আগুন নাটকের প্রশ্ন উত্তর Class 11 Second Semester

১। চাল আজ আর পাতি হবে নানে দেহিসখেন- কে, কাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলেছে? বক্তার এমন আশঙ্কার কারণ কী? ২+৩=৫
উদ্ধৃত অংশটির বক্তা হল বাংলার গণনাট্য আন্দোলনের পথিকৃৎ, বিশিষ্ট লেখক, নাট্যকার, অভিনেতা বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম নাটক ‘আগুন’-এর প্রথম দৃশ্যের অন্যতম চরিত্র ‘পুরুষ’ (নেত্যর বাবা)। ‘পুরুষ’ অর্থাৎ নেত্যর বাবা তার ঘুমন্ত ছেলে নেত্যকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলেছে।
• গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম নাটক ‘আগুন’ অভিনয়ের মাধ্যমে গণনাট্য সংঘের পথ চলা শুরু। নাট্যকার তাঁর এই পরীক্ষামূলক নাটকে পুরোপুরি সফল হতে না-পারলেও মন্বন্তরের পটভূমিকায় ভুখা উদ্বাস্তু কৃষক ও অন্নহীন মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রামের ইতিহাসকেও স্পষ্ট করে চিত্রিত করেছেন। এ ছাড়াও কালোবাজারি, চোরাকারবারি ও মহাজনদের চরিত্রটিও এখানে উদ্ঘাটিত হয়েছে স্পষ্ট করে। নাটকের অন্যতম মূল বিষয়-চাল, চালের আকাল। বক্তা ‘পুরুষ’ অর্থাৎ নেত্যর বাবার গলায় তা স্পষ্ট। নেত্যর বাবার আশঙ্কার কারণ হল বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর সেই বাস্তব অভিজ্ঞতার সাক্ষী হল-মণিচাঁদ ও কুড়োনের মা। কারণ আগের দিনে মণিচাঁদ দেরিতে গিয়ে লাইনের শেষে দাঁড়িয়েছিল এবং নানান দোলাচলের মধ্য দিয়ে তার চাল পেতে পেতে বেলা বারোটা বাজে। কুড়োনের মায়ের অবস্থা ছিল আরও করুণ, কারণ দিনান্তে তাকে ফিরতে হয়েছে একেবারে খালি হাতে। তা ছাড়া নেতাদের গ্রাম থেকে কলমি শাক, দাঁতন কাঠি, কলা শহরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে হবে; কারণ সেই পয়সা নিয়েই দাঁড়াতে হবে চালের লাইনে। তাই ঘুম থেকে দেরিতে উঠলে তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হবে-এমন আশঙ্কা থেকেই বক্তা কথাগুলি বলেছে।
২। (একটু হেসে) ফের আবার ওই রকম করে তাকাচ্ছিস মুখপানে।’-কে, কার উদ্দেশে কথাগুলি বলেছে? উক্তিটির মধ্য দিয়ে বক্তার যে ভাব ফুটে উঠেছে তা ব্যাখ্যা করো। ২+৩=৫
মার্কসীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী, গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা দ্বিতীয় দৃশ্যে উল্লিখিত কৃষাণ। কৃষাণ তার স্ত্রী অর্থাৎ মিথ্যা আশ্বাসে জর্জরিত, নিশ্চল হয়ে যাওয়া কৃষাণির উদ্দেশ্যে কথাগুলি বলেছে।
• মার্কসীয় বিশ্বাসে নিজেকে গড়ে তুলে বিজন ভট্টাচার্য গণনাট্য সংঘে নাট্যরচনা, পরিচালনা ও অভিনয় করতে থাকেন। কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রাম ও বাঁচবার লড়াই তাঁর নাটকের মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে ছিল কালোবাজারি, চোরাকারবারি ও মহাজনদের শোষণ। এই শোষণ বঞ্চনার জাঁতাকলে পড়েও মেহনতি মানুষগুলো কিন্তু স্বপ্ন দেখায় ইতি টানতে পারেনি। এইরকমই এক কৃষকের স্বপ্ন দেখার কাহিনি দ্বিতীয় দৃশ্যের মূল উপজীব্য। কৃষক শুধু নিজে স্বপ্ন দেখেনি সে তার স্ত্রীকেও স্বপ্ন দেখিয়েছে-কিন্তু বারে বারে তা ব্যর্থ হয়েছে-নাটকে অন্তত কৃষকের স্বগতোক্তির বহিঃপ্রকাশে সে-কথাই ধরা পড়েছে। ইতিপূর্বে কৃষাণিও বহু স্বপ্ন দেখেছিল বা তাকে দেখানো হয়েছিল-যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। সেইজন্যই বোধহয় কৃষাণের দেখানো স্বপ্নে সে নির্লিপ্ত থেকেছে। এই নির্লিপ্ততাই কৃষাণের বিবেক বোধকে তীব্র আঘাত করেছে এবং তার চোখে যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে স্বপ্নগুলো কতটা অন্তঃসারশূন্য। তা ছাড়া তীব্র খাদ্যাভাবের মাঝে কৃষাণ যখন শহরে গিয়ে তাড়াতাড়ি চাল সংগ্রহ করে ফিরে আসার পরামর্শ দেয় এবং নিজের খিদের কথা বলতে থাকে তখন কৃষাণি যেন আরও অবাক হয়ে যায়। তখন মন্বন্তরপীড়িত যুগকে কিংবা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে কোথাও যেন কৃষাণি একটা ঘৃণা করতে থাকে। যেটা তার দৃষ্টির মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছিল-যা দেখে কৃষাণ উদ্ধৃত উক্তিটি করেছে। তার এই নিশ্চুপ থাকাটা ছিল প্রলয়ের আগের নিস্তব্ধতা স্বরূপ।
৩। দ্বিতীয় দৃশ্যে কৃষাণের যে অসহায়তা ফুটে উঠেছে তা লেখো।
গণনাট্য সংঘের প্রথম প্রয়াস ‘আগুন’। এই নাটকে মোট পাঁচটি দৃশ্য উল্লেখ করেছেন নাট্যকার। দ্বিতীয় দৃশ্যে উল্লেখ আছে এক কৃষক পরিবারের। নাটকে উল্লেখিত বিভিন্ন পরিবারের সমস্যা কিন্তু এক-চাল, চালের আকাল। পঞ্চাশের মন্বন্তরের কিছু আগেই খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম খাদ্যাভাব সৃষ্টি ও তজ্জনিত সমস্যা এ নাটকের মূল উপজীব্য। প্রথম চারটি দৃশ্যের মধ্য দিয়ে নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য সমস্যার সংকটময় রূপটি দর্শকের সামনে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছেন। এই দৃশ্যে বক্তা একমাত্র কৃষাণ। কৃষাণের কথায় এ দৃশ্যে তার স্ত্রীর উপস্থিতি টের পাওয়া গেলেও কৃষাণি কিন্তু নিশ্চুপ থেকেছে। কৃষাণির এই মৌনতা কৃষাণকে আরও বেশি আঘাত করেছে এবং অসহায় অবস্থায় দর্শকের কাছে দাঁড় করিয়েছে। কৃষাণ যখন চৈতের ফসল তুলে কিছুদিন নিশ্চিন্ত থাকার স্বপ্ন দেখছেন বা কৃষাণিকে সে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, ঠিক সেই সময় কৃষাণির নিরুত্তর থাকাটা কৃষাণকে আঘাত করেছে। কৃষাণ হাসি মুখে নিছক মামুলি কিছু কথা বলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কৃষাণি শুধুমাত্র দুলে ওঠে। এরপরেই কৃষক তার দেখা স্বপ্ন বা দেখানো স্বপ্ন যে বাস্তব রহিত নিজেই সে-কথা স্বীকার করেছে। এতৎসত্ত্বেও কৃষক তার স্ত্রীর মৌনতা ভাঙতে আবারও কটা দিন কষ্ট করার কথা বলে এবং তাড়াতাড়ি ফিরে আসার জন্য তাড়াতাড়ি গিয়ে চালের লাইনে দাঁড়াতে বলে। শুধু তাই নয় নিজের ক্ষুধার কথা বলে নারীসুলভ ভাবাবেগে আঘাত দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করে কিন্তু কৃষাণির নিশ্চুপ থেকে তাকানোর মধ্যে অনেক কথাই কৃষাণকে বুঝিয়ে দেয়। এ দৃশ্যে সত্যিকারেরই কৃষাণকে ভীষণই অসহায় লেগেছে।
৪। ‘আগুন’ নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে সতীশ চরিত্রটি আলোচনা করো।
ভারতীয় গণনাট্য সংঘের পথ চলা শুরু হয়েছিল বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম নাটক আগুন (১৯৪৩)-এর অভিনয়ের মাধ্যমে। বিজন ভট্টাচার্য তাঁর ‘নবান্ন’ নাটকের ভূমিকায় লিখেছেন- ‘তদানীন্তন সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে আগুন ছিল একটি পরীক্ষামূলক ক্ষুদ্র নাটিকা।’ এখানে তিনি পুরোপুরি সফল হতে না-পারলেও মন্বন্তরের পটভূমিকায় ভুখা উদ্বাস্তু কৃষক, মধ্যবিত্ত মানুষের পাশাপাশি শ্রমিক শ্রেণির জীবনসংগ্রামের ইতিহাসকেও স্পষ্ট করে – তুলে ধরেছেন। অন্যান্য শ্রেণির মানুষের সাথে সাথে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি – মানুষের জীবনসংগ্রাম ও বাঁচবার লড়াই তাঁর নাটকের মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। তৃতীয় দৃশ্যে আমরা কারখানার শ্রমিক সতীশের জীবনসংগ্রাম ও – বাঁচবার লড়াই প্রত্যক্ষ করেছি। যুদ্ধের প্রাক্কালে কালোবাজারি, চোরাকারবারি ও মহাজনদের শোষণে সমাজের এই প্রান্তিক মানুষগুলোর যে দুর্দশা হয় সতীশ – চরিত্রের বিশ্লেষণ করলেই সহজে তা চোখে পড়ে। সতীশ কারখানায় কাজ – করে। মেয়ে ফুলকি ও স্ত্রী ক্ষিরি এই নিয়ে তার সংসার। তিনজনের সংসারে – যেভাবে অশান্তির আগুন ছড়িয়ে পড়েছে তার একমাত্র কারণ-চাল, চালের – আকাল। অভাব যে মানুষকে কতটা নীচ ও হিংস্র করে তোলে তা সতীশ – চরিত্রের মধ্যে লক্ষ করা যায়। নাটকে সতীশ একজন ব্যর্থ পিতা ও স্বামী-এই সত্যটা স্ত্রী ক্ষিরির মুখে শুনে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। নিজের ব্যর্থতাকে ঢাকতে সে তার স্ত্রীকে লাথি মারে-যার দ্বারা বাস্তবকে স্তব্ধ করে দিতে চায় সে। সংসারের প্রকৃত অবস্থা জেনেও সতীশের আস্ফালন আর যাই হোক কোনো সুস্থতার লক্ষণ বলে মনে হয়নি। সে কারখানায় কাজে যাবে বলে তাকেই একমাত্র খেতে হবে; স্ত্রী, কন্যা কী খাবে তা একবারও চিন্তা করেনি। এক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় একজন স্বার্থপর মানুষ বলেই তাকে মনে হয়। আসলে অভাব, দারিদ্র্যতা মানুষের সুকুমার প্রবৃত্তিগুলিকে সর্বদাই ধ্বংস করে দেয়। সতীশও সে পথেরই পথিক।
৫। সতীশের স্ত্রী ক্ষিরি চরিত্রটি সম্পর্কে আলোচনা করো।
প্রখ্যাত নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য গণনাট্য সংঘের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহেই প্রথম লেখেন ছোট্ট নাটিকা ‘আগুন’। বাংলাদেশে মহামন্বন্তরের ভয়াবহ দুর্যোগের দিনে তিনি বাংলার গ্রামেগঞ্জে ঘুরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, মানুষের ব্যথাবেদনাকে আত্মস্থ করেছেন, তাদের প্রাণের কান্না কান পেতে শুনেছেন। মন্বন্তর ও দুর্যোগজনিত কারণে বিধ্বস্ত গ্রামবাংলার সহস্র নারী সেদিন পুরুষের সঙ্গে থেকে সংগ্রাম করে সমাজকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়েছিল।
‘আগুন’ নাটকে আমরা যে নারীচরিত্রগুলি পাই তারা হল-নেত্যর মা, কৃষাণের বউ, ক্ষিরি ওরফে সতীশের বউ এবং হরেকৃষ্ণ কেরানির বউ মনোরমা। নেত্যর মা পুরুষ অর্থাৎ নেত্যর বাবার সঙ্গে সরাসরি কোনো কথা নাটকে প্রথম দৃশ্যে বলেনি। নীরবে সংসার রক্ষার একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে কাজ করে গেছে। দ্বিতীয় দৃশ্যে কৃষাণিকে দিয়ে নাট্যকার একটি কথাও বলায়নি। তৃতীয় দৃশ্যে কিন্তু আমরা পেয়ে যাই তিরিক্ষি মেজারের ক্ষিরিকে। কারখানার শ্রমিক সতীশের স্ত্রী ক্ষিরি। ক্ষিরি সাহসী ও সত্যবাদী। সে সতীশকে তার প্রকৃত বাস্তবটা বুঝিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে। তাই সতীশ কারখানা যাবার আগে খেতে চাইলে ক্ষিরি বাস্তবটা একেবারেই সামনে এনেছে। সে সতীশের ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। আর এতেই আত্মসম্মানে ঘা লাগে সতীশের এবং ক্ষিরিকে শক্তির আস্ফালনে লাথি মারে। সতীশরা ক্ষিরির মতো মেয়েদের বাস্তব প্রশ্নের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। অনাহার যে কতো গভীরতর অসুখ, তা যে মানুষকে কোথায় নামিয়ে আনতে পারে তা এই দৃশ্যে স্পষ্ট হয়েছে। অভাবের চেয়ে আত্মসম্মানবোধ যে আরও বড়ো তা ক্ষিরির মধ্যে লক্ষ করা যায়।
৬। ‘খামকা চেঁচাচ্ছ ভোরবেলা।’-কে, কাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলেছে? বক্তা উদ্দিষ্ট ব্যক্তির চেঁচানোকে ‘খামকা’ বলেছে কেন? ২+৩=৫
বিজন ভট্টাচার্যের লেখা গণনাট্য সংঘের প্রথম প্রয়াস ‘আগুন’ নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা তৃতীয় দৃশ্যে উল্লেখিত কারখানার শ্রমিক সতীশের স্ত্রী ক্ষিরির। ক্ষিরি তার স্বামী সতীশকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলেছে।
পঞ্চাশের মন্বন্তরের কিছু আগেই খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম খাদ্যাভাব সৃষ্টির বিষয়টি এবং তজ্জনিত সমস্যাই আগুন নাটকের মূল উপজীব্য। বিভিন্ন দৃশ্যের মধ্য দিয়ে নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য সমস্যার সংকটময় রূপটি দর্শকদের সামনে আনতে সমর্থ হয়েছে। কারখানার শ্রমিক সতীশ এই দৃশ্যে কন্যা ফুলকি ও স্ত্রী ক্ষিরিকে নিয়ে একজন আদ্যোপান্ত সংসারী মানুষ। সাধারণ বাঙালি পরিবারে পুরুষ মানুষই সংসারের কর্তা। এক্ষেত্রে সতীশও তাই। এহেন সংসারে অন্যান্য সদস্যদের চাওয়া-পাওয়া, অভাব-অভিযোগের কথা শুনতে হয় তাকেই। এক্ষেত্রে কারখানার শ্রমিক সতীশের ক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত। কিন্তু এই দৃশ্যে সতীশই অভিযোগকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সাধারণ বাঙালি পরিবারে নারীরা নীরবে সংসারের কাজে সর্বতোভাবে নিজেকে নিয়োজিত করে শুধুমাত্র স্বামী-সন্তানের মুখ চেয়ে। এক্ষেত্রে ক্ষিরিও তাই। সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চালের লাইনে দাঁড়িয়েছে। কখনো-কখনো ব্যর্থও হয়েছে তবুও হাল ছাড়েনি। এমনই একদিন ক্ষিরি চালের লাইন থেকে ব্যর্থ হয়ে ফেরে। এদিকে তিনটি মানুষের উদরপূর্তির জন্য ন্যূনতম চালটুকুও ঘরে নেই। তাই রাতের উপবাস কাটানোর জন্য মিস্ত্রীর কাছে শ-দেড়েক চাল ধার করে, যা রাতেই শেষ হয়ে যায়। এ কথা কিন্তু সতীশের অজানা নয়। তাই সাতসকালে উঠে সতীশ যখন ফুলকি ও তার মাকে ঘুম থেকে তুলে কিছু খেতে দেওয়ার কথা বলে, কারণ তাকে কারখানায় কাজ করতে যেতে হবে। এ কথা শুনে ক্ষিরি খেপে যায়। কারণ খাদ্য সম্পর্কে সতীশ সব কিছু জেনেও যখন খাবার চাইছিল তখনই ক্ষিরি তাকে উদ্দেশ্য করে বলে- “খামকা চেঁচাচ্ছ ভোরবেলা।” অর্থাৎ সতীশের সেই চিৎকার যে মিছিমিছি সে-কথা বোঝাতেই ক্ষিরি ‘খামকা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে।
৭। ‘কী আমার পুরুষমানুষ রে!’-কে, কার উদ্দেশে কথাটি বলেছে? বক্তার এই উক্তির মধ্যে যে শ্লেষাত্মক ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে তা লেখো। ২+৩=৫
ভারতীয় গণনাট্য সংঘের অন্যতম সদস্য লেখক, পরিচালক ও অভিনেতা বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম নাটক ‘আগুন’ থেকে গৃহীত উদ্ধৃত অংশটির বক্তা হল তৃতীয় দৃশ্যের অন্যতম স্ত্রী চরিত্র ক্ষিরি। ক্ষিরি কথাটি তার স্বামী সতীশের উদ্দেশে বলেছেন।
• নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে লক্ষ করা যায় এক শ্রমিক পরিবার। দুর্ভিক্ষ ও কালোবাজারি-জনিত কারণে সেখানে যেভাবে অভাব নেমে এসেছে এবং তারই সূত্রে পারিবারিক সম্পর্ক কীভাবে অশান্তির আগুনে পুড়তে থেকেছে তা লক্ষ করা যায়। সতীশ ও তার মেয়ে ফুলকি এবং স্ত্রী ক্ষিরিকে নিয়ে তিনজনের সংসার। মহাজন, কালোবাজারিরা সেসময় যেভাবে খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করেছিল তাতে সমাজের এই প্রান্তিক মানুষগুলোর পক্ষে দু-বেলা দু-মুঠো খাবার জোগাড় করাই মুশকিল হয়ে উঠেছিল। পরিবারের প্রধান হয়ে সতীশও অন্নের সংস্থান করতে ব্যর্থ; কিন্তু কোথাও গিয়ে সে যেন তা মানতে চায়নি। আর এতেই বিপত্তি। স্ত্রী ক্ষিরি সে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। চালের লাইনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে কিন্তু চাল না-পেলে তার দোষ কোথায়! খিদের জ্বালার কাছে এই বাস্তবটাও মানুষ মানতে পারেনি। যেমনভাবে এ দৃশ্যে সতীশ মানতে পারেনি। আগের রাত্তিরে যে মানুষটা চাল ধার করে খিদে মেটায় সেই মানুষটাই সকালে উঠে কারখানায় যাওয়ার আগে খাবার চায়। সতীশের স্ত্রী ক্ষিরি এতেই বেজায় চটে যায় এবং দু-চার কথা শুনিয়ে দেয়। এতেই সতীশের পৌরুষত্বে আঘাত লাগে এবং ক্ষিরিকে তার কথার ট্যাকট্যাকানির জন্য যোগ্য সাজা দেবার কথা বলে। এ কথা শুনে ক্ষিরি উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং প্রতিবেশী কেলোর বাবার কথা তুলে ভর্ৎসনা করে এবং উক্ত কথাগুলি বলে।
৮। হরেকৃষ্ণ ও মনোরমার চরিত্র আলোচনা করো।
বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটকের কাহিনির দিকে যদি লক্ষ করি তবে সেখানে পাঁচটি দৃশ্য লক্ষ করা যায়। চতুর্থ দৃশ্যে নাট্যকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছবি তুলে ধরেছেন। দুজনের পরিবার সেটি। একজন কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু ও অন্যজন তার স্ত্রী মনোরমা। প্রথম তিনটি দৃশ্যে যে তিনটি পরিবারের ছবি আমরা দেখেছি তার থেকে একটু আলাদা হরেকৃষ্ণবাবু ও মনোরমা দেবীর সংসার। সেখানেও খাদ্যসংকটের ছবি আছে কিন্তু অভাব-অনটনের জেরে অশান্তির ছবি ধরা পড়েনি।
হরেকৃষ্ণবাবুর ঈশ্বরে সম্পূর্ণ আস্থা না-থাকলেও মনোরমা দেবীর তা সম্পূর্ণরূপে আছে, তাই তো চালের লাইনে দাঁড়াতে যাওয়ার আগে মনোরমা – দেবী হরেকৃষ্ণবাবুকে ঠাকুর নমস্কারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নির্বিবাদী – হরেকৃষ্ণবাবু মনে না-নিলেও স্ত্রীর আদেশ মেনে ঠাকুর প্রণাম করেন। তবে তাতে যে খুব সুবিধা হবে সে-কথা তিনি মেনে নেননি। মনোরমা দেবী সুযোগসন্ধানী এবং কিছুটা স্বার্থান্বেষীও বলা চলে। ভোঁদার কাছে চাল দেওয়ার খবর শোনা কিংবা সিভিক গার্ডকে বলে কয়ে কিছু চিনি জোগাড় করার কথার মধ্যেই তা স্পষ্ট। হরেকৃষ্ণবাবু অফিসের অনিয়ম-বেনিয়ম দেখেও কিন্তু কোনো কিছু ব্যাপারেই মুখ খোলেনি-শুধুমাত্র দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া অন্যকিছু তার মধ্যে দেখা যায়নি। মধ্যম যে সবসময় তফাতে চলে তা হরেকৃষ্ণবাবুর আচার আচরণের মধ্যে পঞ্চম দৃশ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পঞ্চম দৃশ্যে আমরা হরেকৃষ্ণবাবুর ‘মুভমেন্ট’ দেখেছি কিন্তু সেভাবে অ্যাকসন ধরা পড়েনি। তবে শেষে সমবেত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও হরেকৃষ্ণবাবু ছিলেন মাথা নাড়ার দলে। এককথায় হরেকৃষ্ণবাবুর মধ্যে অন্যায়ে প্রতিবাদ করার মতো তীব্র ক্ষমতা চোখে পড়েনি। লেখক হরেকৃষ্ণ ও মনোরমা দেবীকে প্রকৃত মধ্যবিত্ত বাঙালি রূপে গড়ে তুলেছেন।
৯। ‘যে রক্ষক সেই হল গিয়ে তোমার ভক্ষক।’-বক্তা কোন্ প্রসঙ্গে এমন কথা বলেছেন? বক্তার এই উক্তির মধ্য দিয়ে সেই সময়কার – কোন্ বাস্তবতা ফুটে উঠেছে? ২+৩=৫
গণনাট্য আন্দোলনের পথিকৃৎ ও ‘নবান্ন’ নাটকের স্রষ্টা বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হলেন চতুর্থ দৃশ্যে উল্লেখিত কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু। কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু যখন তার স্ত্রী মনোরমা দেবীর প্রশ্নের মুখে পড়ে- “অফিস থেকে বাবুদের সব দেওয়া থোওয়ার ব্যবস্থা হবে, তার কী হল!” সে-কথা শুনে বিরক্ত হয়ে অফিসের কেলেঙ্কারির কথা বলতে গিয়ে বক্তা এমন উক্তিটি করেছেন।
• নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটকের মূল বিষয় হল-পঞ্চাশের মন্বন্তরের কিছু আগেই একশ্রেণির কালোবাজারি ও মজুতদারের খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম খাদ্যাভাব সৃষ্টি করা। সেজন্য সামাজিক সংকট তৈরি ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের দুর্ভোগ। নাটকের মূল বিষয় যে কাহিনির সর্বাংশে সংক্রমিত হবে এটাই স্বাভাবিক। চতুর্থ দৃশ্যে কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু যখন খাদ্যসংগ্রহের জন্য এক তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে লড়াই চালাচ্ছে, তখন তার স্ত্রী মনোরমা অফিস থেকে চাল-ডাল দেওয়ার প্রসঙ্গ তোলে। তখনই একরাশ বিরক্তি সহকারে হরেকৃষ্ণবাবু তার স্ত্রীর কাছে অফিসের কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ তোলে। তার কথায় বাবুদের নামে সস্তা দরে চাল-ডাল এনে কালোবাজারে তা চড়া দামে বিক্রি করে ম্যানেজার ও তার মোসাহেবরা বেআইনিভাবে অর্থ লুঠছে আর সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা যাচ্ছে অফিসের লোকজনরা সস্তা দরে চাল-ডাল পাচ্ছে। কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু সব জেনে শুনেও ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। তাই আক্ষেপের সুরে তাকে বলতে শোনা যায়-“যে রক্ষক সেই হল গিয়ে তোমার ভক্ষক।” বক্তার উক্তির মধ্য দিয়ে সেই সময়ে কালোবাজারি যে সমাজে জাঁকিয়ে বসেছিল, তার বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে।
১০। ‘সুবিধে হবে বলে মনে করছ, আচ্ছা।’-কে, কাকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলেছে? বক্তার উক্তির মধ্যে যে সন্দেহ ফুটে উঠেছে তা ব্যাখ্যা করো। ২+৩=৫
প্রখ্যাত নট ও নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম একাঙ্ক নাটক ‘আগুন’ (১৯৪৩) থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হল চতুর্থ দৃশ্যের অন্যতম চরিত্র কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু। হরেকৃষ্ণবাবু তার যোগ্য সহধর্মিনী মনোরমা দেবীকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলেছে।
• পঞ্চাশের মন্বন্তর ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একশ্রেণির কালোবাজারি ও মজুতদারদের অপরিমেয় লোভজনিত কারণে বাংলায় দেখা দেয় ভয়াবহ খাদ্যাভাব। যার প্রভাব পড়েছিল সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত পরিবারে। দু-বেলা দু-মুঠো অন্নসংস্থান করতে গিয়ে সকলেই প্রায় দিশেহারা। চেনা শত্রুর চেয়ে অচেনা শত্রু যে আরও ভয়ংকর তা যেন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল খাদ্যসংকটের দিনগুলিতে। মজুতদার ও কালোবাজারিরা আড়ালে থেকে খাদ্যসংকট সৃষ্টি করে যেভাবে সমাজকে শোষণ করে যাচ্ছিল তা ছিল ভয়ংকর। চতুর্থ দৃশ্যে মধ্যবিত্ত কেরানি হরেকৃষ্ণবাবুও স্বামী-স্ত্রী দুজনের অন্নসংস্থান করতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছিলেন। অফিস থেকে চাল-ডাল দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানেও যে একটা অস্বচ্ছতা চলছে তা জেনেও প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি। এমনই একদিন আর পাঁচজনের মতো চালের লাইনে দাঁড়ানোর জন্য বাড়ি থেকে বেরুবার কথা বলে। সেই কথার প্রেক্ষিতে সমস্যাদীর্ণ মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হরেকৃষ্ণবাবু একপ্রকার অনাস্থা প্রকাশ করে ঈশ্বরের প্রতি; যা তার- “সুবিধে হবে বলে মনে করছ, আচ্ছা।” এই উক্তিতেই প্রকাশিত। ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাসী মধ্যবিত্তের এই উক্তির মধ্যে সামাজিক সংকটের কালে দেবতাও যে অসহায় সেই সন্দেহই ফুটে উঠেছে।
১১। সিভিক গার্ডের চরিত্র আলোচনা করো।
নট, নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন গণনাট্য সংঘের অন্যতম সদস্য।
তাঁর ‘আগুন’ নাটকের কাহিনির দিকে লক্ষ করলে সেখানে পাঁচটি দৃশ্য লক্ষ করা যায়। প্রথম চারটি দৃশ্যে বিভিন্ন শ্রেণির চারটি পরিবারের একই সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে, তা হল চাল, চালের আকাল। পঞ্চম দৃশ্যটি হল নাটকের পরিণতি দৃশ্য। এই দৃশ্যে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে নানান সমস্যা-তা কখনও নিজেদের মধ্যে, কখনও-বা পুলিশের অযথা খবরদারি কিংবা দোকানদারের অপমানজনক মন্তব্যজনিত গণ্ডগোল। এই দৃশ্যেই আমরা সিভিক গার্ডকে অবতীর্ণ হতে দেখি স্বমহিমায়। কাউকে তোয়াক্কা না-করেই সে তার আচরণের মাধ্যমে বারবার মন্বন্তর কবলিত মানুষগুলিকে অকারণে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে এবং আইনের ভয়ও দেখাতে শুরু করে। তার চরিত্রের সবচেয়ে বড়ো কলঙ্ক হল চালের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে যারা তার চেয়ে বয়সে অনেকটাই বড়ো তাদের যথেচ্ছভাবে অপমান করা। বিশেষ করে প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ পুরুষের ওপর সিভিক গার্ড বেশি নির্দয় ছিল। তাদের কাউকে টাকার চেঞ্জ না-আনার জন্য ভর্ৎসনা করছিল, কখনও-বা কেউ লাইন থেকে বিশেষ কারণে বাইরে বেরুলে তার ওপর মেজাজ দেখাচ্ছিল। এমনকি চতুর্থ পুরুষকে প্রকারান্তে কুকুর সম্বোধন করার মধ্য দিয়ে তার নীচ মানসিকতা প্রকাশ পায়। তবে চতুর্থ পুরুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করায় এবং তাকে সকলে সমর্থন করায় সিভিক গার্ড পিছু হঠতে বাধ্য হয়। * আসলে কথায় আছে-‘শক্তের ভক্ত নরমের যম।’ প্রতিরোধের মুখে পড়ে সিভিক গার্ড ও দোকানদার ভীষণভাবে ভয় পায় ও পিছু হঠে। সিভিক গার্ড এখানে আইনের পোশাক পরে শোষকের ছায়ামূর্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
১২। ‘ছি, ছি, এসব কী অত্যাচার।’-এই উক্তির আলোকে অত্যাচারীর অত্যাচার সম্পর্কে আলোচনা করো।
বাংলায় গণনাট্য আন্দোলনের স্রষ্টা বিজন ভট্টাচার্যের অন্যতম পরীক্ষামূলক নাটক ‘আগুন’ থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হল পঞ্চম দৃশ্যের অন্যতম প্রতিবাদী মুখ তৃতীয় পুরুষ।
নাটকের পঞ্চম দৃশ্যের অন্যতম প্রধান চরিত্র সিভিক গার্ড। তার কাজ ছিল মূলত দোকানে চালের জন্য দেওয়া লাইন ঠিক করা এবং মানুষের সুবিধা অসুবিধা দেখা, কিন্তু তার মুখে প্রথমেই শোনা যায় দোকানদারের কথার প্রতিধ্বনি, “খুচরো না হলে চাল পাওয়া যাবে না।” তা ছাড়া দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় পুরুষ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে বেরুতে তাকে হাজারো কৈফিয়ত দিতে হয় এবং অপমানিত হতে হয়। আবার ঠিক সেইসময় বয়সে বেশকিছুটা বড়ো চতুর্থ পুরুষ (দুঃস্থ প্রকৃতির)-কে লাইন থেকে সামান্য বিচ্যুত হওয়ার কারণে সরাসরি গিয়ে গালে চপেটাঘাত করে এবং লাইন থেকে বের করে দেয়। সম্মিলিতভাবে তৃতীয় পুরুষ ও জনৈক মুসলিম ভাই ঘটনাটির প্রতিবাদ করে এবং সিভিক গার্ডের কাছে চপেটাঘাতের প্রকৃত কারণ জানাতে বলে। তখনও তার মধ্যে দেখা যায় মিথ্যা ঔদ্ধত্য ও আইনের অজুহাত। আসলে তৎকালীন সময়ে কালোবাজারি ও মজুতদারেরা সমাজে যে কৃত্রিম অভাব তৈরি করেছিল এবং মানুষ দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল তাতে শাসকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদত ছিল। আর শাসনযন্ত্রের সদস্য হয়ে সিভিক গার্ড সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করে কোথাও যেন শাসকের হাতই শক্ত করছিল। তবে তৃতীয় পুরুষের লাগাতার প্রতিবাদ দেখে চতুর্থ পুরুষের মধ্যে সাহস সঞ্চারিত হয় এবং চতুর্থ পুরুষও প্রতিবাদ করতে থাকে। সেইসময় সিভিক গার্ড চতুর্থ পুরুষকে মারতে উদ্যত হলে সে প্রতিরোধ করে এবং তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সমবেত আকার ধারণ করতেই সিভিক গার্ড পিছু হটে।
১৩। ‘থাক, তোকে আর দালালি করতে হবে না। যা ভাগ ভাগ-কে, কার উদ্দেশে এমন উক্তি করেছে? প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বক্তার চরিত্র আলোচনা করো। ২+৩=৫
গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম সদস্য বিজন ভট্টাচার্যের তদানীন্তন সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে লেখা পরীক্ষামূলক ক্ষুদ্রতম নাটিকা ‘আগুন’ থেকে গৃহীত উদ্ধৃত অংশটির বক্তা সিভিক গার্ড। নাটকের পঞ্চম দৃশ্যে সিভিক গার্ড চতুর্থ পুরুষকে উদ্দেশ্য করে এই অশোভন উক্তিটি করেছে।
• নাটকের পঞ্চম দৃশ্যে চালের লাইনে দাঁড়ানো মানুষগুলোর নিজেদের মধ্যে সমস্যা তো হচ্ছিলই, কিন্তু সে সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে সিভিক গার্ডের লাইনে দাঁড়ানো গরীব মানুষগুলোর উপর অন্যায় অত্যাচার। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় পুরুষ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে লাইন ছাড়ায় তাকে যেমন সিভিক গার্ড লাঞ্ছিত করেছে, ঠিক একইভাবে চতুর্থ পুরুষ লাইনে থাকাকালীন সামান্য নড়াচড়াজনিত কারণে তাকে গার্ড অন্যায়ভাবে গালে চপেটাঘাত করেছে। এসব দেখে তৃতীয় পুরুষ সিভিক গার্ডের সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ে। এইসময় আপাত নিরীহ মধ্যবিত্ত হরেকৃষ্ণবাবু চতুর্থ পুরুষকে লাইনের শেষে দাঁড়াতে বলে। এতে তৃতীয় পুরুষ ক্ষিপ্ত হয়ে হরেকৃষ্ণের সাথে বচসায় জড়িয়ে পড়ে। সিভিক গার্ড সেইসময় প্রথমে তৃতীয় পুরুষকে চুপ থাকার পরামর্শ দেয় কিন্তু চতুর্থ পুরুষ তৃতীয় পুরুষের বক্তব্যকে সমর্থন করতে এগিয়ে আসে। সেই সময়ই সিভিক গার্ড চতুর্থ পুরুষকে উদ্দেশ্য করে উক্ত কটূক্তিগুলি করে বসে। পঞ্চম দৃশ্যে আমরা সিভিক গার্ডকে কর্তব্য করার অজুহাতে অত্যাচার, ঔদ্ধত্য ও অমানবিক আচরণ করতে দেখি, যা ছিল একজন আইনশৃঙ্খলাকারীর পক্ষে অশোভন ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাকে দেখে বারবার মনে হয়েছে অলক্ষে থাকা কোনো অশুভ শক্তির নির্দেশে সে এই আচরণ করছিল। তবে সম্মিলিত প্রতিরোধ বা প্রতিবাদের মুখে পড়ে সে শেষপর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
১৪। ‘চাল দেবে না দিও না; কিন্তু তাই বলে যা তা বোলো না বলছি।’-প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বক্তার এমন কথা কীসের ইঙ্গিত বহন করে তা নাটক অনুসারে লেখো।
ফ্যাসিস্ট-বিরোধী লেখক ও গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ববিশিষ্ট নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃত অংশটির বস্তা হল পঞ্চম দৃশ্যে উল্লেখিত চতুর্থ পুরুষ।
নাটকে উল্লেখিত পঞ্চম দৃশ্যে সিভিক গার্ড অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে লাইনে দাঁড়ানো মানুষগুলোর সাথে উদ্ধত আচরণ করছিল। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়ানো চতুর্থ পুরুষ যখন সামান্য নড়াচড়া করছিল ঠিক তখনই তার কাছে সিভিক গার্ড সন্দেহবশত ছুটে আসে এবং গালে চড় মারে ও লাইন থেকে বের করে দেয়। কাচুমাচু মুখে সে প্রকৃত সত্যটা বলতে চায় এবং নিজের অভুক্ততার কথা বলে লাইনে দাঁড়াতে দেওয়ার আবেদন জানাতে থাকে বারেবারে। তার কথায় সিভিক গার্ড কোনোরূপ পাত্তা না-দিয়ে ভর্ৎসনা করতে থাকে। চতুর্থ পুরুষ আঘাত পেতে পেতে ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে, কিছু বলতে গেলে ভাগ্ ভাগ্ বলে সিভিক গার্ড তাকে তাড়িয়ে দিতে থাকে। এই সময়ই চতুর্থ পুরুষকে সিভিক গার্ড অমানুষ বলে অপমানিত করে। সেই অপমানের প্রত্যুত্তরেই চতুর্থ পুরুষ ক্রোধে উক্ত কথাগুলি বলতে থাকে।
‘আগুন’ নাটকের পঞ্চম দৃশ্য যে পরিণতির দৃশ্য তা চতুর্থ পুরুষের প্রতিবাদের ভাষা শুনেই বোঝা গিয়েছিল। এই প্রতিবাদের ভাষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে লাইনে থাকা অন্যান্যরাও একজোটে অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সমর্থ হয়েছিল। জনতার জাগরণ দেখে সিভিক গার্ড ও দোকানদার কিছুটা হলেও সমঝে গিয়েছিল।
১৫। ‘আলবাৎ, জানোয়ার কাঁহাকা’-বক্তার এমন উক্তির পিছনে যে কারণ তা নাট্যকাহিনি অবলম্বনে আলোচনা করো।
বাংলা নাট্যজগতে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের কেতন ওড়ানো নাট্যকার ও ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটক থেকে উদ্ধৃতাংশটি গৃহীত হয়েছে। এখানে বক্তা হল চালের লাইনে দাঁড়ানো চতুর্থ পুরুষ।
‘আগুন’ নাটকে আমরা প্রথম চারটি দৃশ্যে প্রত্যক্ষ করি সমাজের খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি-প্রত্যেকের সমস্যা একই। মন্বন্তর ও যুদ্ধোত্তরকালে তাদের সমস্যার মূলে ছিল চাল, চালের আকাল। উদরপূর্তির চালের জন্য তারা যেভাবে তীব্র অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে প্রতিদিন লাইনে দাঁড়াতো তা ছিল এককথায় ভীষণ দুর্বিষহ ব্যাপার। শুধু তাই নয় সেখানে গিয়ে জুটত তীব্র অপমান, এমনকি মারধোরও। চালের লাইনে
দাঁড়ানো লোকগুলির কাছে বিভীষিকা ছিল সিভিক গার্ড। তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচার আচরণ সকলকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল এবং অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে জমছিল প্রচণ্ড রাগ। তাই দ্বিতীয় পুরুষ লাইন থেকে বাইরে বেরোনোর পর তাকে যৎপরোনাস্তি অপমান করতে থাকে এবং অন্যদিকে চতুর্থ পুরুষ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন সময়েই সিভিক গার্ড তাকে চপেটাঘাত করে এবং লাইন থেকে বের করে দেয়। অসহায় অবস্থায় নিজের দুর্দশার কথা বারবার বলে সিভিক গার্ডকে অনুরোধ করে লাইনে দাঁড়াতে দেওয়ার জন্য। সিভিক গার্ড তার কোনো কথাতেই কর্ণপাত না-করে তাকে কুকুরের সাথে তুলনা করে। আর এতেই চতুর্থ ব্যক্তি প্রতিরোধ প্রতিবাদের পথে হেঁটে চোখে চোখ রেখে সিভিক গার্ডের উদ্দেশ্যে উদ্ধৃত উক্তি করে।
১৬। ‘আগুন! আগুন জ্বলছে আমাদের পেটে।’-বক্তার এই উক্তির ব্যাখ্যা করো।
গণনাট্য আন্দোলনের পুরোধা এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হল পঞ্চম দৃশ্যে উল্লেখিত জনৈক যুবক।
বিজন ভট্টাচার্য তাঁর ‘আগুন’ নাটকে প্রথম চারটি খণ্ডদৃশ্যের মধ্য দিয়ে মন্বন্তর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়ে সৃষ্ট সংকটময় সামাজিক পরিস্থিতির এক কোলাজ চিত্র দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। পঞ্চম দৃশ্যে অর্থাৎ পরিণতি দৃশ্যে লক্ষ করা যায় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ তাদের ভয়কে একটু একটু করে দূরে সরিয়ে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে সংঘবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করতে শিখছে। এই দৃশ্যে সিভিক গার্ড তার ক্ষমতার বলে দ্বিতীয় পুরুষকে লাইন থেকে বের করে দিতে উদ্যত হয় এবং একইভাবে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা চতুর্থ পুরুষকে বাইরে থেকে এসে লাইনে দাঁড়ানোর অভিযোগে চপেটাঘাত করে। প্রথমে চতুর্থ পুরুষ অনুনয়-বিনয় করে লাইনে ঢুকতে চায় কিন্তু সিভিক গার্ড কোনোমতেই তাতে কর্ণপাত করেনি। বরং উলটে তাকে কুকুরের সাথে তুলনা করে এবং তাতেই চতুর্থ পুরুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং সিভিক গার্ডকে জানোয়ার সম্বোধন করে। এইরকম উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হতে হতেই চতুর্থ পুরুষ ও সিভিক গার্ড হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে এবং তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের গর্জন ওঠে। এই সময়ই নাটকে বিবেক চরিত্রের মতো এক যুবক চেঁচিয়ে ওঠে- “আগুন, আগুন!” সকলেই অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে কোথায়? সিভিক গার্ডও বিস্মিত হয়ে বলে-“আগুন! আগুন কিসের!” যুবক তখন প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি করে। আসলে যুবকের এই কথার মধ্যে বিশেষ এক ব্যঞ্জনা লুকিয়ে আছে। সকলেই যখন ক্ষুধার আগুনে পুড়ছে তখন নিজেদের এই অন্তর্কলহকে ব্যঙ্গ করেই যুবকের এমন উক্তি।
১৭। ‘… বাব্বা! লুঙ্গি, টিকি, পৈতে, টুপি সব একাকার হয়ে গেছে।’-বক্তার এমন উক্তির মধ্য দিয়ে কোন্ ইঙ্গিত পাওয়া যায় তা লেখো।
ফ্যাসিস্ট-বিরোধী ও বাংলা নাট্য জগতে প্রতিরোধের বার্তাবাহক হিসেবে পরিচিত নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃত অংশটির বক্তা পঞ্চম দৃশ্যে উল্লেখিত দোকানি।
‘আগুন’ নাটকে নাট্যকার প্রথম চারটি খন্ডদৃশ্যের মধ্য দিয়ে পঞ্চাশের মন্বন্তর ও যুদ্ধকালীন খাদ্যসমস্যার সংকটময় মুহূর্তগুলি দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। পঞ্চম বা পরিণতি দৃশ্যে কেরানি, ওড়িয়া, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পুরুষ এবং জনৈক যুবক ও মুসলমান ভাই সমেত বিভেদ দূরে সরিয়ে রেখে একসাথে হয়ে বাঁচার একটা তাগিদ অনুভব করে। পাশাপাশি লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে সামান্য গোল-গণ্ডগোল হলেও তা ছিল সাময়িক। সিভিক গার্ড দ্বিতীয় ও চতুর্থ পুরুষকে যেভাবে অপমান ও মারধোর করেছে তা দেখে লাইনে দাঁড়ানো প্রায় সকলেই একযোগে প্রতিবাদে মুখর হয়েছে। আসলে মানুষের যখন অত্যাচারিত হতে হতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় সে তখন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়। অন্তত ইতিহাস সেটাই বলে। এখানেও ইতিহাসের এতটুকু ব্যতিক্রম হয়নি। মজুতদার, কালোবাজারি, অত্যাচারী শোষকের প্রতিনিধিস্থানীয় সিভিক গার্ড ও দোকানদার এই প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের আঁচ অনুভব করে। তাই সিভিক গার্ডও নাটকের শেষের দিকে মিলিয়ে যায় জনঅরণ্যে আর দোকানদারও। এই প্রতিরোধের তাপ অনুভব করে চাকর পঞ্চাকে উদ্দেশ্য করে তাৎপর্যপূর্ণ উদ্ধৃত উক্তিটি করেছে।
১৮। ‘হাতি যখন নোদে পড়ে চামচিকে তায় লাথি মারে; তা আমারও হয়েছে সেই দশা।’-বক্তা কেন এমন আক্ষেপ করেছে?
গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা ও ফ্যাসিবাদ-বিরোধী নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হল পঞ্চম দৃশ্যে উল্লিখিত চালের দোকানদার।
আগুন নাটকের প্রথম চারটি দৃশ্যতে লেখক সংকটের কথা উল্লেখ করে পঞ্চম দৃশ্যে নাটকে তার পরিণতি দেখিয়েছেন। প্রথম দিকে সাধারণ মানুষের জীবনের সংকট ও তা থেকে মানুষ যে চরম শিক্ষা পেয়েছে তার প্রতিবাদ যেন পঞ্চম দৃশ্যে ধ্বনিত হয়েছে। সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ যে-কোনো শক্তিকে যে পিছু হটতে বাধ্য করে, তা আমরা এই নাটকের পঞ্চম দৃশ্যে বেশ ভালো করেই প্রত্যক্ষ করেছি। মন্বন্তর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতিতে একশ্রেণির মানুষ যে সাধারণ মানুষকে শোষণ করে চলেছিল সে-কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই শোষণকার্যের অন্যতম দুই সহায়ক সিভিক গার্ড ও চালের দোকানদার। অত্যাচারিত মানুষগুলো ক্রমাগত অত্যাচারিত হতে থাকতে থাকতে যখন তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন তারা প্রতিরোধের ও প্রতিবাদের পথ বেছে নেয়; সেটাই কালের নিয়ম। পঞ্চম দৃশ্যে সিভিক গার্ডের ক্রমাগত অত্যাচারে নাটকে উল্লেখিত সমস্ত শ্রেণির মানুষই একজোট হয়ে প্রতিবাদ করতে থাকে। এতেই দোকানদার ভয় পেয়ে যায় এবং দারোগাও পিছু হটে। তখনই দোকানদার বাংলার পরিচিত প্রবাদ “হাতি যখন পাঁকে পড়ে তখন চামচিকেতেও লাথি মারে” বলে নিজেদের প্রকৃত অবস্থার মূল্যায়ন করে।
১৯। ‘… কিন্তু ওর ওই সোজা কথাটা আমরা আজও অনেকেই বুঝি না।’-বক্তা কার, কোন্ ‘কথা’-র কথা বলেছে? কথাটি কীভাবে সকলকে সংগঠিত করেছিল তা লেখো। ২+৩=৫
বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হলেন প্রথম পুরুষ। বক্তা প্রথম পুরুষ ওড়িয়ার কথা প্রসঙ্গে এমন কথা বলেছেন। দোকানদার যখন স্বগতোক্তির ঢঙে বলতে থাকে- “বাব্বা! লুঙ্গি, টিকি, পৈতে, টুপি সব একাকার হয়ে গেছে। আর কি উপায় আছে। ব্যবসার সুখ এই গেল।” দোকানদারের এই কথা শুনে কোঁচড়ে চাল বাঁধতে বাঁধতে সহাস্য মুখে ওড়িয়া দোকানদারের উদ্দেশ্যে বলে যে হিন্দু, মুসলমান, এমনকি সাহেবরাও চাল খায় অর্থাৎ চাল সবারই প্রয়োজন। আর সেই কারণেই তোমার বাণিজ্য কেমনে চলবে অর্থাৎ ওড়িয়া ব্যক্তি কোথাও যেন দোকানদারের কালোবাজারির প্রতি ইঙ্গিত করে।
• ওড়িয়া দোকানদারের উদ্দেশ্যে প্রকৃত সত্যটা বলে লাইনে দাঁড়ানো অন্যান্যদের মন জয় করে নয়। মধ্যবিত্ত কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু প্রথম এসে তাকে ধন্যবাদ জানায়। তারপরেই প্রথম পুরুষ এসে ওড়িয়ার সাহস করে সোজা কথা বলার প্রশংসা করে। ওড়িয়ার এই সহজ কথা সকলকে যেন একসূত্রে বাঁধতে সাহায্য করে। তাই কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু চতুর্থ পুরুষের কাছে এসে নিজের বলা কথার জন্য অনুতাপ প্রকাশ করে। চতুর্থ পুরুষও আন্তরিকতার সাথে কিছু মনে না-করার কথা বলে। ইতিমধ্যে তৃতীয় পুরুষ নিজেদের মধ্যে সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কথাকে উড়িয়ে বলতে থাকে বাঁচতে হলে সকলকে মিলেমিশে থাকতে হবে। কেরানি হরেকৃষ্ণ তাতে সম্মতি প্রদান করলে তৃতীয় পুরুষ বলে, তা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এভাবেই মন্বন্তর বিধ্বস্ত লোকগুলি একত্রিত হয়েছিল।
২০। ‘যথেষ্ট তো হয়েছে। এখন বাঁচতে হবে। বাঁচতে হলে মিলিমিশে থাকতে হবে ব্যাস্।’-বক্তা কোন্ প্রসঙ্গে কেন এমন উক্তি করেছে? ৩+২=৫
বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম প্রথিতযশা নাট্যব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম নাটক ‘আগুন’ থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হলেন তৃতীয় পুরুষ। দোকানদারের বিদ্রূপাত্মক উক্তির প্রত্যুত্তরে ওড়িয়া যখন যোগ্য জবাব দেয় তখন দোকানদার একটু অবাকই হয়ে যায়; কারণ ওইরকম উত্তরের জন্য দোকানদার প্রস্তুত ছিল না। তাই দোকানদার অপমানজনক বা সাবধানবাণী শুনে আক্ষেপের সুরে বলেন-হাতি পাঁকে পড়লে চামচিকেতেও লাথি মারে। দোকানদারের প্রতি ওড়িয়ার করা মন্তব্য শুনে মধ্যবিত্ত কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু তাতে সহমত পোষণ করে এবং সাথে সাথে প্রথম পুরুষও সে-কথাকে সমর্থন করে। চাল সম্পর্কে দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে ওড়িয়ার করা মন্তব্যগুলি কোথায় যেন ছন্নছাড়া মানুষগুলিকে একসূত্রে বেঁধে ফেলে। এইসময় ক্ষুধাক্লিষ্ট মানুষগুলি আত্মসমালোচনায় ব্যস্ত হয় এবং পারস্পরিক ভুলবোঝাবুঝির জায়গা থেকে ঐক্যমত্যে পৌঁছোয়। যখন তারা নিজেদের মধ্যে এমন আলোচনায় মশগুল তখন তৃতীয় পুরুষ সকলের উদ্দেশ্যে প্রশ্নোদ্ভূত মন্তব্যটি করে বসে।
• ‘আগুন’ নাটকের পঞ্চম দৃশ্য হল পরিণতির। দুর্দশাগ্রস্ত মানুষগুলি একতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যেন শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য উন্মুখ হয়েছিল। চতুর্থ পুরুষ ও ওড়িয়া যেন সেই লড়াইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছিল। নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের নাটক লেখার জন্য উদ্গ্রীব হয়েছিলেন ‘আগুন’ নাটকটি ছিল তার প্রথম সোপান।
২১। বাংলা গণনাট্য আন্দোলনের প্রথম ফসল ‘আগুন’- এ সম্পর্কে আলোচনা করো।
১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে সর্বভারতীয় গণনাট্য সংঘ প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলা গণনাট্য সংঘ তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বিজন ভট্টাচার্য এই গণনাট্য সংঘের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহেই প্রথম লেখেন ছোটো নাটক ‘আগুন’ এবং নাটকটি ওই বছরেই গণনাট্য সংঘের প্রযোজনায় অভিনীত হয়। নাটকের মধ্য দিয়ে যে শ্রেণিসচেতন সমাজবিশ্লেষণ এবং প্রতিবাদ ও সংগ্রামের জেহাদ ভারতীয় গণনাট্য সংঘ করতে চেয়েছিল, বিজন ভট্টাচার্য তারই ভাবনায় উদ্দীপ্ত হয়ে নাট্যরচনার জন্য কলম ধরলেন।
গণনাট্যের প্রথম প্রয়াস ‘আগুন’। মোট পাঁচটি দৃশ্য। প্রথমটিতে সাধারণ সবজি বিক্রেতা পরিবার, দ্বিতীয় দৃশ্যে কৃষক পরিবার, তৃতীয় দৃশ্যে কারখানার শ্রমিক পরিবার এবং চতুর্থ দৃশ্যে কেরানি হরেকৃষ্ণবাবুর মধ্যবিত্ত পরিবার। বিভিন্ন শ্রেণির চারটি পরিবারের সমস্যা এক-চাল, চালের আকাল। পঞ্চাশের মন্বন্তরের কিছু আগেই খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম খাদ্যাভাব সৃষ্টির বিষয়টি ও তার সমস্যা নিয়ে এ নাটকে এসে হাজির হয়। চারটি খণ্ডদৃশ্যের মধ্য দিয়ে বিজন ভট্টাচার্য সমস্যার সংকটময় রূপটি দর্শকের সামনে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছেন। পঞ্চম বা পরিণতির দৃশ্যে আরও বহুর সঙ্গে চালের লাইনে দাঁড়িয়ে বহুবিধ সমস্যা, অপমান, পুলিশের অযথা খবরদারি, দোকানির অপমানজনক মন্তব্য ইত্যাদির পাশাপাশি লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে নিজেদের মধ্যে মৃদু গোলমাল এবং একে অপরের হয়ে কথা বলায়, কিছুটা প্রতিবাদী হয়ে ওঠায় পুলিশ এবং দোকানি দুই পক্ষই কিছুটা নরম হয় এবং সকলেই চাল পেয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারে। সকলেই বুঝতে পারে- “এক না হলে চলবে না।” এই উপলব্ধিই ছোটো কল্পনাটক ‘আগুন’ নাটকের প্রধান প্রাপ্তি। ‘বাঁচতে হলে জোট বাঁধতে হবে।’-যা গণনাট্য আন্দোলনের মূল লক্ষ্যকেই সমর্থন করে।
২২। আগুন’ নাটকের সংলাপ রচনা সম্পর্কে আলোচনা করো।
নাটকের ক্ষেত্রে সংলাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নাট্যকাহিনি পরিবেশনে নাট্যকারের প্রধান অবলম্বন সংলাপ। সংলাপের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে নাটকের পাত্রপাত্রীর চরিত্রবৈশিষ্ট্য। সংলাপ চরিত্রোপযোগী না-হলে নাটক নিষ্প্রাণ হয়ে ওঠে। এই কারণে সংলাপ রচনার ক্ষেত্রে নাট্যকারকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হয়। নাটকে সংলাপের এই গুরুত্বের কথা মনে রেখে বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটকটিতে নাট্যকারের সংলাপ রচনার দক্ষতার বিষয়টি আলোচনা করা যেতে পারে।
‘আগুন’ নাটকে চরিত্রের সঙ্গে সংলাপকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে নাট্যকার চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেননি। চরিত্র-স্বভাব এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী যে চরিত্রের পক্ষে ঠিক যেরকম কথা বলা স্বাভাবিক; নাট্যকার সেই চরিত্রের মুখে ঠিক সেইরকম কথা বসিয়েছেন। এই নাটকের প্রথম দৃশ্যে সাধারণ সবজি বিক্রেতার পরিবারের কথা ও মন্বন্তরের প্রেক্ষিতে তাদের অবস্থা দেখানো হয়েছে। “… ঐগুলো বিক্রি করে্য শেষ পরে তো নাইনি গে চাল কিনবি।”-সংলাপটির মধ্যে যে উদ্বেগ ধরা পড়েছে তাতে স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে তাদের লড়াইটা কত কঠিন। দ্বিতীয় দৃশ্যে কঠিন সামাজিক অবস্থার মধ্যে মানুষ যে হতাশ হয়েও ভেঙে পড়েনি তা কৃষাণের সংলাপে প্রকাশ পেয়েছে- “আর কটা দিন একটু কষ্ট কর”। তৃতীয় দৃশ্যে সতীশ ও ক্ষিরির সংলাপ অভাবজনিত কারণে পারিবারিক সম্পর্কগুলির যে করুণ অবস্থা হয় তা লক্ষ করা যায়- “দেখে এসোগে, কেলোর বাবা কেলোর মাকে কী হালে রেখেছে। কী আমার পুরুষমানুষ রে!” চতুর্থ দৃশ্যে মধ্যবিত্ত কেরানি ও তার স্ত্রীর কথোপকথনের মধ্যেও তাদের আশা, বিশ্বাস ফুটে উঠেছে-“ওকি, ঠাকুর নমস্কার করে বেরুলে না!” শেষ দৃশ্যে মূলত লেখক কালোবাজারি, শোষণ এবং প্রতিবাদের কথা দেখিয়েছেন। সিভিক গার্ডের “থাক, তোকে আর দালালি করতে হবে না। যা ভাগ ভাগ।” কিংবা “মানুষ নাকি!” উক্তির মধ্যেই সে-কথা ধরা পড়েছে। তা ছাড়া দোকানির উক্তির মধ্যেও বেশ ব্যঙ্গের ছবি ধরা পড়েছে। নাটকের শেষদিকে সামান্য চালের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ঠেলাঠেলি করার কারণে চতুর্থ পুরুষ ও অন্যদের মহাজনের লোকের হাতে মার খেতে হয়, মার খাওয়ার পর “এখন বাঁচতে হবে। বাঁচতে হলে মিলেমিশে থাকতে হবে ব্যাস্।”- এই সংলাপই এ নাটকের – মূল উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ করেছে। সব মিলেয়ে নাট্যকার যে একজন সুদক্ষ • সংলাপ রচয়িতা সে-কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
২৩। ‘আগুন’ নাটকের চতুর্থ দৃশ্যে হরেকৃষ্ণ ও মনোরমার সংলাপের মধ্য দিয়ে যে ছবিটি ফুটে উঠেছে তা নিজের ভাষায় লেখো।
নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য তাঁর ‘আগুন’ নাটকের চতুর্থ দৃশ্যে এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছবি তুলে ধরেছেন। যার কুশীলব হরেকৃষ্ণ ও তার স্ত্রী মনোরমা। রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের ‘মাঝারির সতর্কতা’ কবিতায় কবি বলেছেন “তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে”-এ কথা হরেকৃষ্ণ ও মনোরমার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় সতর্কতা সবচেয়ে বেশি। কারণ তারা মন এবং অর্থ উভয় অর্থেই মধ্যবিত্ত। তারা মহৎ উদার চরিত্রের মতো সহজে ব্যাপ্ত হতে পারে না। আবার মনের দিক থেকেও দেউলিয়াগ্রস্ত, অধম শ্রেণির মানুষদের ভয়ংকর ভেবে তারা দূরে সরিয়ে রাখে। নাট্যকার অত্যন্ত সুচতুরভাবে প্রথম তিনটি দৃশ্যে পারিবারিক অসন্তোষকে বে-আব্রু করে তুলে ধরেছেন এবং চতুর্থ দৃশ্যে চিরাচরিত মধ্যবিত্ত মননকে তুলে ধরেছেন; মনোরমা ও হরেকৃষ্ণর কথোপকথনে যার ইঙ্গিত মিলেছে। অন্তঃপুরবাসী মনোরমা কিন্তু বহির্জগতের সব খবর রাখে। সে ভোঁদার কাছে শোনা দু-সের চাল দেওয়ার কথা হোক কিংবা স্বামীর অফিস থেকে কোনো কিছু দেওয়ার কথাই হোক। তা ছাড়া তার মননে যে সুযোগসন্ধানী সত্তা আছে তা ধরা পড়ে যখন সিভিক গার্ডকে পূর্বেকার মতো চিনির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে। কিছুটা হলেও স্ত্রৈণ হরেকৃষ্ণর মধ্যে প্রতিবাদহীনতা লক্ষ করা যায়। কারণ অফিসের দুর্নীতি দেখেও সে মুখ খোলেনি, শুধুমাত্র গৃহের পরিসরে ‘রক্ষকই ভক্ষক’ ইত্যাদি নীতিকথা আওড়েছে। মনোরমা ও হরেকৃষ্ণর মধ্যে আস্তিকতার যেটুকু পরিচয় পাওয়া যায় তা অবশ্যই স্বার্থসিদ্ধির জন্য। আসলে মনোরমা ও হরেকৃষ্ণরা মধ্যবিত্তের দরজা হাট করে খুলতে পারেনি। এ দৃশ্যে তারা চিরাচরিত মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হয়েই থেকে গেছে। নিজেদেরকে নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখে।
আরও পড়ুন – শিক্ষাশ্রয়ী মনোবিজ্ঞানের অর্থ প্রশ্ন উত্তর