আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু বা পরিধি আলোচনা করো

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু বা পরিধি

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু বা পরিধি আলোচনা করো
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু বা পরিধি আলোচনা করো

বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে পৃথক হয়ে একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে বিশ্বে চর্চিত হচ্ছে। বিশ্বব্যবস্থা সর্বদা পরিবর্তনশীল। বিশ্বে নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বহু নতুন রাষ্ট্র ও সংগঠন জন্ম নিচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তুরও পরিবর্তন ঘটছে, পরিধি আরও ব্যাপকতর হচ্ছে। আবার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাত্ত্বিকদের মধ্যে মতপার্থক্য লক্ষ করা যায়। গ্রেসন কার্ক, ভিনসেন্ট বেকার, জোসেফ ফ্র্যাঙ্কেল, পামার ও পারকিনস প্রমুখ তাত্ত্বিকরা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়বস্তুর তালিকা লিপিবদ্ধ করেছেন, যা বহুমুখী। ফলে এর বিষয়বস্তু বা আলোচনাক্ষেত্রকে সুনির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। সংক্ষেপে এর বিষয়বস্তু আলোচনা করা হল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নাৎসিবাদ ও ফ্যাসিবাদের উত্থান, সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার আবির্ভাব ও দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থা, দাতাঁত, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, বিশ্বায়ন, বিশ্বজোড়া সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ এমনকি বিশ্বায়ন-উত্তর দুনিয়ার আবির্ভাব ইত্যাদি কালপঞ্জিকা অনুসরণে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তুতে নতুন নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে।

প্যারিস সম্মেলন ও ভিনসেন্ট বেকার-এর মত:

১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সম্মেলনে তিনটি বিষয়কে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যথা—আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সংগঠন ও তার প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক আইন। ভিনসেন্ট বেকার (Vincent Baker) ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্যা Introductory Course in International Relation’ গ্রন্থে যে বিষয়গুলিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধিভুক্ত করেছেন সেগুলি হল আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রকৃতি ও প্রধান প্রধান শক্তি সমূহ, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংগঠনসমূহ, জাতীয় শক্তির উপাদান, জাতীয় স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার, জাতীয় শক্তির সীমাবদ্ধতা, শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের বিদেশনীতি এবং সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির ইতিহাস।

গ্রেসন কার্ক আবার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধির মধ্যে ৫টি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন যথা- রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃতি ও পরিচালনা, রাষ্ট্রের উপর আধিপত্য বিস্তারকারী উপাদানসমূহ, বৃহৎ শক্তিগুলির অবস্থান ও বিদেশনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস এবং স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থা গঠন।

কুইন্সি রাইট এর শ্রেণিবিভাজন:

১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘The Study of International Relations’ গ্রন্থে অধ্যাপক কুইন্সি রাইট (Quincy Wright) নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তুরূপে চিহ্নিত করেছেন। যথা- কূটনৈতিক ইতিহাস, সমরবিজ্ঞান ও যুদ্ধকৌশল, জাতীয় স্বার্থের হাতিয়াররূপে কূটনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সংগঠন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিদেশনীতি পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ। আন্তর্জাতিক ঔপনিবেশিক সরকার এবং

কৌলৌম্বিস ও উল্ল্ফ-এর মত:

মনে রাখা উচিত যে ১৯৫০-এর দশকের পর থেকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়েছে। অনেক নতুন সমস্যা আবির্ভূত হয়েছে এবং নতুন নতুন বিশ্লেষণভঙ্গির ব্যবহার লক্ষ করা গেছে। এই পটভূমিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তুতে অনেক নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে, এর পরিধিও প্রসারিত হয়েছে। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘Introduction to International Relations: Power and Justice’ গ্রন্থে কৌলৌম্বিস ও উল্ফ (Theodore Couloumbis and James Wolfe) নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধির অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যথা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিভিন্ন আলোচনা পদ্ধতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিভিন্ন তত্ত্ব, জাতিরাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদ, জাতিরাষ্ট্রের ক্ষমতা, বিদেশনীতি, জাতীয় স্বার্থ, কূটনীতি, যুদ্ধ, শক্তির ভারসাম্য, আইন, আন্তর্জাতিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক আন্তর্জাতিক কল্যাণকর কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, উন্নত ও দরিদ্র দেশগুলির মধ্যে বৈষম্য, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ক্রিয়াকারী, সভ্যতার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জসমূহ।

পামার ও পারকিনস্-এর মত:

