প্রাচীন ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যে বৈশিষ্ট্যগুলি আধুনিক শিক্ষায় গ্রহণযোগ্য- সেগুলি আলোচনা করো

প্রাচীন ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যে বৈশিষ্ট্যগুলি আধুনিক শিক্ষায় গ্রহণযোগ্য- সেগুলি আলোচনা করো

প্রাচীন ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যে বৈশিষ্ট্যগুলি আধুনিক শিক্ষায় গ্রহণযোগ্য- সেগুলি আলোচনা করো
প্রাচীন ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যে বৈশিষ্ট্যগুলি আধুনিক শিক্ষায় গ্রহণযোগ্য- সেগুলি আলোচনা করো

প্রাচীন ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বৈশিষ্ট্যাবলির আধুনিক শিক্ষায় গ্রহণযোগ্যতা

(1) লক্ষ্য: প্রাচীন ভারতে শিক্ষার লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীর সৎ চরিত্র গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের যথাযথ বিকাশসাধন ঘটানো। এই লক্ষ্যটি বর্তমান শিক্ষাক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীর চরিত্রগঠন এবং সর্বাঙ্গীণ বিকাশ ঘটানোই শিক্ষার চরম লক্ষ্য।

(2) অবৈতনিক শিক্ষা: প্রাচীন ভারতে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক। বৈদিক যুগে গুরুর আশ্রমের শিক্ষা থেকে শুরু করে নালন্দা, বিক্রমশীলা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষা ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক। ফলে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলেই সমভাবে শিক্ষার সুযোগ পেত। যদিও শিক্ষাশেষে শিক্ষার্থীকে তার সামর্থ্য মতো গুরুদক্ষিণা দিতে হত। বলার অপেক্ষা রাখে না শিক্ষার সম অধিকার হওয়াই উচিত সর্বকালে।

(3) মেধার ভিত্তিতে সুযোগ: প্রাচীন ভারতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেত মেধার ভিত্তিতে। নালন্দা, বিক্রমশীলা প্রভৃতি উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলিতে শিক্ষার্থী মেধার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবেই ভরতির সুযোগ মিলত যা বর্তমানেও প্রযোজ্য।

(4)  শিক্ষা সামাজিক কর্তব্য: প্রাচীন ভারতে শিক্ষাকে সামাজিক কর্তব্য বলেই মনে করা হত। আর তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে রাজা ও বিত্তবানরা যথেষ্ট পরিমাণ অর্থসাহায্য করতেন। আধুনিক শিক্ষায় এই বিষয়টি অবশ্যই গ্রহণযোগ্য।

(5) শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক: প্রাচীনকালে আমরা দেখতে পাই শিক্ষক- শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হল পিতা-পুত্রের মতো। বর্তমানে এই সম্পর্ক অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। প্রাচীনকালের থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের অবিলম্বে এই সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা উচিত।

(6) শিক্ষালয়: নগরজীবনের কোলাহল থেকে মুক্ত, প্রকৃতির মধ্যে আশ্রমকেন্দ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান বর্তমানকালে বিশেষভাবে প্রয়োজন।

(7) আবাসিক শিক্ষা: প্রাচীন ভারতের শিক্ষা ছিল প্রধানত আবাসিক। এই আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে শিক্ষার্থীরা আত্মনির্ভর, দায়িত্ববান, কর্তব্যপরায়ণ, সময়নিষ্ঠ এবং শ্রমের প্রতি মর্যাদাশীল হয়ে ওঠার সুযোগ পেত। বর্তমানকালেও শিক্ষার্থীর মধ্যে এই সমস্ত গুণের বিকাশ ঘটাতে আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।

(৪) শিক্ষণ পদ্ধতি : প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলিতে অগ্রসর শিক্ষার্থীরা নবাগতদের শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেত। যা বর্তমানেও অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। এর ফলে গুরুর চাপ কমে আবার অগ্রসর শিক্ষার্থীরাও অধীত বিষয়বস্তু অনুশীলনের সুযোগ পায়। বিতর্ক ও আলোচনা সভার আয়োজন বর্তমান শিক্ষাক্ষেত্রেও অতি অবশ্যই গ্রহণযোগ্য।

(9) মূল্যায়ন পদ্ধতি: প্রাচীনকালে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে অনেকক্ষেত্রে বিতর্ক ও আলোচনা সভার আয়োজন হত। যা অবশ্যই আধুনিক শিক্ষাক্ষেত্রে গ্রহণীয়।

(10) শৃঙ্খলা: প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে যে কঠোর নিয়মকানুন মেনে চলতে হত তাতে শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি শৃঙ্খলাপরায়ণ হয়ে উঠত, যা ভবিষ্যৎ জীবনে চলার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। এই শৃঙ্খলিত জীবনযাত্রা বর্তমান শিক্ষাক্ষেত্রেও অতি আবশ্যিক।

(11) পাঠক্রম: পরাবিদ্যা ও অপরাবিদ্যা উভয়ই স্থান পেয়েছিল প্রাচীন শিক্ষার পাঠক্রমে। আধুনিক শিক্ষাক্ষেত্রেও অপরাবিদ্যা তথা ব্যাবহারিক বিদ্যার পাশাপাশি নৈতিকতা বিকাশের উপযোগী বিষয়বস্তু পাঠক্রমে থাকা বাঞ্ছনীয়।

(12) সমন্বয়পূর্ণ ভারতীয় সংস্কৃতি: প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি ধর্মীয় ভাবাবেগ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তীকালে তারা তাদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারেনি। যেমন- তক্ষশিলা হিন্দুধর্মের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলেও পরবর্তীকালে বৌদ্ধশাস্ত্রের পাঠের ব্যবস্থা করা হয়েছে আবার বৌদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে হিন্দুশাস্ত্র পাঠের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের মনে এক সমন্বয়পূর্ণ সংস্কৃতিমূলক মনোভাব গঠন করার চেষ্টা হয়েছিল, যা বর্তমানে আধুনিক শিক্ষায় অত্যন্ত প্রয়োজন। 

(13) শিক্ষাকর কার্ম স্বাধীনতা : প্রাচীন ভারতে শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকরা পাঠক্রম প্রণয়নে, শিক্ষাদানে এবং শিক্ষাসংক্রান্ত যাবতীয় কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা পেতেন। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে এই ব্যবস্থা বর্তমানেও খুবই জরুরি।

(14) শিক্ষার সর্বজনীনতা: প্রাচীনকালে বৌদ্ধ শিক্ষা সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ গ্রহণ করতে পারত। অর্থাৎ শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বজনীনতা ছিল যা আমরা আজও দেখতে পাই।

(15) আন্তর্জাতিক শিক্ষক আনয়ন: প্রাচীন ভারতে উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলিতে দেশের বাইরে থেকে শিক্ষকেরা ভারতে এসে পাঠদান করতেন, আবার দেশীয় শিক্ষকেরা দেশের বাইরে পাঠদান করতে যেতেন। শিক্ষার মান উন্নত করতে এবং আন্তর্জাতিক বোঝাপড়ার জন্য যা বর্তমানে বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়।

(16) রাজনৈতিক প্রভাব মুস্ত: প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় কোনোপ্রকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিল না। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে যা বর্তমানে অনুকরণীয়।

আরও পড়ুন – বিকাশের স্তরসমূহ প্রশ্ন উত্তর

আরও পড়ুন প্রয়োজনে
মহান শিক্ষাবিদ্গণ ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁদের অবদানসমূহ MCQ প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 শিক্ষাবিজ্ঞান Click here
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাচীন অনুবর্তনের গুরুত্ব লেখো | Importance of ancient tradition in education (Class 11 Exclusive Answer) Click here
রাজা রামমোহন রায়ের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার আলোচনা করো | Education and Social Reforms of Raja Rammohan Roy Click here
মক্তব এবং মাদ্রাসার শিক্ষাদান পদ্ধতি | Teaching methods of Maktabs and Madrasas (Class 11 Exclusive Answer) Click here

Leave a Comment