রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 দর্শন চতুর্থ সেমিস্টার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ প্রশ্ন উত্তর ক্লাস 12 দর্শন চতুর্থ সেমিস্টার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ প্রশ্ন উত্তর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ প্রশ্ন উত্তর

১। মানবতাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অভিমত ব্যক্ত করো।

মানবতাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অভিমত

রবীন্দ্রনাথের কাছে মানবধর্মের অর্থ হল মানবতাবাদ। এই মানবধর্ম তথা মানবতাবাদকেই তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন তাঁর রচনাবলির মাধ্যমে। এ কথাই তিনি অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ঠভাবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ নামক প্রবন্ধে এবং ‘Religion of Man’ নামক গ্রন্থে। মানবতাবাদ সম্পর্কিত রবীন্দ্রনাথের অভিমতকে প্রদত্ত আলোচনার মাধ্যমে উল্লেখ করা যায়-

মানবধর্ম: রবীন্দ্রনাথের মতে, মানবতাই হল মানুষের ধর্ম। রবীন্দ্রনাথের আগে অনেকেই মানবতাবাদের কথা বললেও রবীন্দ্রনাথই হলেন প্রথম চিন্তানায়ক যিনি মানবতাবাদকে মানুষের প্রকৃত ধর্ম হওয়া উচিত, এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁর পূর্বে বৌদ্ধ, খ্রিস্ট, ইসলাম এবং হিন্দুধর্মের গ্রন্থগুলিতেও মানবতাবাদের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রখ্যাত দৃষ্টিবাদী কোঁতের দর্শনেও মানবতাবাদের পরিচয় পাওয়া যায়। মানবতাবাদের পরিচয় পাওয়া যায় কবিরের দোঁহাতে, গুরু নানকের বাণীতে, রজ্জাব ও বুইদাসের গাঁথামালাতেও। পরবর্তীকালে মানবতাবাদের ধারণাটি আরও সংহত হয় বঙ্কিমচন্দ্র, রামমোহন, মহাত্মা গান্ধি, রামকৃয় পরমহংসদেব এবং বিবেকানন্দ প্রমুখ মহামনীষীদের নানান বাণী ও লেখায়। কিন্তু মানবতাবাদ যে মানুষের ধর্মরূপে গড়ে উঠতে পারে, তা সম্ভবত রবীন্দ্রনাথই সর্বপ্রথম যুক্তিনিষ্ঠভাবে প্রমাণ করে গেছেন।

দ্বিবিধ সত্তায় মানুষ: রবীন্দ্রনাথ মানুষের মধ্যে দুটি সত্তাকে উপলব্ধি করেছেন। একটি হল তার জীবসত্তা এবং অপরটি হল তার মানবসত্তা। এই মানবসত্তাকেই তিনি পরমসত্তার পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। এই দুটি সত্তাকেই তিনি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ নামক প্রবন্ধে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মানুষ জীবরূপে বাঁচতে চায় তার জৈবিক ও ব্যাবহারিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যই। এই জৈবিক ও স্বার্থজড়িত কামনাই হল মানুষের জীবসত্তা। জীবসত্তার সঙ্গে তাই জড়িত হল জীবভাব।

দুর্লভ সত্তারূপে মানবসত্তা: মানুষের নিজস্ব স্বার্থজড়িত কামনাই শুধু তার পরিচয় নয়। এর বাইরেও মানুষের এক দুর্লভ সত্তা বিদ্যমান, যে কারণে মানুষের মধ্যে জন্ম লাভ করে ‘মনুষ্যত্ববোধ’। মানুষ শুধু তার জীবসত্তা নিয়েই বাঁচতে চায় না। মানুষ চায় এক ব্যাপক পরিচয় নিয়ে বাঁচতে এবং তা হল নিজেকে মনুষ্যত্ববোধে দীক্ষিত করা। এই অনেক বড়ো পরিচয়ের আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে তার মানবসত্তায় উদ্বুদ্ধ করে এবং যার স্ফুরণ ঘটে মানবতাবাদের মাধ্যমে।

দ্বিবিধভাবে মানুষ: রবীন্দ্রনাথ আরও উল্লেখ করেন যে, মানুষের জীবসত্তা ও মানবসত্তার মধ্যে দুটি ভাব আছে-জীবভাব ও বিশ্বভাব। জীবভাব, ব্যক্তিজীবের মধ্যেই আবদ্ধ। কিন্তু বিশ্বভাব ব্যাক্তিজীবকে তার আত্মস্বার্থের সীমা পেরিয়ে পরমসত্তার সীমানায় উত্তরণ করতে সক্ষম। মানুষের মধ্যে এই যে বিশ্বভাব, তা মানবসত্তারই প্রকাশ। জীবসত্তার সমাপ্তি ঘটে মানুষের মৃত্যুতে, কিন্তু মানবসত্তার কোনো মৃত্যু নেই। এই মানবসত্তা হল চির অমলিন ও শাশ্বত। মানুষের প্রকৃত মূল্যবোধ থেকেই আসে বলে, মানবসত্তা মানবসমাজের আলোক-দিশারিরূপে গণ্য হয়। জীবভাবে মানুষ নিজেকে নিয়েই নিজে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু বিশ্বভাব নিয়ে যে মানবসত্তা বিরাজমান, তা অন্তরের নির্দেশে এবং আদর্শের আলোকে উদ্ভাসিত। এর ফলে ব্যক্তিমানুষ মানবতাবাদের উপহার নিয়ে বিশ্বমানবের দরবারে হাজির হয়।

অহং’ থেকে ‘বিশ্বআত্মা’-য় উত্তরণ: রবীন্দ্রনাথ আরও বলেন যে, মানুষের জীবভাব অহং-এর সঙ্গে তুলনীয়, কিন্তু বিশ্বভাব আত্মার সঙ্গে তুলনীয়। অহং হল প্রদীপস্বরূপ, কিন্তু আত্মা হল শিখাস্বরূপ। শিখা শুধু নিজেকেই প্রকাশ করে না, তা একই সঙ্গে তার বাইরের অন্যান্য অনেক কিছুকেই প্রকাশিত করে। শিখা তাই প্রদীপের ক্ষুদ্র গণ্ডির সীমাকে অতিক্রম করে প্রবেশ করে বিশ্ব নিখিলের মধ্যে। মানুষের আত্মা এভাবেই যখন বিশ্বচেতনার দীপশিখাকে প্রজ্জ্বলিত করে, তখন ধ্বংস হয়ে যায় তার অহং-এর ক্ষুদ্র গণ্ডি। সেই আলোকেই দেখা যায় যে, এই বিশ্বে ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব অতি নগণ্য।

বিশ্বসত্তার উপলব্ধিতে মানবতাবাদ: ক্ষুদ্র ব্যক্তিসত্তাকে অতিক্রম করে বিশ্বসত্তায় পৌঁছোনোর চেষ্টা করা উচিত। এরূপ চেতনাই হল মানুষের প্রকৃত ধর্ম, যা মানুষকে ঐক্যমন্ত্রে দীক্ষিত করে। এভাবেই দেখা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানবতাবাদের বীজটি ব্যক্তিমানুষে প্রোথিত করে তাকে ফুলে-ফলে বিকশিত করে হাজির করেছেন বিশ্বমানবতাবাদের দরবারে। এখানে দেবতা বা ঈশ্বরের কোনো ঠাঁই নেই, আছে শুধু মানুষের ঠাঁই। ঈশ্বর বা দেবতার বেদিতে তিনি মানুষকেই নরনারায়ণ তথা জীবন দেবতারূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আদর্শ ধর্ম হিসেবে মানবতাবাদ: রবীন্দ্রনাথের মতে, আদর্শ ধর্ম হল মানবতা বা মানবতাবাদ, যা মানব ধর্মকেই সূচিত করে। এরূপ ধর্ম হল পরমসত্তার বোধ, যা বিশ্বমানব চেতনায় মূর্ত হয়ে ওঠে। বিশ্বচেতনার এই উপলব্ধি আসে জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের পথ ধরে। মানবতাবাদের মূল লক্ষ্যই হল বিশ্বমানুষের মঙ্গলসাধন-যা মানুষকে শান্তির পথ ধরে শাশ্বত আনন্দের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। ধর্ম হিসেবে মানবতাবাদ সাবেকি ধর্মবোধ থেকে তাই অবশ্যই স্বতন্ত্র। ফলত ধর্ম হিসেবে মানবতাবাদ একটি অভিনব ও অনন্য মতবাদরূপেই গণ্য।

২। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শনের মূল উৎসগুলি উল্লেখ করো এবং বিশ্লেষণ করো।

রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শনের মূল উৎসমূহ

রবীন্দ্রনাথের দর্শনকে মূলত মানবতাবাদী দর্শনরূপে উল্লেখ করা হয়। কারণ, রবীন্দ্রনাথ প্রদত্ত দর্শনে মানবতাবাদের বিষয়টিই দারুণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর মতে এই মানবতাবাদের বিষয়টি বিভিন্ন উৎস থেকে হাজির হয়েছে। মানবতাবাদী দর্শনের মূল উৎসগুলি এখানে উল্লেখ ও ব্যাখ্যা করা হল-

[1] মানবতাবাদী দর্শনের মূল উৎস হিসেবে অদ্বৈত বেদান্ত: মানবতাবাদের মূল কথাই হল জীবরূপে সকল মানুষের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া, সকল মানুষকেই ভালোবাসা। মানুষের সামগ্রিক মঙ্গল চিন্তা তাই মানবতাবাদ থেকেই নিঃসৃত। রবীন্দ্রনাথ অদ্বৈত বেদান্তের ভাবধারায় এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্মের প্রকাশ হিসেবে মানুষের ওপরই সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। মানুষের অস্তিত্ব ও মর্যাদা তাই তাঁর কাছে সবার ঊর্ধ্বে। অদ্বৈত বেদান্তের মূলকথাই হল-জীব ব্রহ্মস্বরূপ। সেকারণেই তিনি যেখানেই মানুষ ও মনুষ্যত্বের অবমাননা দেখেছেন, সেখানেই তিনি প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন।

[2] মানবতাবাদী দর্শনের উৎসে ধর্মীয় ভিত্তি: মানুষের জীবন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ধর্মের বিষয়টি মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এমন কোনো মনুষ্যসমাজ সমাজ দেখা যায় না, যেখানে ধর্মের বিষয়টি একেবারেই অনুপস্থিত। মানুষ এবং মানুষের সমাজকে জানতে গেলে তাই ধর্মের ইতিহাসটিও জানা দরকার। প্রখ্যাত পাশ্চাত্য দার্শনিক ম্যাক্সমুলারকে অনুসরণ করে বলা যায়-মানুষের প্রকৃত ইতিহাস হল ধর্মের ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথও মানুষের জীবন থেকে ধর্মের বিষয়টিকে বাদ দিতে চাননি। তবে তিনি ধর্ম বলতে চিরাচরিত বা প্রথাগত ধর্মকে না বুঝিয়ে ধর্ম হিসেবে মানবতাবাদের বিষয়টিকেই সূচিত করেছেন। সুতরাং বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শনের ক্ষেত্রে এক ধর্মীয় ভিত্তিও উপস্থিত।

[3] মানবতাবাদী দর্শনের উৎসরূপে মানুষের জীবভাব ও বিশ্বভাব: মানবতাকে মানুষের ধর্মরূপে উল্লেখ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে দুটি সত্তার উল্লেখ করেছেন। এই দুটি সত্তার একটি হল জীবসত্তা এবং অপরটি হল মানবসত্তা। জীবসত্তা থেকে উৎসারিত হয় জীবভাব এবং মানবসত্তা থেকে উৎসারিত হয় বিশ্বভাব। স্বার্থযুক্ত মানুষের চিন্তাই হল তার জীবভাব। কিন্তু স্বার্থযুক্ত চিন্তাকে অতিক্রম করে সামগ্রিকভাবে মানুষের চিন্তার মধ্যেই ফুটে ওঠে তার বিশ্বভাব। জীবভাবকে অতিক্রম করে বিশ্বভাবের মাধ্যমেই মানুষ মানবতাবাদের পূজারিরূপে গণ্য হতে পারে।

[4] মানবতাবাদের উৎসে শ্রেষ্ঠ মানব চেতনা: রবীন্দ্রনাথের মতে, মানুষই হল শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষের চেতনাই তাই সর্বশ্রেষ্ঠ চেতনারূপে গণ্য। এরূপ চেতনাই মানুষকে পরিপূর্ণভাবে মেলে ধরতে পারে। মানবতাবাদের অর্থই হল তা-ই যা মানুষের জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে। এরূপ বিকাশের ফলে মানুষ আর নিজের ক্ষুদ্র চেতনায় আবদ্ধ থাকতে পারে না। এরই ফলে ক্ষুদ্র চেতনার গণ্ডি পেরিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে মানুষের জয়গান শোনা যায়। এ হল এমনই শ্রেষ্ঠতা যা ব্যক্তিমানুষকে তার ক্ষুদ্র সীমানার বাইরে নিয়ে গিয়ে পরমসত্তার চেতনার দ্বারে হাজির করে।

৩। রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম বিষয়ক বক্তব্যের কয়েকটি সিদ্ধান্ত উল্লেখ করো।

রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম বিষয়ক বক্তব্যের সিদ্ধান্ত

রবীন্দ্রনাথের মতে, আধুনিক যুগে মানব ধর্মের অর্থ হল মানবতাবাদ। এই মানবতাবাদের পরিপূর্ণ অর্থ হল-মানুষের সামগ্রিক মঙ্গল সাধন। অর্থাৎ বলা যায় যে, যা মানুষের জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশকে সূচিত করে এবং সামগ্রিকভাবে মানুষের মঙ্গল চিন্তায় রত, তা-ই হল মানবতাবাদ (Humanism)। এরূপ ভাবনা হল মানুষ হিসেবে মানুষের জয়গান করা, যা সকল মানুষকে একই সূত্রে গঠিত করে বিশ্বচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। এ হল মানুষের এমনই এক পূর্ণতার রূপ, যা ব্যক্তি মানুষকে তার নিজস্ব সীমানার বাইরে টেনে নিয়ে যায় এবং পরমচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। এরূপ চেতনাই হল তার অন্তর্নিহিত শক্তির পরিপূর্ণ প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘Religion of Man’ নামক গ্রন্থে এরূপ মানবতা বোধকেই মানুষের আদর্শ ধর্ম রূপে উল্লেখ করেছেন।

মানবতাকে মানুষের ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন লেখামালায় অত্যন্ত জোরালোভাবে সওয়াল করেছেন। রবীন্দ্রনাথের পূর্বেও কিন্তু এই মানবতাবাদের পরিচয় পাওয়া যায় কবিরের দোঁহাতে, গুরু নানকের বাণী তে এবং রজ্জাব ও রাই দাসের নীতিমালাতে। আবার ভারতীয় রেনেসাসের পথিকৃৎ রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র এবং শ্রীরামকৃয় ও বিবেকানন্দের বিভিন্ন বাণী ও রচনায় মানবতাবাদের পরিচয় পাওয়া যায়। আরও উল্লেখ করা যায় যে, চোদ্দো থেকে সতেরো শতকের মধ্যে ইউরোপে, বিশেষ করে ইতালিতে যে মানবকেন্দ্রিক আদর্শের জন্ম হয়, তাও মানবতাবাদ রূপেই পরিচিত। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বলা যায় যে, মানবতাবাদ যে মানবধর্ম রূপে গণ্য। তা সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথই যুক্তিসিদ্ধভাবে প্রমাণ করেছেন তাঁর বিভিন্ন লেখামালায়। এর ফলে তিনি নিম্নের সিদ্ধান্তগুলিতে উপনীত হতে পেরেছেন।

আধুনিক মানবধর্ম রূপে মানবতাবাদ: রবীন্দ্রনাথের মতে, মানবতাই হল প্রকৃত মানবধর্ম। তিনি তাই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করে মানবতাকেই প্রকৃত মানবধর্ম রূপে উল্লেখ করেছেন। এর ফলে মানুষের জয়গান করাই হল তাঁর প্রধান কাজ। তিনি তাই বলেন-“দেবতা নেই কোনো মন্দিরে, মসজিদে…”, দেবতা আছে মানুষেরই মাঝে যেখানে ‘মাটি ভেঙে করছে চাষ চাষ খাটছে বারমাস’।

মানুষের সার্বিক কল্যাণে মানবতাবাদ: অধ্যাপক টয়েনবি বলেছেন যে, ধর্ম হল মানুষের সামাজিক জীবনের এক শ্রেষ্ঠ উপাদান। কারণ, ধর্ম ব্যর্থ হলে মানব সভ্যতাও ব্যর্থ হয়। ধর্মকে তাই গোষ্ঠীবদ্ধ না-হয়ে, হতে হয় উদার ও মানবমুখী। ধর্মকে তাই সমস্ত বাঁধন ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে হয়। তা না হলে ধর্মের মৌল আদর্শই ব্যহত হয়। ধর্মকে তাই উদার ও জনমুখী হয়ে মানবতার দিশারিরূপে মানুষের সামগ্রিক কল্যাণে উঠে আসতে হয়। আর রবীন্দ্রনাথ এরূপ মানবধর্মের কথাই বারবার উল্লেখ করেছেন তাঁর বিভিন্ন লেখমালায়।

মানব সংহতির প্রতিষ্ঠায় মানবধর্ম: শান্তি ও সংহতির দাবিতে আধুনিককালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পারস্পরিকভাবে বিভিন্ন রকম জনহিতকর চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে। মানবতার পরিপন্থী যা কিছু, তার সবকিছুকেই বর্জন করার দাবি সমগ্র বিশ্বজুড়েই প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে। ক্ষুদ্র মানব গোষ্ঠীর স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে, বিশ্বের মানুষের কাছে তাই একটিই ধর্ম গৃহীত হচ্ছে এবং তা হল মানবধর্ম, যার মৌল ভিত্তি হল সবার উপরে মানব সত্য, তার উপরে নাই।

৪। ‘জীবসত্তা’ ও ‘মানবসত্তা’ কী? রবীন্দ্রনাথের মতে জীবসত্তা ও মানবসত্তার পার্থক্য কী?

জীবসত্তা ও মানবসত্তা

রবীন্দ্রনাথ তাঁর দার্শনিক চিন্তনে মানবতাবাদের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মধ্যে দুটি সত্তাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই দুটি সত্তার একটি হল জীবসত্তা এবং অপরটি হল মানবসত্তা। তিনি তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ নামক প্রবন্ধে এই দুটি সত্তাকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

‘জীবসত্তা’-র ধারণা: রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন যে, মানুষ জীবরূপে বাঁচতে চায় তার বিভিন্নপ্রকার জৈবিক কামনা-বাসনা নিয়ে। মানুষের জীবসত্তা তাই তার ব্যাবহারিক কামনা-বাসনা এবং স্বার্থসিদ্ধিকেই সূচিত করে। অর্থাৎ, স্বার্থ জড়িত কামনা-বাসনাই হল তার জীবসত্তা।

‘মানবসত্তা’-র ধারণা: জীবসত্তাই কিন্তু মানুষের একমাত্র পরিচায়ক নয়। এই জীবসত্তার বাইরেও মানুষের একটা দুর্লভ পরিচয় আছে-যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জন্ম লাভ করে ‘মনুষ্যত্ববোধ’। মানুষ তাই শুধু তার জীবসত্তা নিয়েই বাঁচতে চায় না, সে বাঁচতে চায় তার অনেক বড়ো ও মহান পরিচয় নিয়ে। আর এই অনেক বড়ো পরিচয়ের আকাঙ্ক্ষাই তার উত্তরণ ঘটায় মানবসত্তায়-যার প্রকাশ ঘটে মানবতাবাদের মাধ্যমে। মানুষের এই মানবসত্তাই মানুষের স্বার্থের বন্ধন শিথিল করে এবং আত্মত্যাগ ও আত্মোপলব্ধিতে উদ্বুদ্ধ করে।

রবীন্দ্রনাথের মতে জীবসত্তা ও মানবসত্তার পার্থক্য

রবীন্দ্রনাথের মতে জীবসত্তা ও মানবসত্তার পার্থক্যগুলি হল-

[1] স্বার্থযুক্ত জীবসত্তা, মনুষ্যত্বযুক্ত মানবসত্তা: রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘স্বার্থ আমাদের যেসব প্রয়াসের দিকে ঠেলে নিয়ে যায় তার মূল প্রেরণা দেখি মানুষের জীবপ্রকৃতিতে, আর যা আমাদের ত্যাগের দিকে তপস্যার দিকে নিয়ে যায় তাকেই বলি মনুষ্যত্ব, মানুষের ধর্ম।’ অর্থাৎ, স্বার্থসমন্বিত যে মানুষ, তা হল তার জীবসত্তার প্রকাশ। অপরদিকে, স্বার্থের গণ্ডির বাইরে মনুষ্যত্বের তপস্যারত যে মানুষ, তা হল তার মানবসত্তার প্রকাশ।

[2] নশ্বর জীবসত্তা, অবিনশ্বর মানবসত্তা: মানুষের জীবসত্তার সমাপ্তি ঘটে তার মৃত্যুতে। কিন্তু মানুষের মানবসত্তার কোনো মৃত্যু নেই। মানুষের জীবসত্তা হল ক্ষণস্থায়ী এবং জন্মমৃত্যুর অধীন। কিন্তু মানবসত্তার কোনো জন্মমৃত্যু নেই, এ হল অমলিন ও শাশ্বত। মানুষের প্রকৃত মূল্যবোধ থেকেই মানবসত্তার উদ্বোধন ঘটে। সেকারণেই মানবসত্তা মানুষের সর্বোচ্চ আদর্শ হিসেবে গণ্য।

[3] সসীমের প্রকাশক জীবসত্তা, অসীমের প্রকাশক মানবসত্তা: রবীন্দ্রনাথের মতে, মানুষের জীবসত্তা তার সসীম দিকের প্রকাশকরূপে গণ্য। কারণ, এরূপ সত্তা একটি নির্দিষ্ট সীমায় আবদ্ধ এবং এর বাইরে তা আর এক-পাও এগিয়ে যেতে পারে না। জীবসত্তা নিজেকে নিয়ে নিজেই মত্ত। এ যেন ডিমের ভিতরে পক্ষীশাবকের অবস্থানের মতো। কিন্তু মানবসত্তা হল অসীমের প্রকাশক। কারণ, এরূপ সত্তা নিয়েই মানুষ বহির্মুখী হয়ে অসীমের দিকে এগিয়ে যায়। নিজের সংকীর্ণতাকে অতিক্রম করে, মানবতার নজির নিয়ে বিশ্বমানবের দরবারে হাজির হয়। এভাবেই মানবসত্তা সমস্ত মানুষকে ঐক্য বন্ধনে আবদ্ধ করে ঊর্ধ্বমুখী করে।

৫। জীবভাব এবং বিশ্বভাব বলতে রবীন্দ্রনাথ কী বুঝিয়েছেন?

জীবভাব ও বিশ্বভাব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণা

রবীন্দ্রনাথ মানবতাকেই মানুষের ধর্মরূপে উল্লেখ করেছেন। মানবতা তথা মানব ধর্মকে মানুষের ধর্মরূপে প্রতিপাদন করতে গিয়ে তিনি মানুষের প্রকৃতিতে দুটি ভাবের উল্লেখ করেছেন। এই দুটি ভাবের একটি হল জীবভাব এবং অন্যটি হল বিশ্বভাব। রবীন্দ্রনাথ এই দুটি ভাবকে প্রদত্ত আলোচনার মাধ্যমে উল্লেখ করা হল-

জীবভাবের সূচকে জীবসত্তা বিশ্বভাবের সূচকে মানবসত্তা: রবীন্দ্রনাথ মানুষের মধ্যে দুটি সত্তা উপলব্ধি করেছেন। এই দুটি সত্তা হল-জীবসত্তা এবং মানবসত্তা। স্বার্থ সংবলিত মানুষের যে সত্তা লক্ষ করা যায়, তাকেই বলা হয় জীবসত্তা। অন্যদিকে, মানবতা সংবলিত মানুষের যে সত্তা লক্ষিত হয়, তাকেই বলা হয় মানবসত্তা। মানুষের এই জীবসত্তা থেকেই নিঃসৃত হয় জীবভাব। আর মানবসত্তা থেকে উৎসারিত হয় বিশ্বভাব।

স্বার্থযুক্ত জীবভাব, আদর্শযুক্ত বিশ্বভাব: জীবভাবযুক্ত মানবসত্তা মানুষের নিজস্ব স্বার্থকে কেন্দ্র করেই বাঁচে। এর মধ্যে থাকে না কোনো অন্তরের আহ্বান বা আদর্শের নির্দেশ। এ শুধু নিজেকে নিয়ে নিজেই মত্ত থাকা। এ যেন ডিমের ভিতরে পাখির ছানার আবদ্ধ থাকা এবং তাতেই মত্ত থাকা। কিন্তু বিশ্বভাব নিয়ে যে মানবসত্তা বিরাজমান তা অন্তরের নির্দেশে, আদর্শের আলোকে উদ্ভাসিত। এই বিশ্বভাব কখনোই ডিমের অন্তঃস্থিত দুর্বল ডানাবিশিষ্ট পাখির সঙ্গে তুলনীয় নয়। এই ভাব নির্দেশ করে পাখির ডানার প্রকৃত সক্ষমতাকে-যা আমাদেরকে ক্ষুদ্র স্বার্থচেতনার সীমা অতিক্রম করে পরমসত্তার সীমানায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

বিশ্বভাবের বিকাশে জীবভাবের অবদান: মানুষের জীবভাবও কিন্তু কখনোই উপেক্ষিত নয় কারণ মানুষের বিশ্বভাব উৎসারিত হয় এই জীবভাব থেকেই। মানুষের মধ্যে জীবভাব আছে বলেই, তার মধ্যে বিশ্বভাবের আকাঙ্ক্ষা জাগরিত হয়। আগে তাই ব্যক্তিমানুষের ধারণা আসে, তার পরেই আসে বিশ্বমানুষের ধারণা। এই বিশ্বমানবের প্রেরণাতেই ব্যক্তিমানুষ এমন কিছু কাজে প্রবৃত্ত হয়, যার সাহায্যে সে তার ক্ষুদ্র স্বার্থ সংবলিত জীবনের সীমাকে অতিক্রম করে অগ্রসর হয় আত্মার পরিপূর্ণ তৃপ্তির দিকে। এরূপ বোধের ফলেই মানুষের মধ্যে মহামানবের আবির্ভাব ঘটে, যার সত্তার কোনো সীমা নেই, যা অনন্ত দেবতার মহিমার অধিকারী। রবীন্দ্রনাথ এই ভাবেরই প্রকাশ ঘটিয়েছেন তাঁর গানের মধ্য দিয়ে-

“সীমার মাঝে অসীম তুমি, বাজাও আপন সুর,
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর।”

জীবভাব ও বিশ্বভাব একে অপরের পরিপূরক: রবীন্দ্রনাথের মতে, জীবসত্তা থেকে জীবভাব এবং মানবসত্তা থেকে বিশ্বভাবের উদয় হলেও, এ দুটি বিষয় কখনোই পারস্পরিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয়। কারণ, এ দুটি ভাবই মানুষের মধ্যে পরিলক্ষিত। একটি বাদ দিয়ে, অন্যটিকে নিয়ে কখনোই পরিপূর্ণভাবে মানব প্রকৃতি গড়ে উঠতে পারে না। মানব প্রকৃতির গঠনের ক্ষেত্রে এই দুটি ভাব তাই একে অপরের পরিপূরকরূপে গণ্য হয়।

৬। মানুষের সীমাবদ্ধতার দিক অথবা সসীম সত্তার দিক কী?

মানুষের সীমাবদ্ধতার দিক তথা সসীম সত্তার দিক মানুষের সীমাবদ্ধতার দিক তথা সসীম সত্তার দিকগুলিকে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা যায়-

[1] দৈহিক ও আধ্যাত্মিক প্রকৃতিতে মানুষ: রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে আমরা মানবপ্রকৃতিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা লক্ষ করি। এই দুটি প্রকৃতির একটি হল মানুষের দৈহিক প্রকৃতি এবং অন্যটি হল মানুষের আধ্যাত্মিক প্রকৃতি। মানুষ তার দৈহিক প্রকৃতি লাভ করেছে জৈবিক বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কিন্তু মানুষ তার আধ্যাত্মিক প্রকৃতি লাভ করেছে তার চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে। মানুষের দৈহিক প্রকৃতিতেই নিহিত আছে তার সসীম সত্তার দিকটি। মানুষ তার দৈহিক প্রকৃতির মাধ্যমে কিছু সীমাবদ্ধ অবস্থায় আবর্তিত হয়। মানুষের এই সীমাবদ্ধ অবস্থাই তার সীমাবদ্ধতার দিকটিকে তথা সসীম সত্তার দিকটিকে প্রকাশ করে।

