
কন্যাশ্রী প্রকল্প প্রবন্ধ রচনা
"মেয়েরা আমাদের ঘরের সম্পদ ভবিষ্যতের অনন্যা ওদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে দিন কন্যাশ্রী ওদের প্রেরণা।"
ভূমিকা
প্রাচীনকাল থেকে বাংলা তথা ভারতের সমাজ পুরুষশাসিত। বাল্যবিবাহ, সতীদাহ প্রথা ও অশিক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে নারীজাতি সমাজে অবহেলিতা, উপেক্ষিতা থেকে গেছে। বাল্যবিবাহের ফলে অল্প বয়সে নারীজাতি পতিগৃহে যাত্রা করত। তারপর ঠাকুরঘর থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত সমস্ত কাজকর্ম সম্পন্ন করতে হত। সন্তান-সন্ততি পালন, হাতা-খুস্তি-কড়া, ঢেঁকিতে ধান ভাঙা, ধান সিদ্ধ-শুকনো ইত্যাদি হাজার গন্ডা সাংসারিক কর্মের মধ্য দিয়ে তাদের জীবন অতিবাহিত হত। প্রাতঃস্মরণীয় রাজা রামমোহন রায়, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ মনীষীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে বাংলার নারী জাতি কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে শিক্ষা-দীক্ষা ও সুখ-শান্তির মুখ দেখেছে। তবুও অর্থের কারণে বাংলার মেয়েদের নানা সমস্যা থেকে গেছে।
কন্যাশ্রী প্রকল্পের ইতিবৃত্ত
বাংলার মেয়েদের সামাজিক উন্নতির প্রচেষ্টায় অনেকেই ব্রতী আছেন। অতিসম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী নারীজাতির উন্নতিবিধানের জন্য একটি প্রকল্প প্রচলন করেছেন। প্রকল্পটির নাম-কন্যাশ্রী। ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর এই প্রকল্প শুরু হয়েছে। ১৩-১৮ বছর বয়সি মেয়েদের (8th to 12th Class) পড়াশুনো চালানোর খরচ বাবদ ৫০০ টাকা অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে রাজ্য সরকার। উদ্বোধনের দিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ১০,০০০ ছাত্রীকে এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
কন্যাশ্রী প্রকল্পের শর্ত
এই প্রকল্পে সাহায্য পাওয়ার কিছু শর্ত ছিল। বর্তমানে কোনো শর্ত রাখা হয়নি। একটি পরিবারে যতজন কন্যাসন্তান, ততজনই কন্যাশ্রী প্রকল্পের আওতায় আসবে। ১৮-র পরেও কেউ যদি অবিবাহিতা থেকে পড়াশুনো চালাতে চায়, সেক্ষেত্রে সে কন্যাশ্রী প্রকল্প থেকে সাহায্য পাবে এককালীন ২৫,০০০ টাকা। কন্যাশ্রীর টাকা জমা পড়বে ছাত্রীদের নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।
প্রকল্পের তাৎপর্য
কন্যাশ্রী প্রকল্পটি রাজ্য সরকারের নারী ও সমাজকল্যাণ দপ্তরের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ রাজ্যের সর্বপ্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মহিলাদের উন্নতির জন্য এই প্রকল্প প্রচলন করেছেন। গ্রাম ও শহরের লক্ষ লক্ষ পরিবারের মেয়েরা আর্থিক সুবিধা পেয়ে শিক্ষা অব্যাহত রাখতে পারবে। কেন-না অনেক পরিবারের মেয়েকে অর্থাভাবে পড়াশুনা স্থগিত রেখে পরের বাড়িতে বাসন মাজতে যেতে হত অথবা কোনো একটি পেশাগত কাজে নিযুক্ত হতে হত অথবা দরিদ্র পিতা-মাতা অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিত। সমাজের একটা বড়ো অংশ নারীজাতির উন্নতি না হলে রাজ্যের সামগ্রিক উন্নতি অসম্ভব। তৎসহ যে-কোনো পরিবারের শ্রী হল কন্যা-এই ভাবনা থেকেই প্রকল্পের নামকরণ করা হয়েছে ‘কন্যাশ্রী’। ভাবনা, উদ্যোগ ও রূপায়ণের সমন্বয়েই এই প্রকল্পের তাৎপর্য বিকশিত হবে।
প্রকল্পের গুরুত্ব
ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে এ জাতীয় উন্নয়নমূলক প্রকল্প চালু আছে। সেই প্রকল্প উপলব্ধি করেই পশ্চিমবঙ্গে কন্যাশ্রী প্রকল্প চালু হয়েছে। এই প্রকল্পের গুরুত্ব ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে নারী ও সমাজকল্যাণ সচিব ডঃ রোশনি সেনের বক্তব্য- “পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহ হয় ৫৪.৭ শতাংশ-এই হার জাতীয় গড়ের বেশি।” এমতাবস্থায় আর্থিক সাহায্য পেলে এ রাজ্যের কিশোরীরা পড়াশুনো চালিয়ে যেতে পারবে ও সচেতন হবে। ফলশ্রুতিস্বরূপ বাল্যবিবাহ নিয়ন্ত্রণে আসবে। কন্যাশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে স্কুলছুটের প্রবণতাও কমে যাবে। এই গুরুত্বের কথা বিচার করে রাজ্য সরকার কন্যাশ্রী প্রকল্পে অনেক টাকা বরাদ্দ করেছে।
উপসংহার
এই প্রকল্পের বাস্তব রূপায়ণ ও সার্থকতার জন্য রাজ্যের সমস্ত নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নেতিবাচক চিন্তাভাবনায় এই প্রকল্পকে তর্কবিতর্কে জর্জরিত করা উচিত হবে না। এই প্রকল্পের সঙ্গে নানা পর্যায়ে যেসব কর্মচারী যুক্ত থাকবেন তাঁদের সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সার্থকতার শিখরে আরোহণ করবে। রাজনৈতিক নেতানেত্রী ও কর্মীদের স্বচ্ছতার সঙ্গে কন্যাশ্রী প্রকল্প দেখভাল করতে হবে। অন্যথায় অর্থনৈতিক দুর্নীতির জালে পড়ে এই মহতী প্রকল্প চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কবি কামিনী রায়ের ভাষায় মনে রাখতে হবে-
“স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ বৃহৎ জগৎ হতে সে কখনও শেখেনি বাঁচিতে।”
আরও পড়ুন – আগুন নাটকের প্রশ্ন উত্তর