জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় হিউমের ভূমিকা আলোচনা করো (Exclusive Answer)

জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় হিউমের ভূমিকা আলোচনা করো

জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় হিউমের ভূমিকা আলোচনা করো
জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় হিউমের ভূমিকা আলোচনা করো

ড. নিমাইসাধন বসু মনে করেন যে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আমলা অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম (Allan Octavian Hume)-এর প্রাপ্য F পট্টভি সীতারামাইয়া, কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হিউমের জীবনীকার ওয়েডারবার্ন, মার্কসবাদী লেখক রজনীপাম দত্ত প্রমুখ অনেকেই জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে হিউমের উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

বস্তুতপক্ষে, ভারতবর্ষ তথা ভারতবাসীর প্রতি সহানুভূতিশীল

হয়েই হিউম জাতীয় কংগ্রেস গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন বলে অনেকে অভিমত পোষণ করেছেন। ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে ভারতবাসীর সম্পর্ক স্থাপন, ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহ রদ করা, শিক্ষিত ভারতীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে ভারতের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা ও কংগ্রেস-কে সেফটি ভাল্ভ হিসেবে ব্যবহার করা -এই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য।

  • হিউমের জীবনীকার উইলিয়ম ওয়েডারবার্ন (William Wedderburn) তাঁর Allan Octavian Hume, C. B.: Father of the Indian National Congress, 1829-1912 শীর্ষক গ্রন্থে (১৯১৩ খ্রি.) হিউমের উদ্যোগ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, অবসরপ্রাপ্ত আই সি এস হিউম সরকারি উচ্চপদে থাকার সূত্রে বহু গোপন নথিপত্র দেখার সুযোগ পান। এই সময় সাত খণ্ডের এক গোপন দলিল তাঁর হাতে আসে। এই দলিল থেকে তিনি জানতে পারেন যে, ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও শ্রমিকদের মধ্যে দারুণ অসন্তোষ জমা হয়েছে। এই বিক্ষুদ্ধ শিক্ষিত ভারতীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি কৃষকদের সংঘবদ্ধ করে আন্দোলনে নামলে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এই সম্ভাব্য সংকট থেকে ব্রিটিশ শাসনকে রক্ষা করার জন্য হিউম ভারতের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির আস্থা অর্জনের জন্য সচেষ্ট হন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, ভারতের সাধারণ মানুষ এবং সরকারের মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে শিক্ষিত ভারতীয়দের একটি সংগঠন তৈরি করা।
  • এই উদ্দেশ্যে হিউম ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেন। এই চিঠিতে তিনি দেশের (ভারতের) কাজে শিক্ষিত ভারতীয় যুবকদের ঐক্যবদ্ধ হতে ও এগিয়ে আসতে আহ্বান জানান।
  • গণসংযোগ বাড়ানোর জন্য এরপর হিউম প্রতিষ্ঠা করেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ইউনিয়ন (Indian National Union) নামক সংগঠন (১৮৮৪ খ্রি.)। ভারতের বিভিন্ন শহরে এই সংগঠনের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। হিউমের লক্ষ্য ছিল, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ইউনিয়নের মাধ্যমে ভারত ও ইংল্যান্ডের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। কালক্রমে শিক্ষিত ভারতীয়দের কাছ থেকে তিনি ব্যাপক সাড়া পান।
  • অতঃপর ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে হিউম সিমলায় বড়োলাট লর্ড ডাফরিন-এর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে মত বিনিময় করেন।
  • চূড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরির পর ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে বোম্বাইতে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন আহূত হয়। সারা দেশ থেকে ৭২ জন প্রতিনিধি জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সম্মেলনে যোগ দেন। সভাপতিত্ব করেন ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশন বসে কলকাতায় (১৮৮৬ খ্রি.)। এসময় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর জাতীয় সম্মেলনের অধিবেশন আহূত হয়। এখানেই সুরেন্দ্রনাথ-এর নেতৃত্বে জাতীয় সম্মেলন কংগ্রেসের সঙ্গে মিলিত হয়ে যায়। তাই বিপানচন্দ্র বলেছেন যে, ‘এই দ্বিতীয় অধিবেশন থেকেই কংগ্রেস সর্বভারতীয় সংস্থারূপে আত্মপ্রকাশ করে।’

‘সেফটি ভাল্ড’ তত্ত্ব

জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কাজে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম-এর উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্কের দুটি জনপ্রিয় শব্দবন্ধ হল- সেফটি ভাল্ভ তত্ত্ব ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। হিউম স্বয়ং বলেছেন- ‘আমাদের কাজের জন্য ভারতবাসীর মনে যে ব্রিটিশবিদ্বেষ পুঞ্জীভূত হয়েছে, তার নির্গমনের জন্য একটি নিরাপত্তামূলক যন্ত্র (সেফটি ভাল্ড) আশু প্রয়োজন এবং এ কাজে কংগ্রেসের মতো সংগঠন সবথেকে উপযোগী হতে পারে।’

চরমপন্থী নেতা লালা লাজপত রায় তাঁর Young India গ্রন্থে (১৯১৬ খ্রি.) প্রথম সেফটি ভাল্ভতত্ত্ব উল্লেখ করে নরমপন্থীদের আক্রমণ করেন। তাঁর মতে, কংগ্রেস লর্ড ডাফরিন-এর মস্তিষ্কপ্রসূত এবং ভারতের রাজনৈতিক মুক্তি অর্জন নয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে বিপদ থেকে রক্ষা করাই ছিল কংগ্রেসের মুখ্য উদ্দেশ্য। সি এফ অ্যান্ড্রুজ (CF Andrews) ও গিরিজা মুখার্জি রচিত The Rise and Growth of the Congress in India গ্রন্থেও (১৯৩৮ খ্রি.) সেফটি ভাল্ভ তত্ত্বের সমর্থন পাওয়া যায়।

উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মত: প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখা Introduction to Indian Politics (১৮৯৮ খ্রি.) গ্রন্থে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার জন্য লর্ড ডাফরিন-এর ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি হিউমের সঙ্গে বড়োলাট লর্ড ডাফরিন-এর সাক্ষাৎ এবং ভারতীয়দের একটি জাতীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ডাফরিন-এর উৎসাহের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

হিউম-ডাফরিন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

পরবর্তীতে সেফটি ভাল্ভ তত্ত্ব-কে ভিত্তি করে মার্কসবাদী ঐতিহাসিক রজনীপাম দত্ত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব-এর অবতারণা করে তাকে বহুল প্রচারিত করেন। তিনি তাঁর India Today গ্রন্থে (১৯৪০ খ্রি.) লেখেন যে, ভারতবর্ষে কোনও গণ অভ্যুত্থান ঘটার আগেই তাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র করে কংগ্রেসকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই কারণে কংগ্রেসের কর্মধারায় এক ধরনের দোদুল্যমানতা দেখা যায়। একদিকে কংগ্রেস গণ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, আবার আন্দোলন যখন দ্রুত বৈপ্লবিক পথে এগিয়েছে তখনই সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে আন্দোলন ভেঙ্গে দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে।

বিরুদ্ধে যুক্তি: সাম্প্রতিক নানা গবেষণায় সেফটি ভাল্ভ বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অসার ও অলীক প্রমাণিত হয়েছে। ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্র, অমলেশ ত্রিপাঠী, সুমিত সরকার প্রমুখ মনে করেন যে, রজনীপাম দত্ত হিউম-এর ভূমিকাকে অতিরঞ্জিত করেছেন। সেফটি ভাল্ভ-এর তত্ত্ব একটি অতিকথন মাত্র। এঁদের মতে, ওয়েডারবার্ন-এর বিবরণ বহুলাংশে অস্পষ্ট, অবাস্তব এবং কল্পনাশ্রিত। কারণ-

  • সিমলায় অবস্থানকালে হিউম সাত খণ্ড গোপন রিপোর্ট দেখার সুযোগ পান বলে ওয়েডারবার্ন দাবি করেছেন। কিন্তু বিপানচন্দ্র ও অন্যান্যরা দিল্লি বা লন্ডনের মহাফেজখানায় (তথ্যাগার) তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ওই নথির অস্তিত্ব দেখতে পাননি।
  • ওয়েডারবার্ন বলেছেন যে, ওই সকল গণ অসন্তোষের তথ্য প্রায় ৩০ হাজার প্রতিবেদক সংগ্রহ করেছিলেন। এই সংখ্যা অবাস্তব।
  • ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে হিউম ছিলেন রাজস্ব ও বাণিজ্য বিভাগের সচিব। তাঁর দফতর ছিল সিমলাতে। স্বভাবতই স্বরাষ্ট্র দফতরের গোপন তথ্য জানার সুযোগ তাঁর ছিল না।
  • লর্ড ডাফরিন-এর বক্তব্য থেকে প্রমাণিত যে, হিউম-এর প্রতি তিনি আস্থাশীল ছিলেন না। তিনি হিউম-কে একজন ধূর্ত, ছিটগ্রস্ত ও অহংকারী মানুষ বলেই মনে করতেন।
  • তাছাড়া কংগ্রেস ব্রিটিশ কর্তৃত্ব রক্ষার হাতিয়ার হলে লর্ড ডাফরিন অবশ্যই কংগ্রেসের পক্ষে কথা বলতেন। কিন্তু কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি কংগ্রেসকে আণুবীক্ষণিক সংখ্যালঘু (Microscopic Minority) বা বাবুশ্রেণির সংগঠন বলে ব্যঙ্গ করেন।

ইতিহাসগতভাবে জাতীয় কংগ্রেসকে ব্রিটিশ শাসনের স্বার্থে গড়ে তোলা একটি সংগঠন বলা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কংগ্রেসের প্রথম পর্বের আন্দোলনে বৈপ্লবিক চরিত্র ছিল না একথা ঠিক। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেসই ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

আরো পড়ুন : একাদশ শ্রেণি দ্বিতীয় সেমিস্টার বাংলা প্রশ্ন উত্তর

আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন প্রশ্ন উত্তর

আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment