রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ, স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগ ও মহাত্মা গান্ধীর অহিংসতা প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন

১। কর্মযোগের আদর্শ কী?
নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমে মোক্ষ লাভই কর্মযোগের অন্তর্নিহিত ভাব বা আদর্শ। মানুষ নিজের মনন, চিন্তন ও নিজ আত্মিক আধার অনুসারে চারটি মার্গের (কর্ম, ভক্তি, যোগ ও জ্ঞান)- আশ্রয়ে জীবন গঠন করে। কর্মযোগ সর্বব্যাপী এবং জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ ও বর্ণ নির্বিশেষে আপামর মানুষের জীবনে গ্রহণীয় ও কার্যকরী। সর্বাবস্থায় জীবনের সকল মুহূর্তে কর্মযোগ তাই জ্ঞান, ভক্তি অথবা রাজযোগ অপেক্ষা অধিকতর ক্রিয়াশীল ও পরিব্যাপ্ত। সকল ধর্ম ও সাধনার শেষ লক্ষ্য হল মুক্তি বা মোক্ষ। নিঃস্বার্থ বা নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে মোক্ষ লাভই কর্মযোগের অন্তনির্হিত ভাব ও আদর্শ।
২। চরিত্রের উপর কর্মের প্রভাব বলতে বিবেকানন্দ কী বুঝিয়েছেন কী?
স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়টি হল ‘চরিত্রের উপর কর্মের প্রভাব’। স্বামীজি ‘চরিত্র’ বলতে বোঝাতে চেয়েছেন সেইসব সংস্কারকে যা আমরা দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা থেকে লাভ করি। অর্থাৎ তাঁর মতে প্রাত্যহিক জীবনের সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে যে ছাপ ফেলে যায় তাই নিয়েই গঠিত হয় আমাদের চরিত্র। বিবেকানন্দের মতে কর্ম মানুষের চরিত্র গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বলতেন, “কর্মের জন্য কর্ম করো”। অর্থাৎ আমাদের কাজ করা উচিত কেবল ফলের প্রত্যাশায়। নয় বরং কাজ করার জন্যই তা করা উচিত। কাজ করার মাধ্যমেই আমরা নিজেদেরকে পরিপূর্ণ করতে। পারি এবং সমাজের জন্য কিছু করে যেতে পারি। কর্মফলের প্রত্যাশা ছাড়া কাজ করার মাধ্যমে আমাদের নিঃস্বার্থ কর্ম করার অভ্যাস গঠিত হয়।
৩। বিবেকানন্দ কেন কর্মযোগের ভাবনায় সত্ত্ব রাজা ও তমো-এইতিন প্রকার গুণের আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন?
স্বামী বিবেকানন্দ কর্মযোগ গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলেছেন প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বড়ো। এই প্রসঙ্গে তিনি মানুষের ত্রিবিধ গুণের কথা বলেন, যে গুণগুলি মানুষের কর্ম ও চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। স্বামীজি মনে করেন। প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সত্ত্ব, রজো ও তমো-এই তিনটি গুণ রয়েছে। সত্ত্ব গুণ হল শুদ্ধতা, জ্ঞান, আলো এবং সাম্যতার প্রতীক। রজো গুণ হল উৎসাহ, কর্ম, শক্তি ও বাসনার প্রতীক। আর তমো গুণ হল অলসতা, অনধকার ও অজ্ঞতার প্রতীক। গুণের তারতম্যের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির প্রকৃতি ও কর্তব্যকর্ম ভিন্ন ভিন্ন হয়। প্রতিটি মানুষের কর্তব্য হল-তার জন্য নির্দিষ্ট কর্তব্যকর্ম পালন করা। তার দ্বারা সে কর্মযোগী হয়ে ওঠে এবং মুক্তির পথে অগ্রসর হয় এই কারণেই স্বামী বিবেকানন্দের দর্শনে সত্ত্ব, রজো এবং তমো গুণের আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
৪। কর্মরহস্য অবগত হওয়াই কর্মযোগ-উক্তিটির তাৎপর্য কী?
বিবেকানন্দ তাঁর কর্মযোগ গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে ‘কর্মরহস্য’ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন ‘কর্মরহস্য অবগত হওয়াই কর্মযোগ’। গীতায় কর্মযোগে যে ধরণের কর্মের উপদেশ দেওয়া হয়েছে তা হল ফললাভের আশা না রেখে কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে নিরাসক্তভাবে কর্মের জন্যই কর্ম করা। কর্মযোগ নিরন্তর কর্ম করার কথা বলে। স্বামীজি বলেন আসক্তি ত্যাগ করে কর্মে নিয়োজিত হতে হবে, কারণ আসক্তি দুঃখের কারণ। স্বার্থপরতা ত্যাগ করে নিঃস্বার্থ হতে পারলে বন্ধন মুক্ত হয়ে সংসারে অবস্থান করা সম্ভব। এই ধরনের কাজ সাধারণ মানুষের পক্ষে করা কঠিন। আধ্যাত্মিক তথা আত্মিক জ্ঞান লাভের মধ্যে দিয়ে একমাত্র এই কঠিন কাজ সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ নিষ্কাম কর্ম করতে গেলে আত্মজ্ঞান লাভ করা প্রয়োজন। আধ্যাত্মিক জ্ঞানলাভ করে নিষ্কামভাবে ও নিরপেক্ষভাবে কর্ম করাই হল কর্মের অন্তর্নিহিত অর্থ বা কর্মরহস্য।
৫। পরোপকারেই নিজের উপকার বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বিবেকানন্দ তাঁর কর্মযোগ গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়-এ বলেছেন ‘পরোপকারেই নিজের উপকার’। যে সমস্ত কার্যাবলী আমাদের পরমাত্মার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় সেগুলি হল সৎকার্য বা ভালো কাজ। তিনি কর্তব্যের যে ধারণা দিয়েছেন তার মর্মার্থই হল পরোপকার করা ও জগতের উপকার করা, যার দ্বারা বাস্তবিক পক্ষে আমরা নিজেরা নিজেদের কল্যাণ সাধন করি। পরোপকার করার মাধ্যমে আমরা আত্মসন্তুষ্টি লাভ করি। এই আত্মসন্তুষ্টিই আমাদের জীবনকে আরও সার্থক করে তোলে। আবার পরোপকার করার মাধ্যমে আমরা আধ্যাত্মিকভাবে উন্নতি করতে পারি। এটি আমাদেরকে নিজের স্বার্থের বাইরে গিয়ে অন্যের জন্য ভাবতে শেখায়। পরহিতের জন্য কর্ম করলে ক্রমশ চিত্তশুদ্ধি হবে তখনই আত্মা ‘সর্বজীবে বিরাজমান’-এই তত্ত্ব অনুভব করা যাবে। তাই পরের হিতসাধন হল নিজের আত্মার বিকাশের একটি উপায়। এটি এক ধরনের ঈশ্বরের সাধনা। এর উদ্দেশ্য হল আত্মবিকাশ। জ্ঞান, ভক্তি প্রভৃতি সাধনা দ্বারা যেমন আত্মবিকাশ হয় পরার্থে কর্ম দ্বারাও ঠিক তাই-ই হয়।
৬। অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ বলতে স্বামী বিবেকানন্দ কী বোঝাতে চেয়েছেন?
কর্মযোগ গ্রন্থের ষষ্ঠ অধ্যায়ে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ। কর্মযোগ অনুসারে কৃতকর্ম ফল প্রসব না করে কখনোই নষ্ট হতে পারে না। প্রকৃতির কোনো শক্তিই তার ফলপ্রসব রোধ করতে পারে না। তাই কখনও কোনো অসৎ কর্ম করলে আমরা তার দুঃখ অনুভব করি। আবার সৎ কর্মের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। স্বামীজি বলেন কোনো কর্মই সম্পূর্ণ ভালো বা মন্দ নয়। কর্ম মাত্রই ভালো বা মন্দ উভয় প্রকার ফল উৎপাদন করতে পারে। যে ব্যক্তি শুভ কর্মের মধ্যে অশুভ এবং অশুভ কর্মের মধ্যে শুভ দেখেন তিনিই প্রকৃত কর্মরহস্য বোঝেন। আসক্তিশূন্য আত্মত্যাগই মানুষের প্রকৃত সুখ। কেন-না তা মানুষকে পরিশুদ্ধ করে। গীতায় তাই বলা হয়েছে নিরন্তর কর্ম করো, কিন্তু সেই কর্ম হবে অনাসক্ত।
৭। কর্মের জন্যই কর্ম করো-বিবেকানন্দের এই উক্তিটি বুঝিয়ে লেখো।
জয়ার স্বামী বিবেকানন্দের জীবনে শ্রীমঙ্গবদ্গীতার প্রভাব ছিল অপরিসীম। গীতার কর্মযোগ অনুসরণ করেই তিনি কর্মযোগ সম্বন্ধে নিজ মত ব্যক্ত করেন। বিবেকানন্দ বলেন যে ‘কর্মের জন্যই কর্ম করো’। মানুষ নানা উদ্দেশ্যে কর্ম করে থাকেন-কেউ যশের জন্য, কেউ অর্থের জন্য, কেউ প্রভুত্ব বিস্তারের জন্য, কেউ বা স্বর্গলাভের জন্য ইত্যাদি। সকল দেশেই এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের প্রভাব সত্যই জগতের পক্ষে কল্যাণকর; তারা নাম, যশ ইত্যাদি গ্রাহ্য করেন না, তারা কেবল কর্মের জন্য কর্ম করেন। মনে রাখতে হবে প্রেম, সত্য নিঃস্বার্থপরতা-এগুলি শুধু নীতি সম্ববীয় অলঙ্কারিক বর্ণনা নয়, এগুলিই আমাদের সর্বোচ্চ আদর্শ-এগুলির মধ্যেই মহত্তর শক্তি নিহিত রয়েছে। এই শক্তি থেকেই সংযম আসে এবং সেটিই মানুষকে ‘খ্রিস্ট’ বা ‘বুদ্ধে’র মতো চরিত্র গঠনে সাহায্য করে।
৮। আদর্শ কর্মযোগী বলতে বিবেকানন্দ কাকে বুঝিয়েছেন?
জের বিবেকানন্দ বলেছেন যিনি আচরণের দিক থেকে সৎ ও কোনোরকম ব্যক্তিগত অসৎ অভিপ্রায় ছাড়া কর্ম করেন তিনিও আদর্শ কর্মযোগী। কর্মযোগীর লক্ষ্য হল স্বার্থশূন্য হয়ে কর্ম করার মধ্যে দিয়ে মুক্তিলাভ। স্বামীজি কর্মযোগ প্রসঙ্গে বুদ্ধদেবের দর্শনের দৃষ্টান্ত দেন। তিনি বলেছেন-যিনি অর্থ, যশ বা অন্য কোনো অভিসন্ধি ব্যতীত কর্ম করেন তিনিই সর্বাপেক্ষা ভালো কাজ করেন এবং মানুষ যখন এরূপ কর্ম করতে সমর্থ হবে, তখন তিনিও একজন ‘বুদ্ধ’ রূপে পরিগণিত হবে। তার ভিতরে এমন এক কর্মশক্তি উৎসারিত হবে যা এই জগতের রূপ পরিবর্তিত করে ফেলবে। এরকম ব্যক্তিই কর্মযোগীর আদর্শ দৃষ্টান্ত। স্বামীজির মতে গৌতম বুদ্ধ হলেন একজন আদর্শ কর্মযোগী, যিনি নিজের জন্য কিছু দাবি না করে অতি নিম্নতর প্রাণীর জন্য গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেন।
৯। ব্যাবহারিক বা প্রয়োগমূলক বেদান্ত কাকে বলে?
বেদের অন্ত বা শেষভাগকে বলা হয় বেদান্ত। বেদান্ত আমাদের সর্বোত্তম সত্যের সন্ধান দেয়। সর্বোত্তম সত্য হল সেটিই যেখানে বলা হয় আমিই হলাম সেই পরমসত্তা বা ব্রা। বিবেকানন্দ শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্তের নানান অদৃষ্টগোচর বিষয়কে মানব সমাজের সম্মুখে এনে উন্মোচন করেন এবং কর্মব্যস্ত সাধারণ মানুষের উপযোগী করে সেগুলিকে প্রকাশ করেন। এ ছাড়াও আমরা বিভিন্ন উপনিষদে দেখি যে বেদান্ত দর্শন শুধুমাত্র ঋষিদের ধ্যানের ফল নয়; দৈনন্দিন জীবনে কর্মব্যস্ত মানুষের মস্তিষ্ক প্রসূত বিষয়। স্বামীজি বলেন-বেদান্তকে শুধু দার্শনিক তত্ত্বরূপে গ্রহণ না করে জীবনের পালনীয় ধর্মরূপে গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ বেদান্তে আলোচিত বিষয়কে কর্মে রূপদান করতে হবে এবং বেদান্তের আলোকে জীবনযাপন করতে হবে। নানান গুণীজন বিবেকানন্দের বেদান্ত চিন্তাকে ব্যাবহারিক বা প্রয়োগাত্মক বেদান্ত বলেছেন।
১০। বেদান্তের সারসত্য লেখো।
তরে বেদান্ত যেমন নিবিড়ভাবে বাস্তবসম্মত তেমনই আদর্শের দিক থেকেও বাস্তবের মতো গ্রহণযোগ্য। বেদান্তের আদর্শ হল সমস্ত মানুষ দৈব সত্তার অধিকারী। তত্ত্বমসি অর্থাৎ তুমিই সেই-এ -কথাই বেদান্তের সারসত্য। বেদান্ত মতে মানুষ সব কর্ম করতে পারে। আর সেইজন্য তার নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। বেদান্তে আরও বলতে হয়েছে যে, যে ব্যক্তি নিজেকে বিশ্বাস করে নাক নিজের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না সে নাস্তিক। অর্থাৎ আমাদের আত্মার মহিমায় বিশ্বাস না। থাকাকে বেদান্তে নাস্তিকতা বলা হয়েছে। বেদান্ত দর্শন অনুসারে এক ব্রহ্মেই সমগ্র জগতের অবস্থান। ব্রহ্ম থেকেই জগতের সৃষ্টি এবং ব্রয়েই জগত বিলীন হয়। কিন্তু জীব অজ্ঞানতাবশত এ সত্য উপলব্ধি করতে পারে না এবং সকল জীবের মধ্যে ভেদাভেদ অনুমান করে।
১১। শিবজ্ঞানে জীবসেবা বলতে স্বামীজি কী বুঝিয়েছেন?