[2] স্বার্থ সম্বলিত মানবসত্তাই সসীম সত্তা: মানুষ হল মূলত প্রাণীজগতের অংশীদার। অর্থাৎ, মানুষ প্রথমে একটি জীব বা প্রাণী হিসেবেই গণ্য হয়। একটি জীব বা প্রাণী হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য তাকে অহরহ বিভিন্ন বিষয়ে সংগ্রাম করতে হয়। সংগ্রামরত দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপটে মানুষ তখন তার স্বার্থ সম্বলিত ক্রিয়াকলাপের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই স্বার্থের গণ্ডির বাইরে মানুষ তাই আর-এক পাও এগিয়ে যেতে পারে না। স্বার্থের সীমানায় আবদ্ধ হয়ে পড়াই হল মানুষের সসীম সত্তার দিক। এরূপ সত্তার পরিপ্রেক্ষিতেই মানুষ অন্যান্য পশুর মতোই আচরণ করে। পশুর মতো মানুষও তখন তার কামনা-বাসনা পরিতৃপ্তির জন্য জৈবিক সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। এটিই মানবচরিত্রের সসীম সত্তা তথা সীমাবদ্ধতার দিক।

[3] প্রকৃতির কাছে মানুষের সসীম সত্তা: মানুষ মূলত জীব বা প্রাণীকুলের অংশীদার হলেও, মানুষের মধ্যে কতকগুলি প্রকৃতিগত ও অর্জিত গুণ আছে। এই গুণগুলি মানুষকে অন্যান্য নিম্ন শ্রেণির জীব থেকে আলাদা করেছে। এই গুণগুলির অন্যতম হল মানুষের বুদ্ধিমত্তা। এই বুদ্ধিমত্তাই মানুষকে প্রাণীকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থান দিয়েছে। অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, তাদের ইন্দ্রিয়বৃত্তির ক্ষেত্রে কোনোরূপ নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু মানুষ তার স্বীয় বুদ্ধিমত্তার ফলে তার মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এর ফলে কখন, কোথায়, কোন্ ধরনের কাজ করা উচিত তা সে স্থির করতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। কারণ, এমন কিছু প্রাকৃতিক ক্ষেত্র আছে যেখানে মানুষ অসহায়ভাবে প্রকৃতির হাতে নিজেকে সঁপে দেয়। আপন বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করেও মানুষ কখনোই এরকম প্রাকৃতিক ঘেরাটোপের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।

[4] সীমার মধ্যেও অসীমের প্রকাশ: মানুষের এরূপ সীমাবদ্ধতা তথা সসীমতার মধ্যেই তার আধ্যাত্মিক দিকটির সম্ভাবনা ফুটে ওঠে। মানুষের প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধতার দিকটি থাকলেও, এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে অবস্থান করেই মানবাত্মা অসীমকে ছুঁতে চায়। এই আধ্যাত্মিক চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা তাকে সসীমতার বৃত্তের বাইরে টেনে নিয়ে যায়। মানুষের এরূপ আধ্যাত্মিক চেতনার ফলেই মানুষের মন অহংভাব ত্যাগ করতে সমর্থ হয় এবং অসীমের দিকে যাত্রা করে।

৭। মানবপ্রকৃতির অসীম সত্তার দিকটি কী?

মানবপ্রকৃতির অসীম সত্তার দিক

রবীন্দ্রনাথের মতে মানব প্রকৃতির অসীম সত্তার দিকটিকে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা যায়-

[1] সসীমতার মধ্যেই অসীমতার অবস্থান: রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ নামক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, মানবপ্রকৃতিতে যেমন তার সসীম সত্তার দিকটি পরিলক্ষিত হয়, তেমনই তার অসীম সত্তার দিকটিও প্রতিফলিত হয়। মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা, বিবেক, আবেগ-অনুরাগ, আকর্ষণ এবং আত্মপোলব্ধির মাধ্যমে অহরহ চেষ্টা করে চলেছে আপন সসীমতার বৃত্তের বাইরে যেতে। মানুষ প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেকে নিয়ে নিজেই মত্ত থাকলেও, এতে কিন্তু মানুষ কখনোই শেষপর্যন্ত সন্তোষ লাভ করতে পারে না। মানুষ চায় তার নিজের মত্ততার বাইরে বেরিয়ে এসে অসীমের স্বাদ পেতে। এর জন্য মানুষ সক্রিয়ভাবে সচেষ্ট থাকে। কোনো বাধাই মানুষের এই ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। তাই সে জানার আকুতি নিয়ে অজানাকে জানতে চায়, অচেনাকে চিনতে চায়। আর যা কিছুই অজানা, অচেনা বা অতীন্দ্রিয়, তা কখনোই মানুষের সীমাবদ্ধতার অন্তর্ভুক্ত নয়। তা হল তার সীমাবদ্ধতার বাইরে অসীমতার প্রকাশক। এই অসীম সত্তাকেই মানুষ উপলব্ধি করার চেষ্টা করে চলেছে অহরহ।

[2] অহংভাবের বিনাশকরূপে অসীম সত্তা: অসীমের প্রতি মানুষের আকর্ষণ তার অহংভাবকে ধ্বংস করে। সে অনুভব করতে পারে যে, দেহসর্বস্ব প্রকৃতিই কিন্তু মানুষের সব কিছু নয়। দৈহিক প্রকৃতির বাইরেও তার আরও একটি সুমহান পরিচয় আছে। এই গুণের সাহায্যেই মানুষের মধ্যেকার আধ্যাত্মিক দিকটিকে উন্মোচিত করা যায়। এই দিকটি ছাড়া মানুষ আসলে শুধুই দেহসর্বস্ব জীব, যা তার জৈবিক চাহিদাকে পূরণ করে মাত্র। এই জৈবিকতা বা পাশবিকতা ও সসীম সত্তার বাইরেও যে কিছু পাওয়ার আছে, এরূপ উপলব্ধি যখন মানুষের হয়, তখন সে এক-পা, এক-পা করে অসীম সত্তার দিকেই এগিয়ে যায়।

[3] বিশ্বচেতনার দীপশিখায় অসীম সত্তা: মানবপ্রকৃতির অসীমতার দিকটি প্রদীপের শিখার সঙ্গেই তুলনীয়। কারণ, শিখা শুধু নিজেকেই প্রকাশ করে না, তা তার বৃত্তের বাইরে অপরাপর বস্তুগুলিকেও প্রকাশ করে। মানুষের চেতনা যখন নিজেকে ছাপিয়ে, তার বাইরে যাত্রা করে, তখন তার মনে প্রজ্জ্বলিত হয় বিশ্বচেতনার দীপশিখা। এরূপ চেতনার দীপশিখায় মানুষের অহংবোধ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এভাবেই মানুষ নিজেকে জানতে পারে, অসীম বিশ্বকে চিনতে পারে। এভাবেই সামগ্রিকভাবে মানবাত্মাকে সে বুঝতে পারে। মানুষ তখন যথার্থ মানুষ হয়ে উঠতে পারে। এরূপ ক্ষেত্রে মানুষ মানবতার পূজারি হয়ে ওঠে। এভাবেই সে ‘সোহম্’ বাণী বহন করে সকল মানুষকে ঐক্যমন্ত্রে দীক্ষিত করতে পারে। এরূপ বৃহত্তর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়াই মানুষের প্রকৃত ধর্ম।

[4] অমরত্বের সন্ধানে অসীম সত্তা: মানুষের মধ্যে এই অসীম সত্তার উপস্থিতির জন্যই মানুষ তার জীবনদেবতাকে খুঁজে নিয়ে মুক্তি পেতে চায়। এভাবেই মানুষ অমরতার জন্য আকুল হয়ে ওঠে। মানুষ জানে যে, ‘জন্মিলে মরিতে হবে’ তবুও সে অনুভব করে যে, মৃত্যুই জীবনের শেষ লক্ষ্য নয়, বৃহত্তর জীবনের সন্ধান পাওয়াই জীবনের চরম লক্ষ্য। মানুষের এই অসীমের চেতনাই তাকে অমরত্বের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

[5] সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার সূচনায় অসীম সত্তা: রবীন্দ্রনাথের মতে, অসীমের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা তাকে সৃজনশীল করে তুলেছে। এরূপ সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীনতার ওপরও সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কারণ, মানুষ শুধু তার নিজের স্বাধীন চেতনাতেই এই বিষয়টিকে উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়। এ কোনো বহির্জগতের নির্দেশ নয়, এ হল অন্তরের উপলব্ধি থেকে উদ্ভূত এক নির্দেশ। এর ফলে মানুষ আনন্দের অনুভূতি লাভকরে এবং সে নিজেকে নীচের স্তর থেকে ওপরে নিয়ে যেতে চায়।

আরো পড়ুন : একাদশ শ্রেণি দ্বিতীয় সেমিস্টার বাংলা প্রশ্ন উত্তর

আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন প্রশ্ন উত্তর

আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর

● একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির প্রতিটি সেমিস্টারের সাজেশন ই-বুক (PDF) কিনতে হলে নীচে ডানদিকে হোয়াটসঅ্যাপ বাটনে ক্লিক করে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
● বাছাই করা কমন অতি সম্ভাব্য প্রশ্নোত্তরের সেরা সংকলন।
● প্রতিটি বিষয়ের সাজেশন ই-বুকের দাম মাত্র ২০ টাকা।

Leave a Comment