বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও পাঠক্রম সম্পর্কে লেখো

শিক্ষার লক্ষ্য
বৌদ্ধ শিক্ষার লক্ষ্যগুলি হল-
(1) নির্বাণ লাভ: বৌদ্ধ শিক্ষার মুখ্য লক্ষ্য হল নির্বাণ লাভ। জীবনের সকল প্রকার বন্ধনের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাওয়ার উপায় হল নির্বাণ লাভ। তাই বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থায় নির্বাণ লাভের জন্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলনের কথা বলা হয়েছে।
(2) চারিত্রিক দৃঢ়তা সৃষ্টি: বৌদ্ধ শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হল চারিত্রিক দৃঢ়তা সৃষ্টি করা। অর্থাৎ অসত্য, অন্যায়, অসৎ আচরণ, চৌর্যবৃত্তি এবং জীবের প্রতি হিংসা পরিত্যাগ করার যে পঞ্চশীল নীতির কথা বলা হয়েছে সেগুলি অনুশীলন করা।
(3) অন্যান্য লক্ষ্য: এ ছাড়া বৌদ্ধ শিক্ষার অন্যান্য লক্ষ্যগুলি হল সু-অভ্যাস তৈরি করা, সমাজের কল্যাণ সাধন করা, বিহার বা সংঘ জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলি সুষ্ঠুভাবে পালন করা ইত্যাদি।
পাঠক্রম
বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা যেহেতু সংঘবাসীদের জন্য গঠিত হয়েছিল তাই পাঠক্রমের মূলেও ধর্মীয় বিষয় ও আচরণ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা সংযুক্ত হয়েছিল। প্রধানত পাঠক্রমে ত্রিপিটককে বিশেষ স্থান দেওয়া হয়েছিল। ত্রিপিটকের তিনটি অংশ-
(1) সূত্রপিটক : এই অংশে আছে বুদ্ধদেবের উপদেশ ও বাণী।
(2) বিনয়পিটক: এখানে আছে বৌদ্ধ শ্রমণ ও ভিক্ষুদের পালনীয় কর্তব্য।
(3) অভিধম্মপিটক : অভিধম্মপিটকে আছে বৌদ্ধ তত্ত্ব। বৌদ্ধ শিক্ষার প্রথম যুগে সংস্কৃত, জ্যোতিষ, জাদু, লোকায়ত দর্শন ইত্যাদি বিষয়গুলি পাঠক্রমে স্থান পায়নি কিন্তু পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর মহাযান সম্প্রদায়গণ পাঠক্রমে লোকায়ত বিদ্যাগুলিকে স্থান দেয়। নালন্দা, বিক্রমশীলা ইত্যাদি প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্রগুলির পাঠক্রম আলোচনা করলে দেখা যায় এখানে ভেষজ, রসায়ন, গণিত, স্থাপত্য, শিল্প, সংগীত, চিকিৎসাবিদ্যা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হয়। ত্রিপিটক ছাড়াও বেদ, পুরাণ, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, ইতিহাস, ব্যাকরণ এইগুলিও শিক্ষার বিষয়বস্তু ছিল। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা হীনযান ও মহাযান এই দুটি মতে বিভক্ত। মহাযান সম্প্রদায় যেমন ছিল উদার প্রকৃতির তেমনই হীনযান সম্প্রদায় ছিল কট্টরপন্থী। হীনযানরা পালি ভাষায় লেখা প্রাচীন বৌদ্ধ শাস্ত্রগুলির উপর জোর দিত। মহাযান সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের পাঠক্রমে রেখেছিল জ্যোতিষ, জাদু, লোকায়ত দর্শন ইত্যাদি। আচার্য বা ধর্মগুরু ত্রিপিটক থেকে সেই সময়ের উপযোগী কোনো অধ্যায় পাঠ করতেন এবং ব্যাখ্যা করতেন। মহাযান মতাবলম্বীদের প্রচেষ্টায় লোকায়ত শিক্ষার প্রসার ঘটে। ধীরে ধীরে বৃত্তিমূলক শিক্ষা, বেদবেদান্ত, জৈনশিক্ষা, উপনিষদ, সাংখ্যা, ব্যাকরণ, জ্যোতিষ প্রভৃতি পাঠক্রমে স্থান পায়।
আরও পড়ুন – বিকাশের স্তরসমূহ প্রশ্ন উত্তর