 

[i] ইসলামি যুগে মক্তবের শিক্ষা সকলের জন্য হলেও মাদ্রাসার শিক্ষা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। [ii] উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র খুব কম সংখ্যক থাকায় উচ্চশিক্ষার নিদারুণ অভাব দেখা যায়। [iii] সার্বিকভাবে মধ্যযুগে হিন্দুদের শিক্ষার সুযোগ হ্রাস পায়। পাঠশালা, টোল, চতুষ্পাঠী থাকলেও সেগুলির অবস্থা একেবারেই ভালো ছিল না।

(9) নারীশিক্ষা: 

[i] ইসলামি অনুশাসনে নারীশিক্ষা অবৈধ ছিল না। তাই প্রথম দিকে ফাতিমা, হামিদা, সোফিয়ার মতো বিদুষী নারীর কথা শোনা যায়। [ii] পরে পর্দাপ্রথা চালু হওয়ায় সাধারণ নারীশিক্ষা সংকুচিত হলেও উচ্চবংশের মেয়েদের অন্দরমহলে শিক্ষার জন্য ‘উলেমা’ এবং চারুকলা শিক্ষার জন্য ‘ওস্তাদ’ নিয়োগ করা হত। [iii] রাজপরিবারের মহিলারা নিজেরা শিক্ষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন। রাজপরিবারের শিক্ষিত মহিলাদের মধ্যে সুলতানা রাজিয়া, বাবরকন্যা গুলবদন বেগম, শাহজাহান কন্যা জাহানারা বেগম প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। [iv] মধ্যযুগে হিন্দুনারীদের শিক্ষা যথেষ্ট বাধাপ্রাপ্ত হয়। মুসলিম শাসনকালে হিন্দুসমাজ যথেষ্ট রক্ষণশীল হয়ে ওঠে। আর এই রক্ষণশীলতায় প্রধান বলি হয় নারীশিক্ষা।

(10) মূল্যায়ন-পদ্ধতি ও ডিগ্রি প্রদান: 

মধ্যযুগের শিক্ষায় মূল্যায়ন-পদ্ধতি ও ডিগ্রি প্রদান প্রসঙ্গে পর্যালোচনা করলে, যে বিষয়গুলি লক্ষ করা যায়, সেগুলি হল-

  1. পরীক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতি ও ক্রমিক মূল্যায়ন: ইসলামীয় শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক যুগের মতো পরীক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত ছিল না। বরং শিক্ষার্থীদের ক্রমিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা ছিল। শিক্ষকরা সমগ্র শিক্ষাকাল ধরে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার বিভিন্ন পর্যায় বিচার করতেন।
  2. ত্রুটি সংশোধন: শিক্ষকরা ছাত্রদের যে দৈনন্দিন পাঠ দিতেন, ছাত্ররা তা সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারছে কি না তা তাঁরা বিচার করে দেখতেন এবং ত্রুটিগুলি পর্যালোচনা করে সংশোধনে সাহায্য করতেন।
  3. দীর্ঘসময়ের ব্যবধানে মূল্যায়ন: ইসলামীয় শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রদের দীর্ঘসময়ের ব্যবধানেও মূল্যায়ন করা হত। মূল্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময় ধার্য করা থাকত না।
  4. বিদ্যালয়ভিত্তিক বা শিক্ষকভিত্তিক মূল্যায়ন: শিক্ষক ইচ্ছানুসারে মূল্যায়ন করে শিক্ষার্থীকে পরবর্তী স্তরের পাঠ দিতেন। শিক্ষার্থীদের এই মূল্যায়ন ছিল বিদ্যালয়ভিত্তিক বা শিক্ষকভিত্তিক।
  5. সামগ্রিক মূল্যায়ন: শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক মূল্যায়নের জন্য সর্বজনীন প্রতিযোগিতারও ব্যবস্থা করা হত। বিতর্ক, আলোচনা, প্রবন্ধপাঠ ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হত। যে-কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে যোগ্যতার নিরিখেই শংসাপত্র (certificate) দেওয়া হত।

ডিগ্রি বা উপাধি প্রদান: শিক্ষাশেষে ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা ছিল। যাঁরা ধর্মের ক্ষেত্রে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতেন, তাঁদের ‘আলিম’ উপাধি, যাঁরা যুক্তিশিক্ষায় বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতেন, তাঁদের ‘ফাজিল’ উপাধি এবং যাঁরা সাহিত্যে বিশেষ পারদর্শিতা দেখাতেন, তাঁদের ‘কাবিল’ উপাধি প্রদান করা হত।

আরও পড়ুনLink
নৈতিক প্রত্যয়সমূহ প্রশ্ন উত্তরClick Here
চার্বাক সুখবাদ প্রশ্ন উত্তরClick Here
পাশ্চাত্য নীতিবিদ্যা প্রশ্ন উত্তরClick Here
আরও পড়ুন প্রয়োজনে
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাচীন অনুবর্তনের গুরুত্ব লেখো | Importance of ancient tradition in education (Class 11 Exclusive Answer) Click here
রাজা রামমোহন রায়ের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার আলোচনা করো | Education and Social Reforms of Raja Rammohan Roy Click here
ব্রাহ্মণ্য যুগের শিক্ষার বৈশিষ্ট্য গুলি লেখো ( Exclusive Answer) Click here
কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালের বিকাশগত বৈশিষ্ট্য | Developmental characteristics of adolescence (Class 11 Exclusive Answer) Click here

Leave a Comment