তার অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের চরম প্রতিপাদ্য বিষয় হল তত্ত্বমসি বা অয়মাত্মা ব্রহ্ম। এই তত্ত্বকথা বিবেকানন্দের কাছে শিবজ্ঞানে জীবসেবা-র মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। বিবেকানন্দ সন্ন্যাসী ছিলেন। জীবসেবাকে অদ্বৈতবাদের বিশেষ রূপ বলে মনে করেছেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর সীমাহীন আন্তরিকতা ও সহানুভূতি ছিল। ‘পিতৃদেবো ভব মাতৃদেবো ভব’ এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ না হয়ে যে দীক্ষামন্ত্রে স্বামীজি দীক্ষিত হন সেটি হল-“দরিদ্রদেবো ভব, মূর্খদেবো ভব”। দরিদ্র, মূর্খ, অজ্ঞানী, কাতর- এরা সকলেই ছিল তাঁর কাছে মনুষ্যরূপী নারায়ণ। বিবেকানন্দের মতে সাধারণ মানুষই হলেন সর্বব্যাপী ঈশ্বর, সমস্ত আত্মার আত্মা। আর এ কথা না মানলে অসত্য কথা বলা হবে। সব সময় এটি উপলব্ধ হোক বা না হোক, এটি সত্য।
১২। নঞর্থক অর্থে অহিংসা বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
গান্ধিজির মতে অহিংসা বলতে বোঝায় যে-কোনো জীবকে দৈহিক ও মানসিক আঘাত করা থেকে বিরত থাকা। সবরকমভাবেই ‘হিংসা’ শব্দটির বিপরীত শব্দ হল অহিংসা। এটি অহিংসার নঞর্থক অর্থ। প্রকৃতপক্ষে ‘অহিংসা’-কে এই অর্থে গ্রহণ করার প্রেরণা তিনি জৈন ধর্ম থেকে গ্রহণ করেন। জেন দর্শনে যেমন কায়মনোবাক্যে অহিংস হওয়ার কথা বলা হয়েছে তেমনই গান্ধিজিও অহিংস আচরণ করার কথা বলেছেন। তবে তিনি জৈন দর্শন প্রণীত অহিংসা নীতিকে সর্বতোভাবে অনুসরণ করেননি। জৈন দর্শনে অনুব্রতরূপে ও মহাৱতৰূপে অহিংসার কথা বলা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে একটা বিষয় উল্লেখ করা যায় যে গান্ধিজি অহিংসার পূজারী হয়েও বিশেষ ক্ষেত্রে প্রাণীহত্যাকে সমর্থন করেছেন।
১৩। সদর্থক অর্থে অহিংসা কী?
গান্ধিজি ‘অহিংসা’ শব্দটিকে কেবল নঞর্থক অর্থেই ব্যবহার করেননি। তাঁর মতে অহিংসাকে কেবল নঞর্থক অর্থে ব্যবহার করলে এই শব্দটির প্রকৃত অর্থ প্রকাশ পায় না। হিংসা না করা বা হত্যা না করা তখনই সম্পূর্ণভাবে অহিংস হবে, যখন তার সঙ্গে করুণার ধারণাটি যুক্ত হবে। ভালোবাসা এবং প্রেম- এই গুণই হল অহিংসার নির্ণায়ক। তিনি অহিংসাকে ভালোবাসার সঙ্গে প্রায় অভিন্ন বলে মনে করেছেন। তাঁর মতে হিংসার মধ্যে থাকে ঘৃণা ও বিদ্বেষ। কিন্তু অহিংসার উপাদান হল প্রেম, প্রীতি ও সৌহার্দ্য। অহিংসার মধ্যে কোনোরকম তিক্ততা, স্বার্থপরতা বা অহংবোধ থাকে না।
গান্ধিজি সদর্থক অর্থে ‘অহিংসা’ বলতে সত্যের অনুসরণ ও নির্ভীকতাকেও বুঝিয়েছেন। তিনি বলেছেন অহিংসা ও সত্য একে অপরের সাথে জড়িত।
১৪। গান্ধিজি কোন্ ক্ষেত্রে প্রাণী হত্যাকে সমর্থন করেছেন?
গান্ধিজি ছিলেন অহিংসা ও করুণার একনিষ্ঠ পথপ্রদর্শক। তিনি প্রাণী হত্যার চরম বিরোধিতা করতেন। কিন্তু এমন কিছু ব্যতিক্রম ক্ষেত্র আছে যেখানে তিনি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে প্রাণী হত্যাকে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন না করলেও ব্যাবহারিক ও নৈতিক বিবেচনায় সেটিকে সমর্থন করেছেন। অহিংসা গান্ধিজির মতবাদের মূল নীতি হলেও এটি এবং প্রয়োজনে হিংসাত্মক কার্যকলাপের মাধ্যমে হলেও নিজেকে রক্ষা করা উচিত। প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি বাস্তববাদী ছিলেন। তিনি মনে করতেন আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে।
এছাড়া যেখানে দুরারোগ্য ব্যাধিতে কোনো প্রাণী জর্জরিত এবং সেই দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ের কোনো উপায় না থাকে সেক্ষেত্রে তিনি প্রাণীটিকে নিধনের পক্ষে সম্মতি দিয়েছেন।
১৫। অহিংসা এবং সত্য-কি এক? অথবা, সত্য এবং অহিংসার মধ্যে সম্পর্ক কী?
অহিংসা এবং সত্য-এই দুটি শব্দ এতটাই পরস্পর সংযুক্ত যে এই দুটিকে আলাদা করা সম্ভব নয়। সত্য ও অহিংসা পরস্পর পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। গান্ধিজির ভাবনায় সত্য ও অহিংসা অখন্ড তত্ত্ব। বস্তুত সত্য অহিংসার অন্তরে অবস্থিত। যদি অহিংসা উপায় হয় তাহলে সত্য হল লক্ষ্য। অহিংসাই সত্য অনুসন্ধানের ভিত্তি তৈরি করে। সত্যের লক্ষ্য অন্যায়কারীকে বিব্রত করা নয়- বরং তার হৃদয়ের পরিবর্তন আনা। আর অহিংসার লক্ষ্য কেবল আঘাত না করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং সকলের প্রতি অসীম ভালোবাসা। তাই কোনোভাবেই এই দুটি বিষয়কে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। অহিংসার পথ ধরেই সত্যকে লাভ করা যায়।
১৬। গান্ধিজি কীভাবে লক্ষ্য ও উপায়ের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন?
অহিংসা ও সত্যের সম্বন্ধ আলোচনা করতে গিয়ে গান্ধিজি উপায় ও লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন। তিনি হিন্দ স্বরাজ গ্রন্থে বলেছেন-উপায় হল বীজ এবং লক্ষ্য হল গাছ। গাছ ও বীজের মধ্যে যেমন অপরিহার্য সম্পর্ক থাকে ঠিক তেমনই লক্ষ্য ও উপায়ের মধ্যেও এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। উপায়ের মধ্যে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নিহিত থাকে। উপায়কে কখনও লক্ষ্য থেকে পৃথক করা যায় না। ঠিক যেমন পথকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না পথের শেষ সীমা থেকে। তাই তিনি উপায়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে অহিংসা হল সতো পৌঁছানোর উপায়। সুতরাং অহিংসা হল আমাদের পরম কর্তব্য। উপায়কে যদি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় তবেই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। এই অর্থে অহিংসাকে প্রকৃত অনুসরণের দ্বারাই সত্যের ধারণা লাভ করা সম্ভব।
১৭। অহিংসাই সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র-ব্যাখ্যা করো।
মহাত্মা গান্ধি ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম এক নেতা। তাঁর অহিংসা নীতি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শন, যা তিনি সত্যাগ্রহ (সত্যের প্রতি দৃঢ়তা) নীতির মাধ্যমে বাস্তবায়িত করেছিলেন। গান্ধিজি বলতেন অহিংসাই সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র-কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষের প্রকৃত শক্তি শারীরিক বলপ্রয়োগে নয়, নৈতিক দৃঢ়তায় নিহিত। তাঁর মতে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয় বরং ভালোবাসা ও সহানুভূতির মাধ্যমে তাদের চারিত্রিক বদল করাই প্রকৃত জয়। অহিংসা চর্চার জন্য ব্যক্তিগত আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মত্যাগ অত্যন্ত জরুরি। সকলরকম লোভলালসা পরিহার করা প্রয়োজন। গান্ধিজি নিজেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন, যা সকল মানুষের কাছে অনুসরণযোগ্য। তিনি সামাজিক ন্যায়বিচার ও অস্পৃশ্যতা দূরীকরণেও অহিংসা নীতি প্রয়োগ করেছেন। তাঁর এই নীতি বিশ্বের সকল নাগরিক আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। উল্লেখ্য যে, মহাত্মা গান্ধির এই অহিংসা নীতি কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ ছিল না বরং এটি ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর নীতি এবং মানবতার প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাসের প্রতিফলন।
১৮। গান্ধিজির মতে অহিংসা সর্বোচ্চ সাহস কেন? অথবা, অহিংসা হল সাহসী ও শক্তিশালীদের হাতিয়ার ব্যাখ্যা করো।
গান্ধিজির মতে অহিংসাই সর্বোচ্চ সাহস। কেন-না একজন মানুষ যখন হিংসার, প্রতিশোধের পথ পরিত্যাগ করে শান্তিপূর্ণভাবে নিজের আদর্শ এবং ন্যায়ের জন্য লড়াই করে চলে তখন তাকে অনেক বেশি সাহসী হতে হয়। অহিংসা কেবলমাত্র শারীরিক সহিংসতা বর্জন করা নয়, এর মধ্যে নিহিত থাকে গভীর আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহানুভূতি এবং সংকল্প।
গান্ধিজি বিশ্বাস করতেন যে হিংসার পথ ধরে জয়লাভ করা তাৎক্ষণিকভাবে ফলপ্রসু হলেও তা চিরকালীন স্থায়িত্ব দিতে পারে না। অহিংসার পথ অবলম্বন করে চললেই শেষ পর্যন্ত জয় সুনিশ্চিত হয়। আর এর জন্য যে গভীর আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য্য ও কঠোর মানসিক শক্তির প্রয়োজন হয় তা একমাত্র সাহসী ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই গান্ধিজি অহিংসাকে সাহসী ও শক্তিশালীদের হাতিয়ার বলেছেন।
১৯। সত্যকে কীভাবে লাভ করা যায়?
গান্ধিজির মতে সত্য ঈশ্বরের সমতুল্য। আর এই সত্যকে লাভ করার জন্য অহিংসা ও সত্যাগ্রহ হল প্রধান দুটি উপায়। অহিংসা হল মনের মধ্যে প্রেম ও শাস্তির মাধ্যমে সত্যের অনুসন্ধান করা এবং সত্যাগ্রহ হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম করা। তাঁর মতে অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারাও সত্যকে লাভ করা সম্ভব। সমস্ত প্রতিকূল পরিবেশে সত্যকে আকড়ে থাকার নাম অভ্যাস। আর সত্য ব্যতীত অন্য সকল বন্ধু বিষয়ে উদাসীনতাই বৈরাগ্য। গান্ধিজি মনে করতেন সত্যের জন্য কষ্ট সহ্য করাও একধরনের সাধনা। নিজের ভোগ ত্যাগ করে বৃহত্তর কল্যাণের জন্য ত্যাগ স্বীকার করাটাই সত্যের পথে একধাপ এগিয়ে যাওয়া। বৃহত্তর সমাজের কল্যাণ সাধনের জন্য তিনি ‘সর্বোদয়’ নীতির কথা উল্লেখ করেছিলেন।
২০। অহিংসা- কি একটি নিষ্ক্রিয় পন্থা? গান্ধিজি এ বিষয়ে কী বলেছেন?
গান্ধিজির মতে যে মানুষ সত্য ও অহিংসাকে তার জীবনের ভিত্তি করেছেন তার জীবনে পরাজয় বা নৈরাশ্যের মতো কোনো শব্দ নেই। অহিংস পথ কোনোভাবেই নিষ্ক্রিয় পন্থা নয়। এটি মূলত একটি সক্রিয় আন্দোলন। তাঁর মতে পৃথিবীতে যত শক্তি আছে, তার মধ্যে সত্য ও অহিংসাই সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। কোনো ব্যক্তি যদি প্রতিবাদস্বরূপ সহিংস পথ বেছে নেয় তাহলে সেই ব্যক্তি প্রতিনিয়ত সক্রিয়ভাবে আন্দোলন করতে পারে না। কারণ কোনো একটা সময় তার বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। আর তখন তার সহিংস প্রতিবাদ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। কিন্তু সত্য ও অহিংস সাধকের ক্ষেত্রে এটি সত্য নয়। কারণ এইগুলি বাইরের অস্ত্র জাগ্রত, নিদ্রিত সমস্ত অবস্থায় সত্য ও অহিংসা মানুষের অন্তরেই থাকে এবং নিরলস ভাবে কাজ করে চলে। অহিংসা ও সত্যের ধর্মধারী যোদ্ধা সদা সক্রিয়।
২১। অহিংসা একটি হৃদয় পরিবর্তন পদ্ধতি ব্যাখ্যা করো।
গান্ধিজি অহিংসাকে শুধুমাত্র এক আন্দোলনের পন্থা হিসাবে গ্রহণ করেননি। তাঁর কাছে অহিংসা হল এক সক্রিয় লড়াই যা অন্যায়কারীর হৃদয় পরিবর্তনে সক্ষম। অহিংসা হল যুদ্ধাস্ত্র ছাড়াই এক রণকৌশল, যা যে-কোনো সহিংস সংগ্রাম থেকে বেশি কার্যকরী। কারণ হিংসার বশবর্তী হয়ে অথবা সশস্ত্র সংগ্রামের দ্বারা কোনো চিরকালীন সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সশস্ত্র সংগ্রামে আত্মশক্তির তুলনায় অস্ত্রের মারণ ক্ষমতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। তাই গান্ধিজি সংগতভাবেই বলেছেন যে অহিংসা এক সচেতন প্রতিরোধ যা অপরের প্রতি হিংসাপরায়নতাকে প্রতিহত করে। অতএব এটি কোনো বলপ্রয়োগের পদ্ধতি নয় বরং এটি পরিবর্তনের পদ্ধতি। তিনি মূলত ত্যাগের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। অহিংসার পথে অগ্রসর ব্যক্তিকে ক্রমাগত আত্মত্যাগ ও আত্মনিগ্রহের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। ফলে ব্যক্তির হৃদয়ে চিরকালীন পরিবর্তন ঘটে এবং তার সঙ্গে অন্যায়কারী ব্যক্তিরও হৃদয় পরিবর্তন ঘটে।
২২। গান্ধিজির অহিংসা ও সহানুভূতির ধারণার সম্পর্ক কী?
গান্ধিজির অহিংসা ও সহানুভূতির ধারণার মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক আছে। এরা একে অপরের পরিপূরক। শারীরিক হিংসা থেকে বিরত থাকাই কেবল অহিংসা নয়- এটি অন্যের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সম্মান প্রদর্শনেরও একটি জীবনদর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে অহিংসার মধ্যে এমন একটি অন্তর্নিহিত শক্তি আছে যা সমাজে শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সহানুভূতি ছাড়া অহিংসার প্রকৃত অর্থ সফল হতে পারে না। অহিংসার মাধ্যমে অন্যদের দুঃখ, কষ্ট বা আঘাতের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করাই হল প্রকৃত মানবিকতা। সত্যিকারের অহিংস হতে গেলে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। গান্ধিজির মতে সহানুভূতি মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা ও সহিদ্ভুতা সৃষ্টি করে, যা অহিংসার সঙ্গে মিলিত হয়ে শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলে।
২৩। গান্ধিজির মতে সত্যাগ্রহ কী?
গান্ধিজির কাছে ‘সত্য হল ঈশ্বর’ এবং সত্য সম্পর্কে আগ্রহ হল সত্যাগ্রহ। ‘সত্যাগ্রহ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল ‘Passion for the truth বা সত্যের প্রতি আগ্রহ এবং সত্যকে উপলবিধ করার যে কামনা তাই হল সত্যাগ্রহ।
হিন্দ স্বরাজ গ্রন্থে তিনি বলেছেন ‘সত্যাগ্রহ হল ব্যক্তিগতভাবে কষ্ট স্বীকার করে অধিকার অর্জন।’ বস্তুত সত্যাগ্রহ হল বলপ্রয়োগ না করে অর্থাৎ ঘৃণা, ক্রোধ ও হিংসার আশ্রয় না নিয়ে যুদ্ধ করার এক অভিনব কৌশল। এই সত্যের আর এক নাম হল Justice বা ন্যায়। সত্যাগ্রহ হল যাবতীয় অমঙ্গলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পদ্ধতি অর্থাৎ সব দ্বন্দ্বের সমাধানের কৌশল। গান্ধিজি বিশ্বাস করতেন যে সত্যাগ্রহ শুধুমাত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার একটি উপায় নয় বরং এটি একটি জীবনদর্শন যা সত্য, অহিংসা এবং আত্মসংযমের উপর প্রতিষ্ঠিত।
২৪। স্বরাজ কী?
‘স্বরাজ’ শব্দের প্রচলিত অর্থ স্ব-শাসন। ব্যুৎপত্তিগতভাবে স্বরাজ বলতে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মশাসনকে বোঝায়। কেন-না ‘স্বরাজ’ শব্দের অন্তর্গত ‘স্ব’ শব্দ স্বীয় বা নিজের এবং ‘রাজ’ শব্দটি নিয়ন্ত্রণ বা শাসন অর্থকে নির্দেশ করে। কাজেই যে ধারণা আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মশাসনের কথা বলে তাই স্বরাজ। কিন্তু গান্ধিজি ‘স্বরাজ’ শব্দটিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থেও ব্যবহার করেছেন। এই অর্থে স্বরাজ হল কোনো রাষ্ট্রের অন্তর্গত জনগণের দ্বারাই নির্বাচিত শাসনতন্ত্র- যেখানে জনগণের হাতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, বিচারবিভাগীয়, শিক্ষাবিষয়ক প্রভৃতি ক্ষমতা থাকবে। অর্থনৈতিকভাবে পূর্ণ ‘স্বরাজ’ মানে লক্ষ লক্ষ মেহনতি মানুষের পূর্ণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। তবে তিনি প্রকৃত স্বরাজ বলতে প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনতার অনুভব থাকাকে বুঝিয়েছেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্বরাজ হল অত্যাবশ্যকীয় আত্মমূল্যায়ন, অবিরাম আত্মশুদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান স্বদেশি বা স্বনির্ভরতার ক্ষমতার সঙ্গে অত্যাবশ্যকভাবে যুক্ত থাকা।
২৫। গান্ধিজি সর্বোদয় বলতে কী বুঝিয়েছেন?
‘সর্বোদয়’ হল মহাত্মা গান্ধির একটি গভীর দার্শনিক ও সামাজিক আদর্শ। ‘সর্বোদয়’ শব্দটি সর্ব এবং উদয় এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘সর্বোদয়’ শব্দটির অর্থ হল সকলের অগ্রগতি বা সর্বজনীন উন্নতি। অর্থাৎ সর্বোদয় হল এমন একটি সমাজব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি মানুষ ধনী, গরীব, দুর্বল, সবল সবার উন্নয়ন ও কল্যাণ ঘটে। গান্ধিজি বিশ্বাস করতেন যে গ্রামীণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক প্রত্যেকের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। কাজেই সর্বোদয় বলতে কোনো বিশেষ জাতি বা গোষ্ঠী বা ব্যাক্তির কল্যাণ নয়, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ ও বর্ণ নির্বিশেষে আপামর জনসাধারণের কল্যাণ বা মঙ্গলকে বোঝানো হয়। আর এই সর্বোদয় সমাজে প্রত্যেকের মঙ্গলসাধনে প্রত্যেকেই নিয়োজিত থাকবে। অর্থাৎ ব্যক্তির কল্যাণ নির্ভর করবে সকল মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের উপর।
২৬। গান্ধিজির অহিংসার ধারণা ব্যক্তিগত জীবন ও আচার-আচরণে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল?
অথবা, গান্ধিজির অহিংসা কি কেবল রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য ছিল নাকি এটি তাঁর একটি জীবনধারাও ছিল?
গান্ধিজির অহিংসার ধারণা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও আচার-আচরণের মধ্যে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। অহিংসাকে তিনি শুধু তাঁর সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবেই ব্যবহার করেননি। বরং এটি ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবন এবং ব্যক্তিগত আচার-আচরনেরও মূলনীতি। গান্ধিজির মতে অহিংসা হল আত্মসংযম, সহানুভূতি এবং অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল যথাসম্ভব সহজ, সরল, সাদামাটা এবং অনাড়ম্বর। অহিংসা, সততা, সত্যতা ও শুদ্ধতাকে অনুসরণ করেই তিনি জীবনযাপন করতেন এবং মানুষের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। সকল প্রকার প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তিনি সর্বদাই অহিংসার পথ অবলম্বণ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সতা এবং প্রেমের পথই মানুষকে তার মানবিক দিকগুলির উন্মেষ ঘটাতে সাহায্য করে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপনও এই আদর্শের সঙ্কোই সংগতিপূর্ণ ছিল।