নর্ম্যান ডি পামার এবং হাওয়ার্ড সি পারকিনস্ তাঁদের ‘International Relations’ (3rd editon) গ্রন্থে ১৫টি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন, যথা রাষ্ট্রব্যবস্থা, জাতীয় ক্ষমতা, জাতীয় স্বার্থরক্ষার কূটনীতি, প্রচারকার্য, বিদেশনীতি প্রয়োগের অর্থনৈতিক হাতিয়ার, যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ, শক্তির ভারসাম্য, যৌথ নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক সংগঠন, জাতীয় স্বার্থ, পরমাণু অস্ত্র, প্রভাবশালী রাষ্ট্রের বিদেশনীতি এবং পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা।

জোসেফ ফ্র্যাঙ্কেল ও ফ্রেডরিখ ডান-এর অভিমত:

জোসেফ ফ্র্যাঙ্কেল (Joseph Frankel) ‘আন্তর্জাতিক রাজনীতি’ তথা ‘বিশ্ব রাজনীতি’ কথাটি বিশেষার্থে প্রয়োগ করেছেন। তিনি মনে করেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্তর্ভুক্ত আলোচ্য বিষয়গুলি হল-আন্তঃরাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতি, রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রসমূহের ক্রিয়াকলাপ প্রভৃতি।

অন্যদিকে ফ্রেডরিখ ডান (Frederick Dunn) রাষ্ট্রগুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক গোষ্ঠী, ব্যক্তির আচার-আচরণ, জাতীয় নীতি সম্পর্কিত বিরোধ, বিরোধ মীমাংসা, জাতীয় শক্তি, অর্থনৈতিক লেনদেন ইত্যাদি বিষয়কে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেছেন।

বেইলিস, স্টিভ স্মিথ ও ওয়েন-এর মত:

বেইলিস, স্টিভ স্মিথ ও প্যাট্রিসিয়া ওয়েন ‘Globalization of World Politics’ গ্রন্থে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে চিহ্নিত করেছেন- বিশ্বায়ন ও তার পরবর্তী আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থতত্ত্ব, প্রসার, জাতীয়তাবাদ, পরিবেশ দূষণের সমস্যা, আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব, পরমাণু অস্ত্রের বিশ্বরাজনীতি ও মানবকল্যাণমূলক হস্তক্ষেপ, আঞ্চলিকতাবাদ ও সংহতি, বিশ্ববাণিজ্য ও আর্থিক সম্পর্ক, দারিদ্র্য, উন্নয়ন ও ক্ষুধা, লিঙ্গ সমতা। মানবাধিকার এবং

আলোচনাক্ষেত্রে সংযোজন ও বহুমাত্রিকতা:

নতুন সহস্রাব্দে বিশ্বব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৯০-এর দশক থেকেই এই পরিবর্তনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ি একমেরুপ্রবণ বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিলেও অচিরেই বিশ্বায়ন উত্তর পর্বে এ বহুমেরু প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। গ্যাট চুক্তি (GATT), সিটিবিটি (CTBT), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO), আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার (IMF), e আন্তঃরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশ সংরক্ষণের তাগিদ, মহামারি প্রতিরোধ ইত্যাদির প্রভাব শাস্ত্রটির আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে যা যা শাস্ত্রটিকে যুগোপযোগী করে তুলেছে। এই ব্যাপ্তি, গতিশীলতা ও পরিবর্তন প্রবণতা প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু ও পরিধি নির্ধারণ অচলায়তনরূপী হতে পারে না। এক্ষেত্রে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি হল-

আন্তর্জাতিক রাজনীতি: আন্তর্জাতিক রাজনীতি হল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রীয় বিষয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক, কূটনীতি, রাষ্ট্রসমূহের প্রকৃতি ইত্যাদি হল আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ। বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভারসাম্যকে কেন্দ্র করেই বিশ্ব রাজনীতি আবর্তিত হয়।

আন্তর্জাতিক আইন: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। যদিও বিভিন্ন সময় অনেক রাষ্ট্রই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্গন করে থাকে, তথাপি বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষ কার্যকরী হয়ে ওঠে।

আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক: দুটি বা তার বেশি রাষ্ট্রের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক জটিলতায় পূর্ণ। নানান অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নির্ধারক যেমন-ঐতিহাসিক উপাদান, রাজনীতি, ভৌগোলিক পরিস্থিতি, ধর্ম ও মতাদর্শ রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সম্পর্কের রূপরেখা নির্মাণ করে। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়।

জাতীয় স্বার্থ ও ক্ষমতা: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির নির্মাতাগণ শক্তি, ক্ষমতা ও পরস্পরবিরোধী জাতীয় স্বার্থের উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই বিষয়টি নিতান্তই স্বাভাবিক। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সমাজে বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত ও কার্যাবলি প্রভাবিত হয় ক্ষমতার দ্বারা। রাষ্ট্রসমূহের সফলতার মাপকাঠি তার সামরিক ক্ষমতা ও শক্তি-সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল তাই ক্ষমতাকেন্দ্রিক আলোচনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনগুলির অধ্যয়ন: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংগঠন, প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং তাদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্যসূচি। যেমন– জাতিসংঘ, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ, জাতিপুঞ্জের অন্তর্গত বিশেষ সংস্থা, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা-সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন, সার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান ইত্যাদির কথা উল্লেখ্য। সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী না হলেও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমিকতার উপর এই আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলির প্রভাব বিশ্বে সার্বিকভাবে প্রতীয়মান।

সন্ত্রাসবাদ : বর্তমানকালে সন্ত্রাসবাদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচ্যসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। কয়েকবছর আগেও সন্ত্রাসবাদী ক্রিয়াকলাপ রাষ্ট্রের জাতীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ বিষয়রূপে গণ্য করা হত, তবে সম্প্রতি জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে এর পরিধি ক্রমশ বিস্তৃতি লাভ করেছে এবং আন্তর্জাতিক সমাজ সভ্যতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে।

নয়া সাম্রাজ্যবাদ : অতীতে বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্র যেমন-ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিল। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে সাবেকি সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটেছিল। কিন্তু বর্তমানে ঔপনিবেশিকতা, সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। যেখানে নতুনরূপে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি ক্ষমতায়ন ঘটিয়ে অন্যান্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার করছে, এর প্রধান হাতিয়ার হল অর্থনৈতিক সামর্থ্য। যা নয়া সাম্রাজ্যবাদ নামে খ্যাত। এই বিষয়টিকে বিচারবিশ্লেষণ করাও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী আন্দোলন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে একে একে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের এশিয়া-আফ্রিকার উপনিবেশগুলি স্বাধীনতা লাভ করতে থাকে। ওই মুক্তিকামী আন্দোলন আন্তর্জাতিক বিশ্বরাজনীতির চিত্রপটকে অন্য এক রূপ দান করেছিল। তাই জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করাও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়।

যুদ্ধ ও শান্তি: বিশ্বের প্রতিটি শান্তিকামী জনগণ যুদ্ধ-সংঘাতের বিরোধী। তবে বিভিন্ন রাষ্ট্রের আন্তঃসম্পর্কের ক্ষেত্রে যুদ্ধ ও শান্তির ভারসাম্যের নীতিটি সহজসরল নয় বরং জটিল। তাই বিবাদের মীমাংসা, জোটগঠন, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয়গুলি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয় হিসেবে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির শক্তির উত্থান-পত্তন: বিশ্বরাজনীতিতে বৃহৎ ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের উত্থান-পতন আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বহুলাংশে প্রভাবিত করে। ঠান্ডাযুদ্ধের পূর্বে ব্রিটেন, ফ্রান্সের কর্তৃত্ব দেখা গিয়েছিল। যুদ্ধোত্তর পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বশক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে বিশ্বরাজনীতিতে আবির্ভূত হতে দেখা যায়। এই সমস্ত বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যে ঘাতপ্রতিঘাত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়রূপে প্রতিপন্ন হয়।

বৈদেশিক নীতি: প্রত্যেক সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি থাকে। বিদেশনীতি রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ ও পরিচালনা করে। তাই বৈদেশিক নীতিসমূহের উদ্দেশ্য ও সেগুলি কার্যকর করার পন্থা-সহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নামক শাস্ত্রটি।

উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শাস্ত্রের চর্চা বর্তমানে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে এর বিষয়বস্তু ও পরিধি চিরকালীন ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে না। বস্তুত কোনো সামাজিক বিজ্ঞানই এই ধরাবাধার মধ্যে পড়ে না। কারণ সমাজ গতিশীল ও পরিবর্তনশীল। সামাজিক সমস্যাগুলিও নতুন অভিমুখে ধাবিত হয়। পুরোনো ধারণা কাঠামো ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি সর্বদা নতুন সমস্যা মোকাবিলা করতে পারে না বলেই প্রতিনিয়ত সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্র, পরিধি ও বিষয়বস্তুতে নতুন নতুন বিষয় সংযোজিত হয়ে চলে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কও এই প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়।

আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment