আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় মার্কসীয় তত্ত্বের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় মার্কসীয় তত্ত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি হল-
অর্থনৈতিক উপাদানের প্রাধান্য: মার্কসবাদ ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে বিশ্বব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে অর্থনৈতিক উপাদানই হল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান উপাদান। আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলির মধ্যে যে যুদ্ধ, সংগ্রাম সংঘটিত হয় তার প্রধান কারণ নিহিত রয়েছে অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় রাজনীতি, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক বিধি ইত্যাদি বিদ্যমান থাকলেও তা সবই অসম অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ অসম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হল ভিত্তি (Base) এবং আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি, রাজনীতি হল উপরিকাঠামো (Super Structure)। আন্তর্জাতিক স্তরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নির্ধারণের সময় বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আধিপত্য-অধীনতার সম্পর্কটি (উন্নত দেশগুলি কর্তৃক স্বল্পোন্নত দেশগুলির উপর কর্তৃত্ব স্থাপন) প্রতিফলিত হয়।
আন্তর্জাতিক স্তরে শ্রেণি চরিত্রের গুরুত্ব : মার্কসীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনার মূল উপাদান হল ‘শ্রেণি’। মার্কসবাদীরা রাষ্ট্রের পরিবর্তে শ্রেণিভিত্তিক আলোচনার উপরেই আস্থা রেখেছিলেন। তাঁরা বিশ্বরাজনীতিকে বিশ্লেষণ করেছিলেন শ্রেণিসংগ্রামের আলোকে।
শ্রেণিসংগ্রামের গুরুত্ব: মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বরাজনীতিকে বিশ্লেষণ করে শ্রেণিসংগ্রামের আলোকে। মার্কসবাদীদের মতে, সারা বিশ্ব ‘haves’ এবং ‘have nots’-এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। এর মূলে আছে পুঁজিবাদী বিশ্ব বাজার দখল বা বিস্তারের ছলে দরিদ্র দেশগুলিকে শোষণ করার লোভ। যার প্রকাশ ঘটে বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার অসম বিন্যাসের মধ্যে।
সাম্রাজ্যবাদ ও নয়া সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা: মার্কসবাদ অনুসারে সাম্রাজ্যবাদ ও নয়া সাম্রাজ্যবাদ হল বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক বৈষম্যের মূল কারণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ধনতন্ত্রবাদের প্রসারিত রূপ হল সাম্রাজ্যবাদ, যা সমগ্র পৃথিবীকে সাম্রাজ্য বিস্তারকারী শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং সাম্রাজ্যের অধীন দুর্বল রাষ্ট্রে ভাগ করেছে। ধনতান্ত্রিক দেশগুলির সাম্রাজ্য বা উপনিবেশ বিস্তারের মুখ্য উদ্দেশ্যই হল উৎপাদিত দ্রব্যের বাজার দখল করা তথা বিশ্ব বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করা। ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বাজার দখলকে কেন্দ্র করেই অনেকক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এরই আধুনিক রূপ হল নয়া সাম্রাজ্যবাদ। মার্কসবাদী তত্ত্ব অনুযায়ী সাম্রাজ্য স্থাপন, যুদ্ধ সবকিছুর মূলে আছে আর্থিক শোষণ। তাই মার্কসবাদ যাবতীয় আর্থিক শোষণের অবসান চায়।
জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারে গুরুত্ব: তৃতীয় বিশ্বের অবদমিত জাতিগুলির স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। জোসেফ স্তালিন তার ‘মার্ক্সীজম অ্যান্ড ন্যাশনাল কোয়েশ্চেন’ (Maxism and National Question) রচনায় এবিষয়ে আলোচনা করেছেন। লেনিনও ‘দ্য সোশ্যালিস্ট রেভোলিউশন অ্যান্ড দ্য রাইট অফ নেশনস টু সেলফ ডিটারমিনেশন’ (The Socialist Revolution and the Right of Nations to Self Determination) রচনায় তৃতীয় বিশ্বের অবদমিত জাতিগুলির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন করে বলেছেন যে, এই সংগ্রাম বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শুধু তাই নয় মার্কসবাদীরা মনে করেন, স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ পতনের পর শ্রেণিহীন, রাষ্ট্রহীন সমাজব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে। কারণ এরূপ শ্রেণিহীন, রাষ্ট্রহীন ব্যবস্থায় যুদ্ধের সম্ভাবনা থাকে না।
সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ: ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সম্মেলনে লেনিন জাতীয়তাবাদ ও ঔপনিবেশবাদের প্রশ্নে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ-এর ধারণাটি ব্যক্ত করেছিলেন। যদিও ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে মার্কস লিখিত ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’-তেই শ্রমজীবী শ্রেণির ঐক্য গড়ে তোলার ডাক দিয়েছিলেন। মার্কসবাদী দর্শন অনুসারে, সর্বহারাদের কোনো দেশ নেই, সর্বত্রই এই শ্রেণি শোষিত ও অবদমিত। তাই পুঁজিবাদী শোষণের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে সর্বহারা শ্রেণিকে বিপ্লবের ডাক দিতে হবে। বিশ্ববিপ্লব সম্পাদনের মাধ্যমে শ্রমজীবী শ্রেণির মুক্তি ঘটবে বলে এই তত্ত্বের তাত্ত্বিকরা মনে করেছিলেন।
বিশ্ববিপ্লবে গুরুত্বদান: মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা আন্তর্জাতিক স্তরে শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় বিশ্বাসী ছিলেন না বরং বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন এনে বিশ্বে সমাজতন্ত্রবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই সমাজতন্ত্রবাদই তাদের কাছে আদর্শব্যবস্থা। বিশ্বক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেই রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যুদ্ধ, সংঘাতের অবসান ঘটবে বলে মনে করা হয়।
সমালোচনা
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মার্কসীয় তত্ত্ব নানান দিক থেকে সমালোচিত হয়েছে। সমালোচনাগুলি হল-
অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদ: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মার্কসীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির দ্বারা নির্ধারিত হয়। সমালোচকরা বিশেষত বাস্তববাদীরা এই দাবি মেনে নিতে পারেননি। তাদের যুক্তি হল আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারিত হয় তার জাতীয় স্বার্থের প্রেক্ষিতে। এককভাবে অর্থনীতি কখনোই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যতাকে অস্বীকার: সমালোচকরা এটা যুক্তি দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মার্কসীয় ধারায় যেভাবে কেন্দ্র ও প্রান্তের ধারণা বিশ্লেষণ করা হয়েছে তা অনেক উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনৈতিক বিকাশ সমানভাবে হয়নি। যেমন, এশিয়ান টাইগারস তথা-তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং প্রভৃতি দেশের কথা বলা যায়। সমালোচকরা মনে করেন, এই দেশগুলির অর্থনৈতিক সাফল্যের কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মার্কসীয় ধারায় পাওয়া যায় না। এমনকি মার্কসীয় ধারায় এই বৈচিত্র্যকে স্বীকার করা হয়নি।
মাত্রাতিরিক্ত শ্রেণি ধারণায় প্রাধান্য: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চর্চায় মার্কসীয় ধারা শ্রেণিকে মূল একক হিসেবে অধিক গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে হীন করে দেখেছে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান কারক রাষ্ট্র।
বিশ্বসমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি: মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি যে বিশ্বসমাজতন্ত্র এবং সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। তাই সমালোচকদের মতে শ্রেণিগত দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ব্যাখ্যা করা অবাস্তব। এমনকি এই তত্ত্বের তাত্ত্বিকরা মনে করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধনতন্ত্রের পতনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের জয়যাত্রা সূচিত হবে। কিন্তু বর্তমানে ধনতন্ত্রের অপ্রতিরোধ্য গতি মার্কসীয় ভাবনাকে ভুল ৪ প্রমাণ করেছে। ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ চিন, রাশিয়ার মতো সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিও ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করেছে।
যুদ্ধের কারণ অনুসন্ধানে ব্যর্থ: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মার্কসীয় ধারা রাষ্ট্রগুলির মধ্যে যুদ্ধের কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দায়ী করেছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, যুদ্ধের পিছনে অর্থনৈতিক উপাদানগুলি ছাড়াও ধর্মীয়, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রনেতার আগ্রাসী মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে। মার্কসবাদীরা এগুলিকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে গেছেন।
উপসংহার: উপরিউক্ত সমালোচনা সত্ত্বেও একথা অস্বীকার করার কোনো উপায়ই নেই যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি চিরাচরিত পশ্চিমি বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলের বাইরে বেরিয়ে বিশ্বব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করেছে। বলা যায় এই আলোচনা ধারার হাত ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চর্চায় এক স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে, যার প্রাসঙ্গিকতা আজও হারায়নি। বর্তমান বিশ্বের বৈষম্যমূলক আর্থিক কাঠামোয় আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের শোষক-শোষিত, আধিপত্য-অধীনতার ধারণাটি জ্বলন্ত সত্য। এমতাবস্থায় এই তত্ত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে থাকবে আশা করা যায়।
আরো পড়ুন : একাদশ শ্রেণি দ্বিতীয় সেমিস্টার বাংলা প্রশ্ন উত্তর
আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন প্রশ্ন উত্তর
আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর